প্রফেসর ড. মো. আবু তালেব :
মানুষকে মানুষ করে তোলে তার মানবিকতা—সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ, সহনশীলতা ও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা। সভ্যতার অগ্রযাত্রা মূলত এই মানবিক মূল্যবোধের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু যখন মানুষ এই মূল্যবোধ থেকে সরে যায়, তখন সমাজে ভয়, অবিশ্বাস, সহিংসতা ও অস্থিরতা বাড়তে থাকে। বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও উন্নয়নের অগ্রগতি যতই দৃশ্যমান হোক না কেন, মানবিকতার সংকট আজ একটি বড় সামাজিক বাস্তবতা। প্রশ্ন হচ্ছে—মানবিকতা হারালে সমাজ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?
মানবিকতা বলতে বোঝায় অন্যের কষ্ট উপলব্ধি করার ক্ষমতা, সহমর্মিতা ও নৈতিক দায়িত্ববোধ। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই গুণগুলোই সমাজকে স্থিতিশীল ও নিরাপদ রাখে। হার্ভার্ডের মনোবিজ্ঞানী স্টিভেন পিংকারের গবেষণায় দেখা যায়, ইতিহাসে সহিংসতা কমার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা ও নৈতিকতার বিকাশ। শিক্ষা, গণতন্ত্র, বাণিজ্য এবং সংস্কৃতির বিকাশ মানুষকে একে অপরের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল করেছে এবং সহিংসতার প্রবণতা কমিয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, মানবিকতার সংকট দেখা দিলে সমাজে অপরাধ ও সহিংসতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০ সালের পর থেকে বিশ্বে আন্তঃব্যক্তিক সহিংসতায় প্রায় ৮ মিলিয়ন মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বের প্রায় এক তৃতীয়াংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হন এবং প্রতি সাতজন শিশুর মধ্যে একজন যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। এসব পরিসংখ্যান শুধু অপরাধের সংখ্যা নয়; এগুলো মানবিকতার ঘাটতিরও নির্মম চিত্র তুলে ধরে। এটি শুধু সামাজিক সমস্যা নয়; এটি মানবিকতার অবক্ষয়ের প্রতীক। যখন সমাজে দুর্বল, নারী বা শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না, তখন সেই সমাজের নৈতিক ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এছাড়া সহিংসতার সবচেয়ে নির্মম রূপ দেখা যায় পারিবারিক ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভেতরেই। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বে প্রায় ৮৫ হাজার নারী ও কন্যা শিশু হত্যার শিকার হয়েছে, যার প্রায় ৬০ শতাংশই নিহত হয়েছে স্বামী, সঙ্গী বা পরিবারের সদস্যদের হাতে। অর্থাৎ যে পরিবার নিরাপত্তার প্রতীক হওয়ার কথা, অনেক ক্ষেত্রে সেটিই সহিংসতার কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। এটি মানবিক মূল্যবোধের গভীর সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ।
সমাজে মানবিকতার অভাব দেখা দিলে প্রথম যে বিষয়টি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা হলো পারস্পরিক বিশ্বাস। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, বিশ্বাস হলো সামাজিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি। যখন মানুষ অন্যকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে, তখন সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে পরিবার, প্রতিবেশী সম্পর্ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র—সব ক্ষেত্রেই অস্থিরতা তৈরি হয়। একটি সমাজে যদি মানুষ একে অপরের প্রতি সহমর্মী না হয়, তবে সেখানে আইনের শাসনও দুর্বল হয়ে পড়ে।
মানবিকতার অবক্ষয়ের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে অপরাধ বৃদ্ধির মাধ্যমে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেখানে সামাজিক বৈষম্য, দারিদ্র্য ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বেশি, সেখানে অপরাধের হারও বেশি। বড় শহরগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা অনেক সময় অপরাধ প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ যখন সমাজে সহমর্মিতা কমে যায় এবং মানুষ একে অপরের প্রতি দায়িত্ববোধ হারায়, তখন অপরাধের পরিবেশ তৈরি হয়। সহিংসতা ও অমানবিক আচরণের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নের ওপর। গবেষণায় দেখা গেছে, সহিংসতা একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক কল্যাণ ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে কর্মক্ষম মানুষের মৃত্যু বা অক্ষমতা অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয় এবং সামাজিক উন্নয়নের গতি থামিয়ে দেয়। অর্থাৎ মানবিকতার সংকট শুধু নৈতিক সমস্যা নয়; এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও বড় বাধা।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তির যুগে মানুষের জীবনযাত্রা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যোগাযোগ সহজ হলেও অনেক ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে বাস্তব সামাজিক সম্পর্ক কমে যাচ্ছে। অনলাইনে ঘৃণা, বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতার ভাষা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক তরুণ বাস্তব জীবনের সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের পরিবর্তে ভার্চুয়াল প্রতিযোগিতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার মধ্যে বেড়ে উঠছে। এর ফলে মানবিক মূল্যবোধের চর্চা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে আশার দিকও রয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বে হত্যার হার কিছুটা কমেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্বে হত্যার হার প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। এটি প্রমাণ করে যে শক্তিশালী আইনব্যবস্থা, শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা গেলে সহিংসতা কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য মানবিকতার চর্চা আরও গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত নগরায়ন, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও সামাজিক পরিবর্তনের ফলে অনেক সময় মানুষ ব্যক্তিস্বার্থকে সামাজিক স্বার্থের উপরে স্থান দিচ্ছে। পরিবার ও সমাজে পারস্পরিক সহমর্মিতা কমে গেলে সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে অপরাধ, দুর্নীতি ও অসহিষ্ণুতা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। শুধু পরীক্ষাভিত্তিক জ্ঞান নয়, শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরিবারকে মানবিক মূল্যবোধের প্রথম বিদ্যালয় হিসেবে ভূমিকা রাখতে হবে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই মানবিক আচরণ ও সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। তৃতীয়ত, গণমাধ্যম ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানবিক মূল্যবোধ প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, মানবিকতা হারালে সমাজ শুধু নৈতিক দিক থেকেই নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও সংকটে পড়ে। সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ ও পারস্পরিক সম্মান—এই তিনটি গুণই একটি সভ্য সমাজের ভিত্তি। তাই মানবিকতার চর্চা শুধু ব্যক্তিগত গুণ নয়; এটি একটি জাতির টিকে থাকার শর্ত। মানবিকতা বাঁচলে সমাজ বাঁচবে, আর মানবিকতা হারালে সভ্যতার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে।
লেখক: অধ্যাপক ও গবেষক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post