জহুরুল ইসলামের ব্যবসায়ী হওয়ার ইচ্ছা

ঢাকার পতিত নগর পরিসরে সহসা রাজধানী জেগে ওঠায় আবাসন ও নির্মাণ খাত হয়ে উঠেছিল অনিবার্য। সেই বাতাবরণে জহুরুল ইসলামের সৃজনী পদক্ষেপ ছিল তুরুপের তাস। ক্ষুদ্র ঠিকাদারি দিয়ে শুরু। দেশের সীমানা মাড়িয়ে বিদেশ-বিভুঁইয়ে তিনি গড়েছেন আকাশচুম্বী অট্টালিকা, সড়ক-মহাসড়ক, কল-কারখানা; এমনকি দেশের আঙিনায় বুলন্দ করেছেন বিদেশি বড়-প্রসিদ্ধ বাণিজ্যিক ও শৌখিন গাড়ির সমৃদ্ধি। রাজধানী ঢাকার নির্মাণ, আবাসন ও বিস্তৃতির বিবর্তনিক ইতিহাসের ধারাক্রমে জহুরুল ইসলাম তাই এক অবিচ্ছেদ্য প্রাসঙ্গিকতা। পর্ব-২৬

মিজানুর রহমান শেলী: চাকরি ছেড়ে দিলেন। শুরু করলেন ব্যবসা। কর্মস্থলে তার কোনো সংকট ছিল না। তবু নিজ ইচ্ছায় তিনি ব্যবসার মতো ঝুঁকিপূর্ণ জীবন বেছে নিলেন। ব্রিটিশের শোষণে নিষ্পেশিত একটি সদ্য জন্ম নেওয়া রাষ্ট্রে তিনি একটু বেশি বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন বলেই মনে হতে পারে আপাতদৃষ্টিতে। কিন্তু একজন সাধারণ ম্যাট্রিকুলেশন পাস করা ছেলের জন্য এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়। বাবার ব্যবসা দিয়েই তিনি শুরু করেছিলেন এটা সত্য; কিন্তু বাবা তাকে ঝুঁকিহীন সুখের চাকরি জীবন ছেড়ে ব্যবসায় আসতে প্ররোচিত করেনি। আবার তার বাবার ঠিকাদারি ব্যবসার হালহকিকত প্রলুব্ধ হওয়ার মতোও ছিল না। তবুও জহুরুল ইসলাম এই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসায় জীবনে পা বাড়ালেন। এখানে জহুরুল ইসলামের নিজের ইচ্ছাই ছিল প্রকট। তার পেশা নির্বাচনের এই প্রবণতার পেছনের কারণ নিয়ে অল্প বিস্তর কৌতূহল থাকতেই পারে। জহুরুল ইসলামের জীবনের এই অধ্যায়ে রয়েছে তরুণ উদ্যোক্তাদের শিক্ষা।
পেশা নির্বাচনে ব্যক্তিগত আশা-আকাক্সক্ষা বা শিক্ষাও খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ নিয়ে গবেষণা হয়ে আসছে অনেক আগে থেকে। ১৯৫১ সালে জিঞ্জবার্গ পেশা বাছাইয়ে ব্যক্তি আচরণের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ১১ বছর পর্যন্ত মানুষ তার পেশা নিয়ে কল্পনার জগতে থাকে। এ সময় তারা প্রায়ই লক্ষ্য পরিবর্তন করে। এমনকি কোনোভাবেই তার নিজের দক্ষতা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক প্রেক্ষিত নিয়ে ভাবে না। ১২ থেকে ১৮ বছরের যুবারা সম্ভাব্য পেশা নির্বাচন করে থাকে। এরপরের স্তরে মানুষ যুক্তির আশ্রয় নেয়। সে নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে উপলব্ধি করতে শেখে। এখানে উল্লেখ্য, জহুরুল ইসলাম ২০ বছর বয়সে সিঅ্যান্ডবিতে চাকরি নিয়েছিলেন। আর তিনি চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় গিয়েছিলেন ২৩ বছর বয়সে। এই দুটো ঘটনাই ঘটেছে জিঞ্জবার্গের বয়স স্তরের শেষ ধাপে। এ সময় মানুষ তার নিজের যুক্তি দিয়ে ভবিষ্যৎ চিন্তা করে থাকে। অর্থাৎ জহুরুল ইসলামের চাকরি ক্ষেত্র বেছে নেওয়া, নির্দিষ্ট সময় পরে সেই চাকরি ইস্তফা দিয়ে চাকরি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় জীবনে থিতু হওয়ার ভেতরে একটি যুক্তির আশ্রয় দেখা যায়। তাছাড়া তিনি বাবার ব্যবসাসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রেই চাকরি বেছে নিয়েছিলেন এবং সেই পেশাতেই চাকরিতে এলেন। এসবের মাঝে কিছু অন্তঃমিল খুঁজে পাওয়া যায়।
লিন্ডহোমের (২০০৪) মতে, নিজস্ব ধারণাই হলো পেশা নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ বিষয়ে ইলজিনের ধারণাকে অনেক বেশি প্রণিধানযোগ্য বলে ধরা যায়। তিনি বলেন, কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে ব্যক্তির আগ্রহ বা ঝোঁক থাকলেই কেবল সে ওই বিষয়ে ক্যারিয়ার গড়ে সফল হতে পারেন।
এখানে লক্ষণীয় যে, পড়ালেখা শেষে জহুরুল ইসলাম সিঅ্যান্ডবিতে চাকরি করলেন। সেখানে সে সফলতা দেখিয়ে অল্প দিনে পদোন্নতিও পেয়েছিলেন। এরপর তিনি যখন পদত্যাগ করেছিলেন তখন সিঅ্যান্ডবি থেকে তাকে আরও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ এই নির্মাণ খাতে তিনি মন দিয়েই কাজ করছিলেন। এমনকি কাজে তিনি দক্ষতা দেখাতে সক্ষম হন। তার এ কাজের আগ্রহ তাকে ব্যক্তি উদ্যোগে ঝুঁকি গ্রহণের সাহস ও সুযোগ জুগিয়েছিল। এমনকি পরবর্তী জীবনে তিনি তার সৃজনী ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়েছেন।
একইভাবে বিভিন্ন গবেষণায় ব্যক্তিগত আগ্রহ আর পেশা নির্বাচনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া গেছে। আর্থুর ও রুশো ১৯৯৬ সাল ব্যক্তিগত ইচ্ছার সঙ্গে তার কর্মদক্ষতাকে যুক্ত করেছেন। জহুরুল ইসলাম যে কেবল তার আগ্রহ নিয়েই এ কাজে নেমে পড়েছিলেন তা নয়। বরং তিনি চাকরিকালে একটি হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন। তারপর তিনি বাবার সঙ্গে কাজ শুরু করেছেন। বলা রাখা ভালো, জহুরুল ইসলাম ঢাকায় সিঅ্যান্ডবিতে চাকরি করা কালেও বাবার ব্যবসার ব্যাপারে খোঁজখবর নিতেন। বলা চলে তার চাকরি চলাকালেই ঠিকাদারি ব্যবসায় একটু একটু করে পেশা গড়ে তোলার প্রস্তুতি চলছিল। কেননা, সিঅ্যান্ডবির দেশব্যাপী বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা নিবিড়ভাবে অর্জনের সুযোগ পান। অর্থাৎ কেবল নিজের ঝোঁকের বসেই নয়, বরং নিজস্ব অভিজ্ঞতা আর বাবার পেশার সুবাদে এই ঠিকাদারি পেশার সঙ্গে ছোট থেকেই পরিচিতি থাকায় জহুরুল ইসলাম নির্মাণকাজে ঠিকাদারি পেশা বেছে নেন।
তবে বলতেই হয়, জহুরুল ইসলাম নিজের শতভাগ পছন্দমতো এ পেশায় এসেছিলেন কিনা, সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। কেননা তিনি তার পড়ালেখার জীবনে আইএ পড়তে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি একবার অকৃতকার্য হওয়ার পরে হাল ছাড়েননি। এ আবার তিনি পরীক্ষা দিয়েছিলেন। অর্থাৎ সে বিষয়ে ক্যারিয়ার গড়ার তার প্রবল আগ্রহ ছিল। কিন্তু তাতে তিনি সফল হননি। কিন্তু শেষত যখন তিনি নির্মাণ খাতে ক্যারিয়ার গড়লেন, তখন মন দিয়ে কাজ করেছেন। এই চাকরির কাজ তাকে যেমন শিখিয়েছে, তেমনি তার মাঝে এই কর্ম খাতে আগ্রহও জাগিয়ে তুলেছিল তুঙ্গে। বুন্দারা ২০০১ সালে উল্লেখ করেন, ব্যক্তির দক্ষতা ও আগ্রহের উন্নয়ন ঘটে একটি নির্দিষ্ট সময়ব্যাপী সেই কাজে নিয়োজিত থাকার ভেতর দিয়ে। বুন্দারার এই যুক্তির সঙ্গে জহুরুল ইসলামের চাকরি থেকে দক্ষতা ও আগ্রহ উন্নয়নের ঘটনাটি সমার্থক।
এদিকে এঞ্জেলা ও বার্ডিক ২০০৪ সালে যুক্তি দেন, আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিবেশ এককজনের পেশা নির্বাচনের শক্ত ভূমিকা রাখে। উপরের আলোচনা থেকে আমরা এ বিষয়ে ধারণা পেয়েছি যে, সে সময়ের নতুন রাজধানী ঢাকার বহুমুখী উন্নয়ন পরিবেশ জহুরুল উসলামকে আশাবাদী করে তুলেছিল। বাবার ঠিকাদারি পেশা তাকে সাংস্কৃতিকভাবে আড়ষ্ট করতে পারেনি। উল্লেখ্য, জহুরুল ইসলামের অঞ্চলের লোকেদের মধ্যে এখনও কেউ কেউ জহুরুল ইসলামের বাবাকে ‘মাটি কাটার দলের সর্দার’ বলে ছোট করেন। মনে করিয়ে দিতে চাই, জহুরুল ইসলামের বাবা আফতাব উদ্দিন ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধি ছিলেন (বেশিরভাগের মতো চেয়ারম্যান ছিলেনÑকেউ মেম্বার বলে দাবি করেন)। তাই তাকে গ্রামের উন্নয়নমূলক কাজে তথা মাটি কাটার মতো কাজেও থাকতে হতো। তিনি হয়তো এ ধরনের কোনো কাজে ঠিকাদারি করতেনÑসেটাও অস্বাভাবিক নয়। এই মতামতও অনেকে দিয়েছেন। জহুরুল ইসলাম সমাজের মানুষের এরকম টিপ্পনিকে তোয়াক্কা করেননি। বরং এ রকম ঠিকাদারি কাজে উৎসাহিত হয়েছেন। সর্বপ্রথম তিনি পোস্ট অফিসের স্টেশনারি পণ্য সরবরাহের ঠিকাদারি কাজ হাতে নেন।
তবে যে বিষয়টি সাংস্কৃতিক আড়ষ্টতা তৈরি করতে পারে সেই বিষয়টি আবার কোনো কোনো সময় বংশপরম্পরায় একই পেশায় থাকতে বাধ করে। এ ক্ষেত্রে ঠিকাদার আফতাব উদ্দিনের ছেলে জহুরুল ইসলাম ঠিকাদার হবেন সেটাই স্বাভাবিক। আশিষ গুপ্তের পর্যবেক্ষণে উঠে আসা তথ্যটি এখানে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে: এক বাঙালি উদ্যোক্তা বলেন, ‘আমরা বাঙালিরা আমাদের সন্তানদেরকে আমাদের চিন্তাচেতনায় বেড়ে ওঠা দেখতে পছন্দ করি’। যদিও অনেক বাবা তার সন্তানকে নিজ পেশায় দেখতে চান না। এমনকি বাবার চেয়ে ছেলে বড় হবে এটাই ছিল তাদের আকাক্সক্ষা তবে সেটা বাবার চিন্তা বা ইচ্ছা অনুযায়ী। দেখা গেল বাবার পেশাতেই জহুরুল ইসলাম আসলেন। কিন্তু বাবা আফতাব উদ্দিনের ক্ষুদ্র ঠিকাদারি পরিসরকে অল্পদিনেই ছাপিয়ে জহুরুল ইসলাম পৌঁছে গেলেন আন্তর্জাতিক মানের একজন নির্মাণ শিল্প উদ্যোক্তার পর্যায়ে। আফতাব উদ্দিনকে নিয়ে গ্রামের কিছু নিন্দুকেরা যে টিপ্পনি করতেন তারা কিন্তু জহুরুল ইসলামকে নিয়ে আর টিপ্পনি কাটেন না। জহুরুল ইসলাম তার ঠিকাদারি ব্যবসায় কেবল দেশ নয়, বিশ্ব সমাজেও জায়গা করে নিয়েছেন। দেশের মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। বস্তুত আপন ইচ্ছার ওপর সওয়ার হয়ে তিনি সর্বোচ্চ সফলতা ছিনিয়ে এনেছেন।

লেখক: গবেষক, শেয়ার বিজ