হাজারো প্রতিযোগীর সঙ্গে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কোনো শিক্ষার্থী যখন কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায়, তখন সে মনে করে জীবনের অন্যতম এক সাফল্য অর্জন করে ফেলেছে। হয়তো এর চেয়ে বেশি আনন্দ তার শিক্ষাজীবনে আর কখনও অনুভূত হয়নি। পরিবার, সমাজ ও বিভিন্ন স্থানে সে আলাদা এক সম্মান অর্জন করে, সবাই বাহবা দিতে থাকে মেধাবীর সাফল্যের গুণগান করতে গিয়ে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়া শিক্ষার্থীও নতুন করে স্বপ্ন দেখে, আরও বেশি কিছু অর্জন করার, স্বপ্ন দেখে বর্ণাঢ্য এক ক্যারিয়ারের। কিন্তু এ স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে কতজন শিক্ষার্থী, তা বেকারত্ব ও চাকরির বাজারের প্রতিযোগিতার দিকে তাকালে সহজেই অনুমেয়।
চান্স পাওয়ার পর যে অনুভূতি তৈরি হয়, সেটা কি আসলে অনুভূত হওয়ার মতো ছিল, তা আস্তে আস্তে বুঝতে শুরু করে একজন শিক্ষার্থী।
শিক্ষাজীবনে ধস নামার গল্প তৈরি হয় ক্রমান্বয়ে, তৈরি হয় সামাজিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় নৈতিকতা ভুলে যাওয়ার প্রবণতা, তৈরি হয় নানা অসামাজিক কাজে লিপ্ত হওয়ার প্রতিযোগিতা।
শিক্ষাজীবনে প্রাইমারি, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে এসে উচ্চশিক্ষার স্তরে এমন হওয়ার কথা ছিল কি? যত উচ্চশিক্ষা অর্জিত হয়েছে, মূল্যবোধ ও মানবিকতা তত বেশি হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু এর বিপরীত দেখা যায় বাস্তবে। সামাজিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় নৈতিকতা হারানোর অন্যতম কারণ হচ্ছে উচ্চশিক্ষায় অবাধ স্বাধীনতা। বাবা-মা বা কোনো অভিভাবককে শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করতে হয় না এই সময়ে, বাড়ি থেকে দূরের কোনো প্রতিষ্ঠানে পড়তে হয় তাদের। সুতরাং শিক্ষার্থীরা অবাধ স্বাধীনতা পেয়ে যা ইচ্ছা তা করে। পত্রিকার পাতা খুললে দেখা যায়, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দ্বারা চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনাও ঘটছে প্রতিনিয়ত। প্রায়ই সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মারামারির ঘটনা ঘটছে। এসব নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতে হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে। প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সম্পদ নষ্ট করাসহ বিঘ্নিত করা হচ্ছে শিক্ষার পরিবেশ। অথচ তারাই সর্বোচ্চ শিক্ষার স্তরে অধ্যয়নরত আছে। তাহলে শিক্ষার উদ্দেশ্য কী? বর্তমান উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা কি কোনো শিক্ষার্থীকে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন করছে? শিক্ষার্থীদের আচরণ দেখলে আসলে তা মনেই হবে না, এটা আমাদের জন্য দুঃখজনক।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে কোনো শিক্ষার্থী চিন্তার জগৎকে যতটুকু প্রসারিত করতে পারছে, এর মধ্যে ভালো দিক কতটুকুই বা আছে তাও ভাবার বিষয়। আমরা শিক্ষার উচ্চ স্তরে এসেও উঁচু-নিচু ভেদাভেদের জায়গা থেকে সরে আসতে পারছি না আজও। শহুরে ও গ্রাম্য বা গ্রাম থেকে উঠে আসা শিক্ষার্থীদের মাঝেও সৃষ্টি করা হয় উঁচু-নিচু ভেদাভেদের দেয়াল। তাহলে আমরা কী শিখছি?
নৈতিকতার কথা বলতে গেলে শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যাপার আসছে না, শিক্ষকরাও বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়াচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা শিক্ষা না দিয়ে বিপরীতে শিক্ষকরা নানা অনৈতিক ও অসামাজিক অপরাধ করে যাচ্ছেন, এসবের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রতিবাদ সভা আমরা দেখেছি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষকের উপস্থিতি নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হলগুলোর আবাসিক শিক্ষার্থীরা তাদের আবাসিক শিক্ষকদেরও চেনেন না, ক্লাসে এসে লেকচার শোনা ছাড়া যেন কোনো যোগাযোগই নেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে। তাহলে শিক্ষার আদান-প্রদান কতটুকু হচ্ছে তাও দেখার বিষয়। আবাসিক হলগুলোর অব্যবস্থাপনাও শিক্ষার্থীদের এক কঠিন অ্যাকাডেমিক জীবনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। আর কবে আমরা শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য শিক্ষা দিয়ে শিক্ষার্থীদের মানবসম্পদে পরিণত করতে পারব, তা নিয়ে আজই ভাবতে হবে।
সামাজিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় নৈতিকতা, প্রকৃত শিক্ষা ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলেই পরিবর্তন সম্ভব হবে। তবেই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীরা তাদের প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করে দেশ ও জাতির জন্য অবদান রাখবে বলে আশা করি।
আবদুর রহমান
শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়




