পলাশ শরিফ: কয়েক বছর ধরে মূলধন সংকটে ধুঁকছে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক। ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি এক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সেই সঙ্গে বিনিয়োগের ৮২ শতাংশই এখন খেলাপি। আর আইনি জটিলতার কারণে খেলাপিদের কাছ থেকে পাওনা আদায়ে হিমশিম খাচ্ছে ব্যাংকটি। বর্তমানে প্রায় এক হাজার ৮২৩ কোটি টাকা পুঞ্জীভূত লোকসান রয়েছে ইসলামী শরিয়াহ্ভিত্তিক পরিচালিত ব্যাংকটির।
অন্যদিকে শেয়ার বাজেয়াপ্ত নিয়ে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার কারণে বর্তমান উদ্যোক্তারাও তারল্যের জোগান দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এর মধ্যেও ধুঁকতে থাকা ব্যাংকটি লোকসান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। কিন্তু ঋণ-আমানতের সুদের হারে বড় পরিবর্তনের কারণে ব্যাংকটির সেই স্বপ্নও ভাঙছে। সমাপ্ত আর্থিক বছরে কমার বদলে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের লোকসান আরও বেড়েছে।
তথ্যমতে, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে পিছিয়ে পড়া আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসান এক হাজার ৮২৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ২০১৩ থেকে পরবর্তী ছয় বছরে প্রায় ২২৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা লোকসান গুনেছে ব্যাংকটি। আর গত ছয় বছরের মধ্যে ২০১৩ সালে সর্বোচ্চ প্রায় ৬৮ কোটির বেশি টাকা লোকসান গুনেছে।
২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের বিনিয়োগ প্রায় ৮৬৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। আর ব্যাংকটির ওই বিনিয়োগের প্রায় ৮২ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে। যে কারণে কয়েক বছরে ব্যাংকটির তারল্য সংকট আরও বেড়েছে। কিন্তু খেলাপি ঋণ আদায়েও গতি নেই। আদালতের স্থগিতাদেশের কারণেও খেলাপি ঋণ আদায় করতে পারছে না ব্যাংকটি। যে কারণে তারল্য সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য বিকল্প ভাবছে মালয়েশিয়াভিত্তিক আইসিবি ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপ হোল্ডিংসের মালিকানায় থাকা বেসরকারি ব্যাংকটি। কিন্তু ব্যাংকটির শেয়ার বাজেয়াপ্ত করার বিষয়ে চলমান মামলার কারণে নতুন করে তারল্যের জোগান দিচ্ছে না আইসিবি ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপ। তাই ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সহসাই নতুন কোনো পথ পাচ্ছে না আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক।
আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের কোম্পানি সচিব ইমরান বিন আহমাদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা এমনিতেই তারল্য সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। পুঞ্জীভূত লোকসান ও মূলধন ঘাটতি বাড়ছে। বিনিয়োগের বড় অংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে, কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে আদায় করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে শেয়ার বাজেয়াপ্ত করা নিয়ে মামলার কারণে বর্তমান উদ্যোক্তারা মূলধনের জোগান দিচ্ছেন না। তারপরও লোকসান কাটিয়ে মুনাফায় ফেরার চেষ্টা করছি। কিন্তু পারিপার্শ্বিক কারণে পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে। এবার বিনিয়োগ-আমানতের মুনাফার হারে পরিবর্তনের কারণে পরিচালন লোকসান হয়েছে। এর বিপরীতে নৈমিত্তিক ব্যয় মেটাতে গিয়ে লোকসান বেড়েছে।’
এদিকে চলমান সংকটের মধ্যেও বিদ্যমান লোকসান কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইসলামী শরিয়াহ্ভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকটি। এর জের ধরে ২০১২ সালের পর থেকে কোম্পানিটির লোকসান কমতে শুরু করে। ওই আর্থিক বছরে প্রায় ১০৬ কোটি ১০ লাখ টাকা লোকসান করেছিল ব্যাংকটি। পরবর্তী তিন বছর একটানা কমে ২০১৫ সালে ব্যাংকটির লোকসান প্রায় ১৪ কোটি ১০ লাখ টাকায় নেমেছিল। এতে মুনাফায় ফেরার আশায় বিনিয়োগকারীদের চোখেমুখে আলো ফুটেছিল। কিন্তু বাড়তি ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের বিপরীতে আয় কমে যাওয়াসহ বেশকিছু প্রতিবন্ধকতার কারণে আবারও পিছিয়ে পড়তে শুরু করে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক। পরবর্তী তিন বছরে কর-পরবর্তী লোকসান ৭৯ শতাংশের বেশি বেড়েছে। চলমান তারল্য সংকটের মধ্যেই ঋণ-আমানতের সুদহারে বড় পরিবর্তন সর্বশেষ সমাপ্ত আর্থিক বছরে ব্যাংকটির সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০১৮ সালে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের বিনিয়োগ আয় প্রায় ৩৫ কোটি ১৮ লাখ টাকায় নেমেছে। যার এর আগের বছরেও প্রায় ৩৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা ছিল। অর্থাৎ সুদহারে পরিবর্তনের কারণে এক বছরেই ব্যাংকটির আয় ১০ শতাংশের বেশি কমেছে। আর্থিক বছর শেষে প্রায় দুই কোটি ৩২ লাখ টাকা পরিচালন লোকসান গুনেছে। এরপর বাড়তি ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের প্রভাবে আর্থিক বছর শেষে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের কর-পরবর্তী লোকসান প্রায় ৪৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। যার এর আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি।
উল্লেখ্য, ১৯৯০ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকটি ২০০৭ সালের ১৮ জুন পর্যন্ত ‘দ্য ওরিয়েন্টাল ব্যাংক লিমিটেড’ নামে পরিচিত ছিল। পরে জালিয়াতির অভিযোগ এনে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটি অধিগ্রহণ করে। এরপর মালয়েশিয়াভিত্তিক আইসিবি ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপ হোল্ডিংসের কাছে ব্যাংকটির সিংহভাগ শেয়ার বিক্রি করা হয়। এরপর ‘আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক’ নামে পথচলা শুরু করে ব্যাংকটি।
বর্তমানে ব্যাংকটির মোট প্রায় ৬৬ কোটি ৪৭ লাখ শেয়ারের মধ্যে ৫৯ দশমিক ৭৮ উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে। এর বাইরে সরকারের হাতে দশমিক ১৭ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ২২ দশমিক ৩৬ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে দশমিক ২৩ শতাংশ এবং বাকি ২৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে। প্রতিকূল ব্যবসায়িক পরিবেশ, মূলধন ঘাটতি, খেলাপি ঋণের বোঝা, শেয়ার বাজেয়াপ্ত করা নিয়ে মামলা ও অতীতের দায়-দেনার কারণে ঘুরে দাঁড়াতে হিমশিম খাচ্ছে ব্যাংকটি। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি এক হাজার ৯৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। লোকসানের কারণে লভ্যাংশ দিতে না পেরে প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে ‘জেড’ ক্যাটেগরিতে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক।




