কুদরতে খোদা সবুজ, কুষ্টিয়া: ভূমি, পোস্ট অফিসসহ অধিকাংশ জরুরি সরকারি পরিষেবা নেই। একমাত্র পাকা সড়কটিও জরাজীর্ণ। চিকিৎসার জন্য একটি ইউপি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থাকলেও নেই জনবল। ন্যূনতম নাগরিক সেবা না থাকায় ব্যাপক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর চরসাদিপুর ইউনিয়নের বাসিন্দাদের।
জানা যায়, কুষ্টিয়া জেলা শহর থেকে প্রায় ২৯ কিলোমটার দূরে অবস্থিত কুমারখালীর চরসাদিপুর। পদ্মা নদীর তীরঘেঁষে উত্তরে প্রায় ২৫ বর্গমাইল আয়তনের চরসাদীপুর ইউনিয়নটি ১৯৯৮ সালে গঠিত হয়। এই ইউনিয়নের ৯টি গ্রামে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের বসবাস। তাদের জন্য রয়েছে একটি ইউপি স্বাস্থ্য কেন্দ্র, ছয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, চারটি মাদরাসা, একটি এতিমখানা ও চারটি বেসরকারি কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ইউনিয়নটি উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমটার এবং জেলা শহর থেকে প্রায় ২৯ কিলোমটার দূরে, যার উত্তর ও পশ্চিমে রয়েছে পাবনা জেলার হেমায়েতপুর ও দৌগাছি ইউনিয়ন। ১৯৬২ সালের আগ পর্যন্ত এটি পাবনা সদরের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পদ্মা নদীর কারণে তাদের নেই অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। ফলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে উন্নয়নসহ সব কার্যক্রম। সর্বনাশা পদ্মানদীর কারণে তাদের কপাল পুড়েছে। তার কারণেই বঞ্চিত নাগরিক ও মৌলিক সেবা থেকে।
স্থানীয় সাদিপুর বাজারের পল্লী চিকিৎসক মো. শহিদুল আলম (৭০) আক্ষেপ করে বলেন, বড় অফিসারদের মুখ দেখিনি কোনোদিন। ছোটরাও ঠিকঠাক আসে না। হাসাপাতাল, পরিষদ ও স্কুল কখন খোলে কখন বন্ধ হয়, কিছুই বোঝা যায় না। হাসপাতালে রোগী গেলে ডাক্তার থাকে না, ওষুধ থাকে না। শুনি সরকার কতকিছু বরাদ্দ দেয়, কিছুই পাই না। সব থেকে যায় নদীর ওপারে। কোনো সেবায় পার হয় না নদী। ৩০ হাজার মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়েছে এক পদ্মা। তার দাবি, হয় সরকার পদ্মা নদীতে সেতু নির্মাণ করুক, নইলে পার্শ্ববর্তী পাবনার সঙ্গে সংযুক্ত করে দিক।
সরকারকে ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়েও সেবা না পাওয়ার অভিযোগ ষাটোর্ধ্ব কৃষক মোমিন মণ্ডলের। তিনি বলেন, সাদিপুরে ভূমি অফিস নেই। জমির খাজনাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে নদী পাড়ি দিয়ে যেতে হয় শিলাইদহে। সেখানেও ঘুষ লেনদন, সময়মতো কাজ না হওয়াসহ নানা হয়রানির শিকার হতে হয়।
জানা গেছে, প্রায় ছয় কিলোমিটার পদ্মা নদীর বুকের ওপর দিয়ে জেলা ও উপজেলা শহরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন চর সাদিপুরের বাসিন্দারা। ভরা বর্ষা মৌসুমে যাতায়াতের একমাত্র বাহন ইঞ্জিনচালিত নৌকা। আর শুষ্ক মৌসুমে নদীর অধিকাংশ জুড়ে জাগে চর। তখন পানিতে নৌকা ও চরে ইজিবাইক, বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল এবং পাঁয়ে হেঁটে যাতায়াত করেন তারা। এতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় ও সময় অপচয়ের সঙ্গে পাল্লা দেয় চরম ভোগান্তি।
জানা গেছে, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় অবহেলিত সাদিপুরের মানুষ। প্রশাসনের নজরদারি অভাবে দিনে দিনে সেখানে বাড়ছে মাদক, বাল্যবিয়ে, চুরি, ডাকাতিসহ নানা অপরাধমূলক কাজ। ইউনিয়নটির কৃষিজমিতে একে একে গড়ে উঠেছে প্রায় ৩৩টি অবৈধ ইটভাটা। এক যুগ ধরে সংস্কারের অভাবে চলাচলের একমাত্র পাকা সড়কটিও খানাখন্দে ভরা। লেনদেন ও সঞ্চয়ের জন্য উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নে সরকারি-বেসরকারি একাধিক ব্যাংক থাকলেও চরসাদিপুরে নেই একটিও। সেখানে নেই পোস্ট অফিস ও ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে পদ থাকলেও নেই গর্ভবতী মহিলাদের চিকিৎসক। নেই পুলিশ ক্যাম্প। এসব ছাড়াও নানা কারণে বছরের পর বছর চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ছয় কিলোমিটার চওড়া পদ্মা নদীর চার কিলোমিটার জুড়ে চর জেগেছে। মানুষ দুই কিলোমিটার নদী নৌকায় এবং চরে ইজিবাক, মোরসাইকেল ও পাঁয়ে হেঁটে চলাচল করছেন।
কথা হয় স্থানীয় ঘোষপুর বাজারের ভাংরী মালামালের ব্যবসায়ী বোরহান উদ্দিন ও আব্দুল হামিদের সঙ্গে। তারা জানান, ৩০ টাকা অটোগাড়িতে এবং ৪০ টাকা নৌকার ঘাটে দিয়ে জরুরি কাজে কুমারখালী গিয়েছিলাম। চর পাড়ি দিয়ে শহরে যেতে-আসতে দিন চলে যায়। অথচ সেতু থাকলে ২০-৩০ মিনিটেই হয়ে যেত। তাদের ভাষ্য, চরের মানুষের ভোগান্তি দেখার কেউ নেই।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ফসলের মাঠে গড়ে উঠেছে অংসখ্য ইটভাটা। ভাটায় আইন ভেঙে পুড়ছে কাঠ। কৃষিজমি ও নদীকূল থেকে কাটা হচ্ছে মাটি ও বালু। ইউনিয়নে যোগাযোগের একমাত্র পাকা সড়কটিও খানাখন্দে ভরা ও জরাজীর্ণ। চলছে শেলোইঞ্জিন-চালিত অবৈধ লাটাহাম্বা গাড়ি। ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে মানুষ।
ইজিবাইক চালক কোমল হোসেন বলেন, সাদিপুরের একমাত্র পাকা সড়কটি ভাটার গাড়ির দখলে। খানাখন্দে ভরা সড়কে গাড়ি উল্টে যায়। মা-বোনেরা গাড়িতে উঠে দোয়া কালেমা পড়তে পড়তে যায়। ভাটার গাড়ি ও সড়ক সংস্কারের দাবি তার।
সায়মা খাতুন নামের মাদ্রাসা শিক্ষার্থী বলেন, ধুলাবালি আর গাড়ির কারণে রাস্তা দিয়ে চলা যায় না। নদীর কারণে কুমারখালীর মানুষ হয়েও উপজেলা শহরটি কোনোদিন দেখা হয়নি। সবকিছু পাবনা থেকেই করা হয়।
৩০ হাজার মানুষের জন্য অভিশাপ পদ্মানদী বলে মনে করেন চরসাদিপুর পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মেছের আলী খাঁ। তিনি বলেন, জনস্বার্থে ব্যাংক, ক্যাম্প, পোস্ট ও ভূমি অফিসের জন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে একাধিকবার জানিয়েছি। তবুও কোনো ফল পাওয়া যায়নি। সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছেন তিনি।
উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় সাদিপুরবাসীর চরম দুর্ভোগের কথা স্বীকার করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম মিকাইল ইসলাম। তিনি বলেন, পদ্মার দুর্গমচরে অবস্থিত ইউনিয়ন। নৌকা তাদের একমাত্র যানবাহন। সেজন্য সেখানকার মানুষ নানামুখী সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তবে বাসিন্দারা লিখিতভাবে জানালে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।




