খন্দকার আপন হোসাইন: গণিত ব্যক্তির জীবনের প্রতিটি স্তরে অপরিহার্য। গণিত শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সভ্যতার ক্রমবিকাশে গণিতের গুরুত্ব অপরিসীম। একদিকে গণিত আমাদের দৈনন্দিন কাজে সহায়তা করে, অন্যদিকে জ্ঞানের জগতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য গণিত একটি মৌলিক ও আবশ্যকীয় বিষয়। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকেই কেন শিক্ষার্থীরা ভয় পায়? কেন গণিতকে অনেকের কাছে দুর্গম পর্বত মনে হয়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোতে একধরনের অমিল পাওয়া যায়। বাংলাদেশে মাধ্যমিক স্তরে গণিত শিক্ষার বর্তমান অবস্থা অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। উন্নত দেশসমূহের শিক্ষা ব্যবস্থার তুলনায় আমাদের এ খাত এখনো পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থায় গণিত শিক্ষার যে আধুনিক ধারণা রয়েছে, তা বিশ্লেষণ করলে আমাদের শিক্ষার দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গণিতভীতি একটি সাধারণ সমস্যা। ছোট থেকে বড় সব স্তরের শিক্ষার্থীর মধ্যেই এই ভীতি লক্ষ করা যায়। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই এর বীজ রোপিত হয়। শিশু যখন প্রথমবার যোগ-বিয়োগ শেখে, তখন তাকে শেখানোর পদ্ধতি যথাযথ না হলে তার মনে ভীতি সৃষ্টি হতে পারে। একবার এই ভীতি গড়ে উঠলে তা কাটানো কঠিন। গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের জন্য এই সমস্যা আরও প্রকট। দক্ষ গণিত শিক্ষকের অভাব এবং পাঠ্যসূচির জটিলতা তাদের মনে গণিতভীতির জন্ম দেয়। অনেক শিক্ষক ক্লাসে গণিত শেখানোর সময় উদ্ভাবনী পদ্ধতি ব্যবহার করেন না। ফলে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ হারিয়ে যায়। শহরের তুলনায় গ্রামের স্কুলগুলোতে গণিত শিক্ষার পদ্ধতি এখনও অনেক পিছিয়ে। শহুরে স্কুলগুলোতে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের সুবিধা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা অ্যানিমেশন বা ভিডিওর মাধ্যমে জটিল বিষয়গুলো সহজে বুঝতে পারে। কিন্তু গ্রামের স্কুলগুলোতে সেই সুবিধা নেই।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গণিতভীতি দূর করতে অনেক দেশ ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে। তারমধ্যে অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে ফিনল্যান্ড। তাদের শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে পরিচিত। এখানে কোনও আলাদা পরীক্ষা বা গ্রেডিং পদ্ধতি নেই। শিক্ষার্থীরা প্রকৃতির সঙ্গে মিশে শেখে। গণিত তাদের কাছে আনন্দের একটি বিষয়। যুক্তরাজ্যে গণিত শেখানোর জন্য গেম-ভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। যেমন— শিক্ষার্থীরা খেলতে খেলতে যোগ-বিয়োগ বা গুণ-ভাগ শেখে। এতে তারা গণিতকে মজার একটি খেলা হিসেবে গ্রহণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু স্কুলে মন্টেসরি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এখানে গণিত শেখানোর জন্য বাস্তব উপকরণ ব্যবহার করা হয়। শিক্ষার্থীরা নিজের হাতে সংখ্যা গুনে শেখে। এতে তাদের মনে গণিতভীতি তৈরি হয় না।
বাংলাদেশের মাধ্যমিক পর্যায়ে গণিতকে বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে পড়ানো হয়। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি শ্রেণিতে গণিত শিক্ষা দেওয়া হয়। প্রতিটি স্তরে নির্ধারিত সিলেবাস রয়েছে। তবে, বেশিরভাগ শিক্ষার্থী গণিতে পিছিয়ে পড়ে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। কারণগুলো হলো পর্যাপ্ত সংখ্যক দক্ষ গণিত শিক্ষকের অভাব,। গণিত শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের অনীহা। পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতি এবং ব্যবহারিক শিক্ষার অভাব। আবার অনেক ক্ষেত্রে গণিত শেখানোর পদ্ধতি হয় মুখস্থনির্ভর। এতে শিক্ষার্থীরা গণিতের মূল ধারণা ও ব্যবহারিক প্রয়োগ বুঝতে পারে না। ফলে, তারা পরীক্ষায় ভালো ফল করতে ব্যর্থ হয় এবং আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। বাংলাদেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের বেশিরভাগ শিক্ষক তাদের পাঠদানে প্রচলিত পদ্ধতি ব্যবহার করেন। নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এখনো সীমিত। গণিত শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। বিশেষত মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম এবং উদ্ভাবনী পদ্ধতির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের গণিত শিক্ষা উন্নত করতে হলে আমাদের আধুনিক শিক্ষার ধারণা গ্রহণ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রীয় শিক্ষার ধারণা থেকে অনেক কিছু শেখা যেতে পারে। তবে এসব ধারণা আমাদের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগই পারে গণিত শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে। গণিতভীতি দূর করা সময়সাপেক্ষ কাজ। তবে এটি অসম্ভব নয়। প্রয়োজন সঠিক উদ্যোগ এবং আধুনিক পদ্ধতি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিতের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করতে হবে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় “সংখ্যার জগৎও এক ধ্রুপদী সংগীত। এই সংগীত বুঝতে পারাই জ্ঞানের আসল আনন্দ।” আমাদের শিক্ষার্থীদেরও এই আনন্দে অংশ নিতে দিতে হবে। তবেই গড়ে উঠবে এক গণিতমুখী ও আলোকিত বাংলাদেশ।
গণিতভীতি দূর করার জন্য আমাদের দেশে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। মাল্টিমিডিয়া উপস্থাপনা গণিতকে সহজ ও আনন্দদায়ক করে তোলে। সুতরাং সর্বাগ্রে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ব্যবহার আরও জোরদার করতে হবে। গণিত অলিম্পিয়াড আয়োজন বাড়াতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড বেশ জনপ্রিয়। এক সমীক্ষায় এসেছে এই গণিত অলিম্পিয়াড শিক্ষার্থীদের গণিতের প্রতি আগ্রহ বাড়ায় এবং গণিতভীতি কমাতে সাহায্য করে। এছাড়াও মেন্টরিং পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। অভিজ্ঞ শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগতভাবে সমস্যাগুলো বুঝিয়ে দিলে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে। গণিতভিত্তিক গেম এবং শিক্ষামূলক অ্যাপ ব্যবহারের মাধ্যমেও গণিতভীতি দূর করা সম্ভব।
গণিত কেবল পরীক্ষার জন্য নয় বরং বাস্তব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত হচ্ছে। বাজার করতে গেলে, রান্নায় মাপজোক করতে গেলে বা গাড়ির গতিবেগ পরিমাপ করতে গেলেও গণিতের প্রয়োজন হয়। বিশ্বখ্যাত গণিতবিদ পিজে ডেভিস বলেছিলেন, “গণিত হলো জীবনের সংগীত। এটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছড়িয়ে আছে।” আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই সচেতনতা তৈরি করতে হবে যে, গণিত তাদের জীবনের অংশ। ইউনেস্কোর ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গণিতভীতি দূর করতে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করলে শিক্ষার্থীদের সফলতার হার ৭০% পর্যন্ত বেড়ে যায়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, “গণিত শেখানোর সময় মাল্টিমিডিয়া এবং গেম ব্যবহার করলে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ৬৫% বৃদ্ধি পায়।” আমাদের দেশে এই পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করা হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিতভীতি অনেকাংশে কমে যাবে। একজন দক্ষ শিক্ষকের ভূমিকা গণিতভীতি দূর করতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকের উচিত শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা, জটিল বিষয়গুলো সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা এবং গণিতকে আনন্দদায়ক করে তোলা। একজন শিক্ষকের একটি অনুপ্রেরণামূলক কথা শিক্ষার্থীর জীবন বদলে দিতে পারে।
বর্তমান বিশ্বে সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা বলতে বোঝায়— বিজ্ঞান, সাহিত্য, গণিত, শিল্পকলা সবকিছু একসঙ্গে শেখা। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সব বিষয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা পায়। ফিনল্যান্ডের স্কুলগুলোতে একটি বিষয় শেখানোর সময় সেটিকে নানা কোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হয়। যেমন ‘সমুদ্র’ বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান, গণিত, ইতিহাস এবং ভূগোলসহ সবকিছু একসঙ্গে শেখে। বাংলাদেশেও এই পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ‘বৃষ্টি’ নিয়ে পাঠদানের সময় শিক্ষার্থীদের বৃষ্টির জল কত লিটার জমা হয় বা কত মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, তা শেখানো যেতে পারে। একইসঙ্গে বৃষ্টির কারণ ও প্রভাব নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা শহর ও গ্রামে বিভক্ত। শহরের শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি সুবিধা ভোগ করে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাস, অভিজ্ঞ শিক্ষক, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার তাদের জন্য সহজলভ্য। অপরদিকে গ্রামের শিক্ষার্থীরা এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অনেক স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে শিক্ষার্থীরা তেমন কিছু শেখার সুযোগ পায় না। ফলে তারা আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না। তবে প্রযুক্তির বিস্তার এবং সরকারের নানা উদ্যোগের ফলে গ্রামের শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে এখন গ্রামের শিক্ষার্থীরাও ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করতে পারছে।
যুক্তরাষ্ট্রে গণিত শিক্ষাকে ব্যবহারিক এবং সমস্যাভিত্তিক শেখানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেখানে শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা ও সমস্যার সমাধান করার দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের গণিত শিক্ষার বৈশিষ্ট্য হলো সমস্যা-ভিত্তিক প্রতিটি পাঠ্যবিষয়ের সঙ্গে বাস্তব জীবনের উদাহরণ সংযুক্ত থাকে। গণিত শেখানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের ল্যাবরেটরি ব্যবহার করা হয়। কম্পিউটার সফটওয়্যার ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার হয়। শিক্ষার্থীদের দলগতভাবে কাজ করতে উৎসাহিত করা হয়। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রীয় শিক্ষার ধারণা প্রয়োগ করলে গণিত শিক্ষার মান অনেক উন্নত হতে পারে। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রীয় শিক্ষার ধারণা প্রয়োগ করতে হলে কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। চ্যালেঞ্জগুলো হলো অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, দক্ষ মানবসম্পদের অভাব ও গ্রামীণ বিদ্যালয়সমূহে অবকাঠামোগত দুর্বলতা।
উন্নত দেশসমূহের যুগান্তকারী শিক্ষাব্যাবস্থার মডেল থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করা অতি জরুরি। যেকোন বেসরকারি উদ্যোগকেও উৎসাহিত করা উচিত। চ্যালেঞ্জ থাকলেও একযোগে কাজ করলে শত বাঁধা অতিক্রম করা সম্ভব। সর্বোপরি গণিত শিক্ষার মানোন্নয়ন একটি দেশ ও জাতির জাতীয় উন্নয়নের পূর্বশর্ত। বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্তরে গণিত শিক্ষার মান উন্নত হলে ভবিষ্যতে আমরা দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পারব। উন্নত শিক্ষার ধারণা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমেই গণিতভীতিমুক্ত প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব।




