নিলুফা আক্তার: বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেছেন এদেশের নারী অ্যাথলেটরা। এক সময় ঘরের কোণে সীমাবদ্ধ থাকলেও ,বর্তমানে ফুটবল থেকে ক্রিকেট, আর্চারি থেকে শুটিং- সবখানেই লাল সবুজের পতাকা উড়িয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছেন তারা। বাংলাদেশের ক্রীড়া মানচিত্রে নারীদের পদচারণা এখন আর কেবল অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তারা এখন সাফল্যের প্রধান কারিগর। তবে সাফল্যের এই আলোকচ্ছটার পাশাপাশি পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের নারীরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছেন। বিশেষ করে নারী ফুটবল দলের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয় এবং এএফসি উইমেনস এশিয়ান কাপ ২০২৬-এ ঐতিহাসিক অংশগ্রহণ দেশের ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছে। বাংলাদেশ নারী ক্রীড়াঙ্গনের সাম্প্রতিক সাফল্যের সবচেয়ে বড় চমক ‘সাবিনা-মারিয়াদের’ ফুটবল দল। ২০২২ এবং ২০২৪ সালে টানা দুবার সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রমাণ করেছে বাংলাদেশ। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে দাপট দেখানোর পর সবিনা খাতুনের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ফুটবল দল এখন এশিয়ার বড় শক্তিগুলোর মুখোমুখি হচ্ছে। ২০২৬ সালে এএফসি নারী এশিয়ান কাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিয়ে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছে টাইগ্রেসরা। যদিও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কঠিন গ্রুপ পর্বে তারা লড়াই করেছে,কিন্তু এই পর্যায়ে খেলার অভিজ্ঞতা দেশের ফুটবলের জন্য এক নতুন অধ্যায়। অন্যদিকে, ক্রিকেটে নিগার সুলতানা জ্যোতির নেতৃত্বাধীন দলটি ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে বড় বড় শক্তিকে হারিয়ে নিজেদের সামর্থের প্রমাণ দিচ্ছে। ২০২৫ সালের নারী বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ এবং দ্বিপাক্ষিক সিরিজে শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে জয় বাংলদেশের নারী ক্রিকেটের পেশাদারিত্বকে ফুটিয়ে তুলেছে। মারুফা আক্তার ও নাহিদা আক্তারের মতো তরুণ প্রতিভারা এখন বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে নিয়মিত মুখ।
ফুটবল ও ক্রিকেটের পাশাপাশি অন্যান্য ব্যক্তিগত ও দলীয় ইভেন্টেও নারীদের জয়গান শোনা যাচ্ছে। দাবায় রাণী হামিদের উত্তরসূরিরা আন্তর্জাতিক মাস্টার ও গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। শুটিং ও আর্চারিতে অলিম্পিক ও এশিয়ান গেমসের মতো বড় মঞ্চে পদক জয়ের প্রত্যাশা জাগাচ্ছেন নারীরা। এ ছাড়াও বর্তমানে দাবা, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন, হকিসহ বিভিন্ন খেলায় নারীরা সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। ক্রীড়াঙ্গনে অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ কিংবদন্তি টেবিল টেনিস তারকা জোবেরা রহমান লিনুকে ২০২৬ সালের স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করা হয়েছে। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডধারী এই ক্রীড়াবিদ বাংলাদেশের নারী অ্যাথলেটদের জন্য দীর্ঘকাল ধরে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছেন। ইউনিসেফ এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে ক্রীড়া এখন কেবল বিনোদন নয়, বরং বাল্যবিবাহ রোধ এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহƒত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বিকেএসপি বাংলাদেশের ক্রীড়া ক্ষেত্রে নারীদের উন্নয়ন ও অংশগ্রহণে অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশের একমাত্র জাতীয় ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসাবে এটি নারী ক্রীড়াবিদদের পেশাদার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কাজ করে যাচ্ছে। বিকেএসপিতে বর্তমানে ক্রিকেট, ফুটবল, অ্যাথলেটিকস, আর্চারি, শুটিং, জুডো এবং জিমন্যাস্টিকসসহ বেশ কিছ– ইভেন্টে নারী প্রশিক্ষণার্থীরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। নারী প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য আলাদা হোস্টেল এবং নিরাপদ আবাসন রয়েছে। কেবল মাঠের খেলা নয়, বরং স্পোর্টস সায়েন্স, ফিজিওলজি এবং নিউট্রিশন বা পুষ্টির ওপর ভিত্তি করে নারীদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ করা হয়। খেলার পাশাপাশি নারীদের সাধারণ শিক্ষাও প্রদান করা হয়, যাতে তাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল ও নিশ্চিত থাকে।
নারীদের খেলাধুলায় উদ্বুদ্ধ করতে সরকার এবং বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশন বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের নারীদের ক্রীড়াঙ্গনে অভাবনীয় উন্নয়নে সরকারের নীতিগত সহায়তা ও তৃণমূল পর্যায়ের একাডেমিগুলোর অবদান অনস্বীকার্য। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। সাম্প্রতিক সময়ে নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক হয়রানি বন্ধের দাবি জোরালো হচ্ছে। ২০২৬ সালে চালু হওয়া বিশেষ ‘স্পোর্টস কার্ড’এবং ‘স্পোর্টস অ্যালাউন্স ’প্রোগ্রাম নারী ক্রীড়াবিদদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়া তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভা অন্বেষণের জন্য ‘খেলার ডাক-২০২৬’ এর মতো আয়োজন শিশুদের খেলাধুলায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করছে।
সাফল্য সত্ত্বেও নারী অ্যাথলেটদের পথ এখনও কণ্টকময়। সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদনে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নারী ক্রীড়াবিদদের নিরাপত্তা ও হয়রানি রোধে কঠোর আইনের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটে যৌন হয়রানির অভিযোগগুলো বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও অভিজ্ঞ পেসার জাহানারা আলমের করা অভিযোগগুলো ব্যাপক আলোচনার জš§ দেয়। এ ছাড়া গ্রামীণ জনপদে এখনও নারীদের হাফপ্যান্ট পরে খেলা বা মাঠে নামা নিয়ে সামাজিক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ১৮ বছরের আগেই বিয়ের চাপ প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের অকালেই ক্যারিয়ার শেষ করে দিচ্ছে। দারিদ্র্যতা, কুসংস্কার এবং পারিবারিক রক্ষণশীলতার কারণে অনেক নারীই প্রতিভা এবং আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও ক্রীড়াঙ্গনে তাদের ভূমিকা রাখতে পারে না। শুধুমাত্র ‘ট্যালেন্ট হান্ট’ নয় সামাজিক সচেতনতাই এ থেকে উত্তরণের উপায়। ঢাকাসহ সব বিভাগকে সমান গুরুত্ব এবং সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে নারী খেলোয়াড়দের পথ সুগমে ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ও ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আরও তৎপর হতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন পেশাদার বেতন কাঠামো এবং উন্নত প্রশিক্ষণ সুবিধা। বাংলাদেশ নারী ক্রীড়া ফেডারেশনের সভাপতি ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ শুক্লা জানান, ‘আমরা এমন একটি ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি যেখানে জেন্ডার বৈষম্য থাকবে না এবং খেলার মাঠ হবে সবার জন্য সমান ও নিরাপদ।’
বাংলাদেশের নারীরা আজ কেবল মাঠের খেলোয়াড় নন, তারা কোটি তরুণের অনুপ্রেরণা। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হলে ২০২৬ পরবর্তী সময়ে বিশ্ব ক্রীড়ামঞ্চে বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। অন্যান্য অঙ্গনের মতো বাংলাদেশের ক্রীড়া অঙ্গনেও নারীদের অভূতপূর্ব সাফল্য ধরে রাখার জন্য একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে চৌকস, প্রতিভাবান এবং মেধাবী নারী খেলোয়াড়দের বেছে নিয়ে প্রথমে স্থানীয় পর্যায়ে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করে পরবর্তীতে জাতীয় পর্যায়ে কোচিংয়ের মাধ্যমে তাদের তৈরি করার ব্যবস্থা করতে হবে।
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, ‘নারীদের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, উন্নত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে বৈশ্বিক আসর থেকে আরও বড় বড় পদক ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হবে।’ বাংলাদেশের নারীরা আজ প্রমাণ করেছেন, সুযোগ পেলে তারা কেবল ঘর নয়, বিশ্বজয়ের সামর্থ্যও রাখেন। তৃণমূল থেকে উঠে আসা মারুফা, ঋতুমণি ও সাবিনাদের সাফল্য আজ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রশংসিত। প্রতিকূলতা জয় করে তাদের এই অদম্য ছুটে চলা আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশেরই প্রতিচ্ছবি।
গণমাধ্যমকর্মী
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post