রাজধানীতে চলমান চতুর্থ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলনে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে শনিবার অংশ নেন রাজনৈতিক নেতারা। এখানে বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, দেশের ব্যবসায়ীদের ব্যাপারে আমাদের চিন্তাভাবনাটা পরিবর্তন করা দরকার…। গত ১৫ বছর যারা লুট করেছেন, চুরি করেছেন, ব্যাংক ডাকাতি করেছেন, তাদের ধরুন, তাদের শাস্তি দিন। তাদের যে শিল্পকারখানা আছে, সেগুলোয় হাজার হাজার মানুষ কাজ করছেন। সেগুলো বন্ধ করে দেয়ায় ১৪ লাখ মানুষ বেকার হয়ে গেছেন। এই লোকগুলো যাবেন কোথায়? কারখানাগুলো কীভাবে চালু করতে পারি, প্রতিষ্ঠানগুলোয় আমরা কীভাবে এই মানুষগুলোর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারি, তা দেখা দরকার। সম্মেলনের পৃথক অধিবেশনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেছেন, দুর্নীতির কারণে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। চাঁদা ও দুর্নীতি ব্যবসায়ীদের এমনভাবে অনুৎসাহিত করছে যে, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তারা নতুন উদ্যোগ নিচ্ছেন না। দেশে সামাজিক ফ্যাসিবাদের নানা আলামত দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, এমন হলে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না। অন্য নেতারাও প্রায় একই ধরনের বক্তব্য রেখেছেন। রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য সময়োপযোগী বলে মানবেন সবাই। নীতিনির্ধারণী অনেক বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। রাজনৈতিক দলের নেতারা যখন অর্থনীতি বিষয়ে বাস্তবসম্মত বক্তব্য দেন, তখন সাধারণ মানুষের মনে আশার সঞ্চার করে বৈকি! নির্বাচনের পর এদের মধ্যে কেউ সরকারি, কেউ বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকবেন—তাই আশা করা যায়, ওই সময় তাদের কথা-কাজে মিল থাকবে।
আমাদের অর্থনীতির বড় সীমাবদ্ধতা অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়েই চলেছে। সম্পদ, আয়, সুযোগ ও ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন এমন মাত্রায় পৌঁছেছে, যা সামাজিক ন্যায়বিচার, অংশগ্রহণ ও স্থিতিশীল উন্নয়নের ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ব্যাপ্তি ও তীব্রতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, ন্যায্যতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে প্রবৃদ্ধির ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে। গণ-অভ্যুত্থান একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে, কাদের জন্য উন্নয়ন? বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ন্যায়বিচারের সঙ্গেও জড়িত। তাই রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন।
খেলাপি ঋণ, ব্যাংক লুট, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অদক্ষ ব্যবস্থাপনা ধনাঢ্যদের সম্পদ সুরক্ষিত করেছে, সাধারণ আমানতকারীর আস্থা নষ্ট করেছে। ব্যাংক খাত কার্যত নীতিনির্ধারক ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের স্বার্থরক্ষার ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এ থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা যায়, সে লক্ষ্যে রাজনৈতিক নেতাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে।
অর্থনৈতিক বৈষম্যের পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক বৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ ও সম্পদের বণ্টন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে নির্ধারিত হচ্ছে, যার ফলে অর্থনীতি হয়ে উঠেছে একচেটিয়া ও অস্বচ্ছ। দলীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও স্বজনপ্রীতি রাজনৈতিক অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে। বাজেট বরাদ্দ, সরকারি ক্রয়, ব্যাংকঋণ বিতরণ, এমনকি সরকারি চাকরিতেও রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেয়া হয়ে থাকে। রাজনৈতিক সরকারে দলীয় পরিচয়কে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কিন্তু সাধারণ মানুষ যেন নৈতিক এবং সংবিধানস্বীকৃত অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post