ভ্যাট বৃদ্ধিই কি সংকটের সমাধান ?

সংগীত কুমার: বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের কয়েক ধাপে ভ্যাট বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের জীবনমান ব্যয় বহুগুণে বেড়ে গিয়েছিল। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপক লুটপাটের ফলে দেশের অর্থনীতি প্রায় ধসে পড়েছিল। ভুয়া প্রবৃদ্ধি ও রপ্তানির হিসাব দেখানোসহ মেগা প্রকল্পগুলো ছিল লুটপাটের আঁতুড়ঘর। এসব নানা কারণে বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী ও নি¤œআয়ের মানুষ বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের আন্দোলনের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল, যাতে তারা অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বেকারত্ব থেকে মুক্তি পায়। জুলাইয়ে বিপ্লবের পর তারা স্বপ্ন বুনেছিল, এবার হয়তো তাদের সুদিন ফিরবে। অন্তর্বর্তী সরকার তাদের চাহিদাগুলো বুঝবে এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে সচেষ্ট হবে, পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করে তুলতে সক্ষম হবে। কিন্তু তাদের এসব স্বপ্ন পুরোপুরি পূরণে হয়তো অন্তর্বর্তী সরকার আপারগ হচ্ছে, কারণ পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের মতো বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও ভ্যাট বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের পথে হাঁটছে।

গত তিন বছর থেকে চলা উচ্চমুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের ঘাড়ে এরই মধ্যে নাভিশ্বাস ফেলছে। দেশের বিদ্যমান নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে এই কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত। এছাড়া দ্রব্যমূল্যের অগ্রগতি, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, মধ্যস্বত্বভোগীদের উৎপাত, বাজার সিন্ডিকেট এবং সর্বশেষ ভ্যাট বৃদ্ধির চাপ জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা শুধু জনগণের অসন্তোষের মাত্রাকে বাড়িয়ে তুলছে!
সম্প্রতি ঋণের শর্ত হিসেবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ করার শর্ত দিয়েছে। বাংলাদেশকে দেয়া ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের চলমান ঋণ কর্মসূচির চতুর্থ কিস্তির অর্থ ছাড়ের আগে গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ঘুরে গেছে আইএমএফের এক প্রতিনিধিদল। তখন চলমান ঋণ কর্মসূচির আকার আরও ৭৫ কোটি ডলার বৃদ্ধির অনুরোধ করে বর্তমান সরকার। চলমান অবস্থা বিবেচনা করে বাংলাদেশের এই প্রস্তাবেও সম্মত হয় আইএমএফ। তবে এর জন্য কর আদায় ও নীতি গ্রহণকারী সংস্থাকে আলাদা করসহ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর মতো কিছু কঠোর শর্ত দিয়েছে আইএমএফ।

এরই ধারাবাহিকতায় চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মাঝামাঝি গত ৯ জানুয়ারি ভ্যাট বৃদ্ধি নিয়ে দুটি অধ্যাদেশ জারি করে সরকার। অধ্যাদেশ দুটি হলো মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ এবং দ্য এক্সাইজ অ্যান্ড সল্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫। এ দুটি অধ্যাদেশ জারির পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভ্যাট বিভাগ এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করে। ফলে এই অধ্যাদেশের পরিবর্তনগুলো পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়ে গেছে।

নতুন করে ভ্যাট বৃদ্ধির ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয়সহ শতাধিক পণ্য ও সেবার ওপর ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বেড়ে গেল, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে যাবে ১২ হাজার কোটি টাকা। ধরুন আপনার পরিবারের রান্না যদি এলপি গ্যাসে হয়, তাহলে ১২ কেজির সিলিন্ডারে আপনার খরচ বাড়বে ৪৩ টাকা। সকালে নাশতার টেবিলে যদি আপেল, নাশপাতি, তরমুজ ও আঙুরের মতো ফল কিংবা জুস থাকে, তাহলে প্রতি কেজি ফলের জন্য আগের তুলনায় আপনাকে ১৫ টাকা বেশি খরচ করতে হবে। মুঠোফোনে দরকারি কথা সারবেন, কিংবা ইন্টারনেট ব্যবহার করবেন, প্রতি ১০০ টাকা রিচার্জে ৫৬ টাকা ৩০ পয়সা শুধু ভ্যাটেই যাবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় ইন্টারনেট পরিষেবায় বাংলাদেশ তলানিতে থাকলেও ভ্যাট দেয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বের সর্বোচ্চ স্থানে। যদি ভাবেন আমি তো ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহার করি, আমার কোনো চিন্তা নেই। ধৈর্য ধরুন আপনার জন্যও সুখবর আছে, আগের ৫০০ টাকার প্যাকেজ এখন আপনাকে ৫৫০ টাকায় কিনতে হবেÑএককথায় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটে ভ্যাট আরও ১০ শতাংশ বেড়েছে।

চাকরি বা ব্যবসায়িক কাজে রেস্তোরাঁয় খেতে যাবেন, সেখানে আপনাকে এক হাজার টাকায় ভ্যাট গুনতে হবে ১৫০ টাকা। পরিবারের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য ওষুধ কিনবেন, নতুন কর নীতিতে সরবরাহ পর্যায়ে ওষুধের ভ্যাট ২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে তিন শতাংশ করা হয়েছে। বাসায় আপনার ছোট বাচ্চার জন্য বিস্কুট কিনবেন? প্রতি ২৫০ গ্রাম টোস্ট বিস্কুটের প্যাকেটে দাম বাড়বে ৯ টাকা। পরিবার নিয়ে অবসরে সিনেমা দেখতে যাবেন, তাহলে ৩০০ টাকার একটি টিকিটে আপনাকে ভ্যাট দিতে হবে ৪৫ টাকা। নিজের জন্য একটা শার্ট কিনবেন, এক হাজার টাকার একটি শার্টে আপনার ভ্যাট আসবে ১৫০ টাকা। ওয়াশরুমে গিয়েও আপনি শান্তি পাবেন না, ওয়াশরুমের পর ৬৫-৭০ টাকা দামের এক প্যাকেট ফেসিয়াল টিস্যুর দাম সাত-আট টাকা বেড়ে যাবে। এছাড়া মূল্য বৃদ্ধির তালিকায় যুক্ত হবে মিষ্টি, ফলের রস, ড্রিঙ্কস, সিগারেট, বিভিন্ন তাজা ফল, রং ডিটারজেন্ট, পটেটো ফ্লেক্স, চশমার প্লাস্টিক ও মেটাল ফ্রেম, রিডিং গ্লাস ও সানগ্লাস। দাম বাড়বে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার ও তাতে ব্যবহƒত তেল, বিদ্যুতের খুঁটি, সিআর কোয়েল, জিআই তার ইত্যাদির।

তারপর ধরেন, অনেক দিন ধরে টাকা জমিয়েছেন শখের মোটরসাইকেলটি কিনবেন বলে। ভ্যাট বৃদ্ধির ফলে আপনাকে আগের তুলনায় ১০-১৫ শতাংশ বেশি কর দিয়ে মোটরসাইকেল ক্রয় করতে হবে। মোবাইল ফোনসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিকস পণ্যের ভ্যাটও ১০ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। অপ্রক্রিয়াজাত তামাক ও তামাকের উচ্ছিষ্ট আমদানিতে শুল্ক ৬০ শতাংশ বাড়িয়ে ১০০ শতাংশ করা হয়েছে। কাপড়চোপড়ও এখন ধুতে হবে হিসেবি হয়ে, কারণ সাবান, সাবান হিসেবে ব্যবহƒত সারফেজ অ্যাকটিভ সামগ্রী ও সমজাতীয় পণ্যে শুল্ক ১৫ থেকে বাড়িয়ে ৬০ শতাংশ করা হয়েছে। ডিটারজেন্ট আমদানির ক্ষেত্রে আরোপিত শুল্ক ২০ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করা হয়েছে।
ভ্যাটের আওতায় আসছেন ছোট ব্যবসায়ীরাও। অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, বছরে ৩০ লাখ টাকার বেশি টার্নওভার থাকলে ভ্যাটের খাতায় (টার্নওভার করের তালিকাভুক্তি) নাম লেখাতে হবে, যা আগে ছিল ৫০ লাখ টাকা।

চলমান উচ্চ মুদ্রাস্ফীতিতে সাধারণ মানুষের এমনিতেই হাঁসফাঁস অবস্থা। এসবের মধ্যে কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এটা সম্পূর্ণভাবে আইএমএফের শর্তের কাছে নতি স্বীকার এবং জনগণের সঙ্গে অবিচার। সরকার চাইলে আইএমএফের কাছে আরও সময় নিতে পারত। কিন্তু সরকার বেছে নিল ভ্যাট বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত, যা সাধারণ মানুষকে অধিক চাপের মধ্যে ফেলবে এবং সামনে তা তাদের অসহিষ্ণুতাকেও বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাবে। সার্বিকভাবে বর্তমান সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থনের ওপরেও এই কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এজন্য সাধারণ মানুষের কথা মাথায় রেখে সরকারকে বিকল্প সমাধানগুলোর ওপর নজর দেয়া উচিত। যেমন: বাংলাদেশে কর-জিডিপির অনুপাত শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, গোটা দুনিয়ার মধ্যেই অন্যতম কম। ওইসিডির তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশের কর-জিডিপির অনুপাত মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোয়, যা ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ২৪ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং উন্নত দেশগুলোতে ৩৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। ফলে বাংলাদেশের কর আহরণ বৃদ্ধি করতে হবে অবশ্যই। তবে কর আহরণ বৃদ্ধির জন্য ভ্যাট বৃদ্ধি করা যৌক্তিক সমাধান নয়, ভ্যাট ও শুল্কের মতো পরোক্ষ করের পরিবর্তে প্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে আয়কর বৃদ্ধি করাই জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ করের বদলে পরোক্ষ কর আদায়ের ওপর বেশি নির্ভর করা হলে তা ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বৃদ্ধি করে। যখন সরকারের আয়ের বেশিরভাগটা প্রত্যক্ষ করের বদলে পরোক্ষ কর, অর্থাৎ আমদানি শুল্ক, ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক, সারচার্জ ইত্যাদির মাধ্যমে সর্বজনের কাছ থেকে আদায় করা হয়, তখন শ্রেণিভিত্তিক সম্পদ স্থানান্তরের ঘটনাটি ঘটে। বাংলাদেশে বিগত সরকারের আমলে ধনীদের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ আয়করের তুলনায় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে শুল্ক ও ভ্যাটের মতো পরোক্ষ কর বেশি আদায় করা হয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।

যেখানে উন্নত দেশগুলোয় মোট আয়ের রাজস্বের ৭০-৮০ শতাংশ এবং প্রতিবেশী দেশ ভারতে ৫০ শতাংশের বেশি প্রত্যক্ষ কর সংগ্রহ করা হয়, সেখানে বাংলাদেশে কর আয়ের ৬৫ শতাংশই আদায় করা হয় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের শুল্ক ও ভ্যাট ইত্যাদি পরোক্ষ করের মাধ্যমে। সিপিডির এক গবেষণা অনুসারে, দেশে করযোগ্য আয় করেও ৬৮ শতাংশ মানুষ আয়কর দেয় না। জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে দুই লাখ ১৩ হাজার কোম্পানি রেজিস্টার্ড হলেও রিটার্ন দাখিল করে মাত্র ৪৫ হাজার কোম্পানি। বিভিন্ন খাতে কর ফাঁকি ও কর এড়িয়ে যাওয়ার কারণে ৫৫ হাজার ৮০০ কোটি থেকে দুই লাখ ৯২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব আয় কম হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এই বিপুল পরিমাণ কর ফাঁকি বন্ধে কিংবা প্রত্যক্ষ কর আহরণে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না!

বিগত সরকারের আমলের মতো বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও ধনী ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ কর আদায় জোরদার করার বদলে আরও বেশি পরোক্ষ কর আদায়ের দিকে হাঁটছে। সরকার কর ফাঁকি রোধ ও বিদেশে পাচার হওয়া টাকা উদ্ধারে জোর দেয়ার বদলে অগণতান্ত্রিকভাবে আইএমএফের শর্ত মেনে ভ্যাট বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের দুর্দশা বাড়িয়ে তুলছে, যা মোটেও যৌক্তিক সমাধান নয়; বরং এটি মুদ্রাস্ফীতির মতো সমস্যাকে আরও দীর্ঘায়িত করবে এবং নি¤œ আয়ের মানুষদের চরম দুর্দশার মধ্যে ফেলবে। আন্তর্জাতিক পুঁজির স্বার্থরক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান আইএমএফের প্রেসক্রিপশন মেনে পরোক্ষ কর বৃদ্ধির মতো বৈষম্য সৃষ্টিকারী পদক্ষেপ গ্রহণ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের স্পিরিটের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। কাজেই সরকারকে ভ্যাটের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির সহজ রাস্তা থেকে সরে আসতে হবে। ভ্যাট ও শুল্কের মতো পরোক্ষ করের বদলে ধনিক গোষ্ঠীর আয় ও সম্পদ থেকে প্রত্যক্ষ কর আদায় বাড়াতে হবে। যদিও এ পদ্ধতি বেশ জটিল, কিন্তু জুলাই বিপ্লবের স্পিরিটকে সামনে রেখে অন্তর্বর্তী সরকারকে এ চ্যালেঞ্জ নিতেই হবে।