মো. নূর হামজা পিয়াস : বাংলাদেশের স্পন্দিত হূদয় ঢাকা আজ এক চমকপ্রদ বৈপরীত্যের প্রতিচ্ছবি। দিন-রাত সমান ব্যস্ত এই শহরে জীবনের ছন্দ যেন কখনো থামে না। রিকশা, বাস, অফিস ও ধুলায় ঢাকা আকাশচুম্বী ভবন—সব মিলিয়ে ঢাকার স্পন্দন এক অনবরত গতি। কিন্তু এই গতির নিচে লুকিয়ে আছে এক গভীর নিস্তব্ধতা, এক অনুচ্চারিত একাকিত্ব। শহরের প্রতিটি মানুষ যেন ভিড়ের মধ্যে থেকেও একা। এই নিঃসঙ্গতা কেবল আবেগের বিষয় নয়, এটি আধুনিক নগরজীবনের নির্মম বাস্তবতা, যেখানে উন্নয়নের গতি মানুষের সংযোগকে পেছনে ফেলে দিচ্ছে।
ঢাকা এখন বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল মহানগরগুলোর একটি। বর্তমানে এখানে বসবাস করছে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, ২০২৫ তথ্য অনুযায়ী)। প্রতি বছর প্রায় চার লাখ মানুষ নতুনভাবে ঢাকায় প্রবেশ করছে কাজ, শিক্ষা ও আশ্রয়ের খোঁজে। কিন্তু শহরের অবকাঠামো এই প্রবাহ শোষণ করতে পারছে না। যানজট, বস্তি, বাসস্থান সংকট ও বায়ুদূষণ শহরকে এক ক্লান্ত নগরে পরিণত করছে। গ্রামীণ বন্ধনভিত্তিক সমাজের মানুষ শহরে এসে পাচ্ছে এক ঘনবসতিপূর্ণ অথচ মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন জীবন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় ও নদীতীরবর্তী অঞ্চলের মানুষ ক্রমেই ঢাকামুখী হচ্ছে। বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও কৃষিজমি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় জীবিকার সন্ধানে লাখ লাখ মানুষ শহরে চলে আসে। ২০২৫ সালের জলবায়ু বাস্তুচ্যুত রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৬০ হাজার মানুষ পরিবেশগত কারণে ঢাকায় আশ্রয় নিচ্ছে। কিন্তু এই আশ্রয় তাদের নিরাপত্তা দেয় না, বরং শহরের ভেতর তাদের ঠাঁই হয় অনিরাপদ বস্তিতে। এভাবে জলবায়ু সংকট ঢাকার সামাজিক ও মানবিক সংকটকে আরও গভীর করছে।
ঢাকা আজ এক ঘনবসতিপূর্ণ নগরী। একই এলাকায় বিলাসবহুল টাওয়ার, গেটযুক্ত সমাজ ও বস্তি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। তবু তাদের বাসিন্দাদের মধ্যে দূরত্ব অতিক্রমণীয় নয়। শহর যেন শারীরিকভাবে কাছাকাছি, কিন্তু মানসিকভাবে বহু দূরে। ধনীরা উঁচু প্রাচীর ও নিরাপত্তা প্রহরীর আড়ালে জীবন কাটায়, আর নিম্নবিত্তরা ভাগ্যনির্ভর দিনযাপন করে অনিশ্চিত পরিবেশে। এর মাঝখানে একটি চাপে থাকা মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও জীবনের দৌড়ে টিকে থাকার লড়াই চালাচ্ছে।
ঢাকার প্রতিদিনের জীবনে সময়ের এক ভয়াবহ সংকট বিরাজ করছে। গড়ে একজন নাগরিক প্রতিদিন যানজটে আটকে থাকে প্রায় তিন ঘণ্টা (পরিবহন জরিপ, ২০২৫ অনুযায়ী)। এই সময় শুধু ক্লান্তি নয়, মানসিক দূরত্বও সৃষ্টি করে। পরিবারে কথা বলার সময় কমে গেছে, বন্ধুত্বের জায়গা দখল করেছে ক্লান্তি। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন প্রতিযোগিতার, বিশ্রামের নয়। এই যান্ত্রিক ছন্দ মানুষকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করছে যেখানে প্রতিবেশী পরিচিত নয়, আর বন্ধুত্ব পরিণত হয়েছে ভার্চুয়াল লাইক-কমেন্টের বন্ধনে।
ঢাকার গণপরিবহন, বিশেষ করে বাস বা লোকাল ট্রেনগুলো, কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এটি সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল। কিন্তু ক্রমবর্ধমান যানজট এবং জনাকীর্ণ পরিবেশ এই সম্পর্ক তৈরির সুযোগকে নষ্ট করে দিচ্ছে। যাত্রীরা এখন ভিড়ের ক্লান্তি এড়াতে নিজেদের স্মার্টফোন বা হেডফোনে মগ্ন থাকে, যা পাশের মানুষের সঙ্গে কথা বলার বা সহানুভূতি বিনিময়ের সুযোগ দেয় না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাতায়াতের এই মানসিক চাপ মানুষকে আরও বেশি খিটখিটে এবং সামাজিক আলাপচারিতায় অনিচ্ছুক করে তোলে, যা বৃহত্তর নগরজীবনে বিচ্ছিন্নতাকেই বাড়ায়।
ঢাকায় বসবাসরত কোটি মানুষের শ্রমই শহরের প্রাণ। কিন্তু এই শ্রমের ফল তাদের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ছে। গার্মেন্ট শ্রমিক থেকে শুরু করে করপোরেট কর্মী সবাই যেন এক অদৃশ্য চক্রে বন্দি। কাজ এখন জীবনের লক্ষ্য নয়, কেবল বেঁচে থাকার উপায়। সমাজবিজ্ঞানী কার্ল মার্কসের শ্রমবিচ্ছিন্নতা ধারণা আজ ঢাকায় বাস্তব। মানুষ নিজের কাজ থেকে, সহকর্মী থেকে, এমনকি নিজের অস্তিত্ব থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। জীবনের মানে হারিয়ে ফেলছে উৎপাদনের তাড়ায়।
ঢাকার বেশিরভাগ মানুষই ভাড়াবাড়িতে বসবাস করে এবং ঘনঘন বাসা পরিবর্তন করে। এই স্থানান্তর প্রবণতা প্রতিবেশীদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে উঠতে দেয় না। একটি পাড়ার সঙ্গে মানসিক বা সাংস্কৃতিক সংযোগ তৈরি হওয়ার আগেই অনেকে আবার স্থান পরিবর্তন করে। এর ফলে মানুষের মধ্যে এক ধরনের অস্থায়ী বা প্রান্তিক অনুভূতি জন্ম নেয়, তারা কোনো নির্দিষ্ট এলাকার সামাজিক কাঠামোর অংশ হতে পারে না।
ঢাকার সামাজিক গঠনেও এসেছে বিপর্যয়। আগে পাড়া ছিল পরিচয়ের কেন্দ্র চায়ের দোকান, মাঠ, স্কুল, উৎসব—সবকিছু মানুষকে একত্র করত। এখন সেই জায়গাগুলো দখল করেছে শপিং মল, রেস্তোরাঁ ও বিলাসী বিনোদন। জনসমাগমের স্থানগুলো ধীরে ধীরে বেসরকারি হয়ে যাচ্ছে। যেখানে আগে হাসির শব্দ ছিল, এখন সেখানে কেবল ব্যবসার শব্দ। এই পরিবর্তন শুধু জীবনযাত্রার নয়, এটি সামাজিক সম্পর্কেরও অবক্ষয়, যেখানে সম্পর্কের জায়গায় এসেছে লেনদেন।
প্রযুক্তি ঢাকায় সংযোগের নতুন পথ খুলে দিয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে তৈরি করেছে অদ্ভুত এক নিঃসঙ্গতা। মানুষ এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় সংযুক্ত হলেও বাস্তবে বিচ্ছিন্ন। ভার্চুয়াল কথোপকথন বাস্তব সংলাপের জায়গা দখল করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার প্রায় ৬৭ শতাংশ তরুণ প্রতিদিন পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় অনলাইনে ব্যয় করে, কিন্তু তাদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি মানুষ বাস্তব বন্ধুত্বে একাকিত্ব অনুভব করে। এ এক নতুন প্রজন্ম যারা ডিজিটালি যুক্ত, কিন্তু আবেগে নিঃসঙ্গ।
ঢাকায় জীবন মানেই উচ্চ প্রতিযোগিতা, বিশেষ করে কর্মক্ষেত্র এবং শিক্ষাক্ষেত্রে। সমাজের চোখে সাফল্যের একক সংজ্ঞা হলো অর্থনৈতিক উন্নতি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা। এই অবিরাম প্রতিযোগিতা মানুষকে সহকর্মী বা বন্ধুদের সহযোগী না ভেবে প্রতিযোগী হিসেবে দেখতে উৎসাহিত করে। ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোও প্রায়ই সুযোগ এবং লাভের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। এই মানসিক চাপ মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে এবং সহমর্মিতা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মতো মানবিক গুণগুলো প্রতিযোগিতার ভিড়ে হারিয়ে যায়।
ঢাকার মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি আজ উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি পাঁচজন নগরবাসীর মধ্যে একজন ক্লিনিক্যাল মানসিক চাপে ভুগছেন। বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও নিঃসঙ্গতা এখন শহুরে জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত জীবনযাপন, উচ্চ প্রতিযোগিতা ও সামাজিক দূরত্ব মানুষকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। সমাজ যখন একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর জায়গা হারায়, তখন মানসিক সুস্থতাও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।
একসময় ঢাকার সাংস্কৃতিক জীবন ছিল সামাজিক সংহতির প্রতীক। পাড়ার উৎসব, নাটক, গান, মেলা এসব একত্র করত মানুষকে। কিন্তু এখন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোও বাণিজ্যিকীকরণের দখলে। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ও ব্যক্তিগত বিনোদনের যুগে মানুষ একসঙ্গে নয়, আলাদা হয়ে আনন্দ খোঁজে। সমসাময়িক বাংলা সিনেমা ও সাহিত্যেও ফুটে উঠছে এই বিচ্ছিন্নতা, যেখানে শহরের মানুষ হারিয়ে ফেলে নিজের চারপাশের মানবিক সংযোগ। শিল্প এখন শহরের ভাঙা আত্মার প্রতিবিম্ব।
ঢাকা আজ শ্রেণিভেদে বিভক্ত শহর। একদিকে আকাশছোঁয়া গুলশান-বনানী, অন্যদিকে কাঁচা রাস্তার কামরাঙ্গীরচর ও করাইল। এই বিভাজন শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি মানসিক দূরত্বও তৈরি করে। ধনীরা দরিদ্রদের জীবনকে অন্য এক পৃথিবী হিসেবে দেখে, আর দরিদ্ররা ধনীদের জীবনকে দেখে অপ্রাপ্তির প্রতীক হিসেবে। ফলে সমাজে জন্ম নেয় অবিশ্বাস, ঈর্ষা ও অবজ্ঞা, যা একসঙ্গে বাঁচার সংস্কৃতি নষ্ট করে দেয়।
একটি স্বাস্থ্যকর নগরজীবনের জন্য সবুজ স্থান (Green Space) অপরিহার্য, কিন্তু ঢাকায় পার্ক, খেলার মাঠ বা উন্মুক্ত বিনোদন এলাকার চরম অভাব রয়েছে। যা আছে, তাও প্রায়ই দখল বা অব্যবস্থাপনার শিকার। প্রকৃতির সংস্পর্শ থেকে বিচ্ছিন্নতা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই সবুজ স্থানের অভাব নাগরিকদের খোলামেলা পরিবেশে একত্রিত হতে এবং সামাজিক বন্ধন তৈরি করতে বাধা দেয়। ফলে মানুষজন বিনোদনের জন্য কেবল বাণিজ্যিক শপিং মল বা ব্যক্তিগত বিনোদন কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা একাকিত্বের অনুভূতিকে আরও জোরদার করে।
ঢাকার নগর পরিকল্পনা এতদিন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, কিন্তু সামাজিক সংযোগকে নয়। এখন সময় এসেছে মানুষকেন্দ্রিক শহর গড়ার। পথচারীবান্ধব রাস্তা, পার্ক, পাঠাগার ও সংস্কৃতিকেন্দ্র বাড়াতে হবে। আবাসন নীতিতে মিশ্র আয়ের মানুষদের একত্রে বসবাসের সুযোগ তৈরি করতে হবে। নাগরিক অংশগ্রহণভিত্তিক পরিকল্পনা না হলে শহর উন্নয়নের মাঝেই মানুষ হারিয়ে যাবে। নগরকে শুধুই অবকাঠামো নয়, সমাজ হিসেবে গড়ে তোলা এখন অপরিহার্য।
শহরকে মানবিক রাখতে হলে নাগরিকদের সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পাড়ার সংগঠন, যুব ক্লাব, স্বেচ্ছাসেবক দল—এসব ছোট উদ্যোগই সমাজে নতুন সংযোগ সৃষ্টি করতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নাগরিক শিক্ষা ও সহমর্মিতার চর্চায় নেতৃত্ব দিতে হবে। মিডিয়া ও সংস্কৃতিকে শহরের গ্ল্যামার নয়, মানবিকতার গল্প প্রচারে উৎসাহিত হতে হবে। কারণ উন্নয়ন তখনই সফল, যখন তা মানুষের সম্পর্ককে মজবুত করে।
ঢাকার গল্প কেবল উন্নয়নের নয়, এটি মানুষের টিকে থাকার গল্পও। অগ্রগতির ভেতরে যদি মানুষ হারিয়ে যায়, তবে সেই উন্নয়ন শূন্য। নগরজীবনের একাকিত্ব দূর করতে হলে শহরকে আবার সম্পর্কের নগর হিসেবে ফিরিয়ে আনতে হবে। সিউল বা কোপেনহেগেনের মতো শহরগুলো দেখিয়েছে যথাযথ পরিকল্পনা ও সামাজিক সংহতি দিয়ে নগরজীবনে মানবিকতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ঢাকাকেও সেই পথে হাঁটতে হবে। এই শহরের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে, আমরা কেমন করে প্রযুক্তি ও অর্থনীতির সঙ্গে মানবিকতার ভারসাম্য রক্ষা করতে পারি তার ওপর।
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post