নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি: দেশের নানা সংকটের মধ্যেও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সদ্য সমাপ্ত হিসাববছরের জন্য আকর্ষণীয় নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে, যা পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্যে একটি ইতিবাচক বার্তা। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ ও বাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যেও এসব প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। শুধু তাই নয়; চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশের বাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার ধারাবাহিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ এবং শেয়ারের দর আকর্ষণীয় পর্যায়ে থাকায় নতুন করে বিদেশিদের এই আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
এদিকে পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশিত ১৮০ দিনের কর্মসূচি এবং নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে পুঁজিবাজারকে আরও গতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব করতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। বিনিয়োগ বাড়ানো, করসুবিধা সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘ মেয়াদে বাজারের স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার দিকেই এবার বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য পুঁজিবাজারকে আরও লাভজনক ও আস্থাশীল করে তুলতে নীতিনির্ধারকরা বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ধারাবাহিক লভ্যাংশ ঘোষণা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
ডিএসইর তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, টেলিযোগাযোগ খাতের কোম্পানি গ্রামীণফোন লিমিটেড সর্বশেষ হিসাববছরের জন্য মোট ২১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ১১০ শতাংশ অন্তর্বর্তীকালীন নগদ লভ্যাংশ আগেই বিতরণ করা হয়েছিল। বাকি ১০৫ শতাংশ চূড়ান্ত নগদ লভ্যাংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
ভোগ্যপণ্য খাতের ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেড গত সমাপ্ত হিসাববছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ৪২০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
অন্যদিকে আনুষঙ্গিক খাতের বহুজাতিক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ মূল্যস্ফীতি ও মুনাফায় ধসের প্রভাবের কারণে তাদের ইতিহাসে সর্বনিম্ন ৩০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এতে প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে ৩ টাকা করে লভ্যাংশ পাবেন বিনিয়োগকারীরা।
ভোগ্যপণ্য খাতের আরেক বহুজাতিক কোম্পানি মারিকো বাংলাদেশ লিমিটেড সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য মোট ২০৭৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। অর্থাৎ প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে বিনিয়োগকারীরা পাবেন ২০৭ টাকা ৫০ পয়সা। এর মধ্যে ১৫৭৫ শতাংশ অন্তর্বর্তীকালীন নগদ লভ্যাংশ আগেই বিতরণ করা হয়েছে।
ওষুধ খাতের কোম্পানি এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড ২০২৪-২৫ হিসাববছরের জন্য সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের ১৪ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। উদ্যোক্তা ও পরিচালকরা এ লভ্যাংশের আওতায় থাকছেন না। কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ২ টাকা ৯ পয়সা। এর আগে ২০২৩-২৪ হিসাববছরে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়া হয়েছিল।
সিমেন্ট খাতের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ গত হিসাববছরের জন্য মোট ৪০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ১৮ শতাংশ অন্তর্বর্তীকালীন লভ্যাংশ ইতোমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। বাকি ২২ শতাংশ লভ্যাংশ ২০২৬ সালের ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে কোম্পানিটি শেয়ারধারীদের প্রায় ৪৬৫ কোটি টাকা লভ্যাংশ দেবে।
এদিকে জুতা ও লাইফস্টাইল পণ্য খাতের প্রতিষ্ঠান বাটা বাংলাদেশ ২০২৫ অর্থবছরের জন্য ১০৫ শতাংশ চূড়ান্ত নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। ফলে পুরো বছরে কোম্পানিটির মোট নগদ লভ্যাংশ দাঁড়িয়েছে ২৪৮ শতাংশে।
কোম্পানিটি জানিয়েছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও তারা ৯ হাজার ১৬৪ মিলিয়ন টাকা টার্নওভার অর্জন করেছে। একই সঙ্গে ভোক্তাদের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমে যাওয়ায় জুতাশিল্পে চাপ তৈরি হলেও গ্রাহককেন্দ্রিক কৌশল অনুসরণ করে ব্যবসায়িক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি।
গত ১২ মে বাংলাদেশ স্টার্ট-আপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির উদ্বোধনী ফান্ড ঘোষণা অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছিলেন, পুঁজিবাজার, বিনিয়োগ বাজার ও আর্থিক খাতকে আরও শক্তিশালী করতে সরকার কাজ করছে।
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান আবু আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, আশা করি আসন্ন বাজেটে পুঁজিবাজারের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করা হবে না। বরং বাজারের স্বার্থে করের চাপ না বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, আসন্ন বাজেটকে ঘিরে পুঁজিবাজারে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ আসতে পারে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারকে কেন্দ্র করে আলাদা কিছু নীতিগত পদক্ষেপও সামনে আসতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। বাজারসংশ্লিষ্ট সবাই বাজেটে এ খাতের জন্য বিশেষ প্রণোদনার প্রত্যাশায় রয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, যেসব ব্যাংক ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে, তাদের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য এই সরকার দায়ী নয়। এসব অনিয়ম ও লুটপাট মূলত আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ঘটেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেনÑলুট হওয়া অর্থ কীভাবে পুনরুদ্ধার করা হবে, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
আবু আহমেদ আরও বলেন, বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতের পাশাপাশি বীমা ও লিজিং খাতেও সংকট চলছে। এরই মধ্যে পাঁচটি লিজিং কোম্পানি বন্ধ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এম মাশরুর রিয়াজ শেয়ার বিজকে বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকর ভূমিকা, তথ্যপ্রকাশের স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির উদ্যোগ জরুরি। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ আরও বাড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনীতি উপকৃত হবে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post