নিজস্ব প্রতিবেদক:বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, দেশের জ্বালানি খাতের জন্য আগামী দুই বছর ঝুঁকিপূর্ণ হবে। আগামী দুই বছরের মধ্যে সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে প্রাণপণ চেষ্টা করতে হবে এবং এ কাজে অনেক চ্যালেঞ্জ থাকবে।
গতকাল রাজধানীর ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই) ভবনে ‘বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার: বঙ্গবন্ধুর দর্শন’Ñশীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির সভাপতি জসিম উদ্দিন।
আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশ গ্যাস সংকট থেকে বেরিয়ে আসবে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা ভোলা থেকে অব্যবহƒত গ্যাস ঢাকায় নিয়ে আসব এবং বিশাল ভূগর্ভস্থ গ্যাস পাইপলাইনগুলোকে প্রতিস্থাপন করব। পাইপলাইন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা লাগবে।’
বিদ্যুৎ খাত সম্পর্কে নসরুল হামিদ বলেন, শতভাগ বিদ্যুতায়নের পর এখন সরকারের লক্ষ্য নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা। তিনি বলেন, ডেনমার্কের একটি কোম্পানি অফশোরে উইন্ড পাওয়ার (সমুদ্রের বাতাসের শক্তি থেকে নেয়া শক্তি) করার জন্য ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। অফশোরে গ্যাসের জন্য মাল্টি ক্লায়েন্ট সার্ভে শেষ পর্যায়ে। গভীর সমুদ্রে কাজ করার জন্য একটা অবস্থানে এসেছি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে অনেক কোম্পানি সমুদ্রে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছে। এক্সন মবিল লিখিতভাবে আবেদন করেছে। আমরা সেটা যাচাই-বাছাই করছি। আমাদের সার্ভে কমপ্লিট হলে দরপত্র আহ্বান করব। আশা করছি, সমুদ্র থেকে আগামী ৭-৮ বছরের মধ্যে আমরা গ্যাস পাব।
নসরুল হামিদ বলেন, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর তিন বছরের মাথায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে মূল খুঁটি সম্পাদন করে গেছেন। বিদেশি কোম্পানি দ্বারা আবিষ্কৃত ৫টি গ্যাসফিল্ড ১২ কোটি টাকায় কিনে নিয়েছিলেন। সে ৫টি গ্যাসফিল্ড এখনও দেশকে সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে।
১৯৯৬ সালে বিদ্যুৎ খাতকে প্রাইভেট সেক্টরে নিয়ে আসার আইন আওয়ামী সরকার করেছিল জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তার জন্য অনেক বাধাবিপত্তি আসে, বলা হয়েছিল যে ব্যবসায়ীরা এ খাতে একচেটিয়া ব্যবসা করবে। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেগুলোকে পাত্তা না দিয়ে সে আইন পাস করেন। এসবই জ্বালানি নিরাপত্তা।
তিনি বলেন, ২০১০ সালে জ্বালানি খাতের মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হয়। যেটা এখনও বর্তমান রয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতির তো পরিবর্তন হয়। তাই চার বছর পরপর তার রিভিউ করতে হয়।
বিদ্যুতের চাহিদার কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, চর অঞ্চলেও বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। যেটা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ, সবার কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে হবে। যদিও এসব অঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছানো সহজ নয়। আমাদের লক্ষ্য, সাশ্রয়ী মূল্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা।
নসরুল হামিদ বলেন, বাংলাদেশে গ্যাসের যে রিজার্ভ, তাতে হয়তো আর ৮ বছর চলবে। এরপর কী হবে? দেশে এখন অনেক গ্যাসকূপ আবিষ্কার হয়েছে, ছোট করে হলেও প্রতি বছর ১০০টি কূপ খনন করলেও ২ বিলিয়ন ডলার লাগবে। সেই আর্থিক ব্যবস্থাপনাও চিন্তা করতে হবে। যেমন বাপেক্স নিজের এরিয়ায় কাজ করে। দুই বছর ড্রিলিং করে ৬৫০ এমএমসিএফ গ্যাস পাওয়া যাবে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমাদের আরেকটা সংযোজন হচ্ছে সিঙ্গেল মুরিং পাইপলাইন। পানির নিচ দিয়ে ২৬০ কিলোমিটার লাইন তৈরি করা হয়েছে। আগে মাদার ভেসেল থেকে তেল খালাস করতে ১২ দিন লাগত। এখন লাগবে ৪৮ ঘণ্টা; যা সরাসরি পতেঙ্গায় চলে যাবে। এছাড়া মহেশখালীতেও ডিপো করা হয়েছে যদি পতেঙ্গায় কোনো বিপর্যয় হয়। এটাও জ্বালানি নিরাপত্তার অংশ।’
তিনি বলেন, আরেকটি বিষয়, পতেঙ্গা থেকে ঢাকায় সরাসরি তেল সরবরাহের লক্ষ্যে পাইপলাইন তৈরি করা হবে। ঢাকায় প্রতিদিন ২৫০ তেলবাহী ট্রাক ঢোকে, এখান থেকে প্রচুর পরিমাণ তেল নষ্ট হয়। আগামী বছর থেকে তা আর হবে না।
প্রতিমন্ত্রীর কথার প্রতিধ্বনি করে জ্বালানি সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে শিল্পক্ষেত্রে আর গ্যাস সংকট থাকবে না। তিনি বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সই করেছি এবং আরও তিনটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সইয়ের চেষ্টা চলছে। সেই সঙ্গে স্টোরেজ ও আনলোডিং ক্ষমতা বাড়াতে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য আরও চুক্তি সইয়ের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম বলেন, দেশের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা এখনও অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। অথচ দেশে ব্যাপক গ্যাস সংকট চলছে। বর্তমান গ্যাস সংকট মোকাবিলার সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে অনুসন্ধান কাজ যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি সমীর সাত্তার বলেন, অবিলম্বে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে সারাদেশে গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহসভাপতি দেওয়ান সুলতান আহমেদ বলেন, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ প্রায়ই অবৈধ গ্যাস সংযোগ অপসারণে তৎপর হয়। কিন্তু কোনো অর্থ ছাড়াই কতদিন ধরে এই অবৈধ গ্রাহকরা এ ধরনের গ্যাস ব্যবহার করছেন, তা তারা কখনোই প্রকাশ করে না।
এফবিসিসিআইয়ের উপদেষ্টা আবদুল হক বলেন, বিভিন্ন উদ্যোগের পরও গ্যাস অনুসন্ধানে বড় কোনো অগ্রগতি নেই। তাই কী কী শূন্যতা রয়েছে, তা চিহ্নিত করতে হবে।
ব্যবসায়ী আবুল হাসনাত বলেন, এটা খুবই দুঃখজনক যে অনেক ব্যবসায়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের ফাইল মন্ত্রণালয়ে জমা দেন। কিন্তু ফাইলগুলো যথাযথ গতিতে চলে না। এমনকি ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে কোনো কোনো ফাইল এক জায়গায় রেখে দেয়া হয়।




