আনোয়ার হোসাইন সোহেল: দীর্ঘদিন ধরে আস্থার সংকটে ভোগা দেশের পুঁজিবাজারে নতুন করে গতি আনতে নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়েছে সরকার। একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নিয়ে ইতোমধ্যে একটি বিশেষ রোডম্যাপ প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে। এই রোডম্যাপ বাস্তবায়নে মূল ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)।
সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পর অর্থমন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এই রোডম্যাপ তৈরি করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কেবল একটি পরিকল্পনা নয়Ñবরং পুঁজিবাজার পুনর্গঠনের একটি বড় পরীক্ষা। এর মাধ্যমে বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের পথ সুগম করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
রোডম্যাপটি মূলত তিনটি প্রধান লক্ষ্যকে সামনে রেখে সাজানো হয়েছেÑবিনিয়োগ বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং বাজার সংস্কার। এই তিনটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে পুঁজিবাজারকে একটি টেকসই ও কার্যকর বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার।
নীতিনির্ধারকদের মতে, অতীতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলোর ধারাবাহিকতা ছিল না। ফলে বাজারে স্থিতিশীলতা আসেনি। এবার নির্দিষ্ট সময়সীমা ও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করে কাজ এগোনোর ফলে বাস্তবায়নের গতি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
রোডম্যাপে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এজন্য বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বাড়ানো এবং অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত অসাধু সিন্ডিকেট ভাঙার বিষয়টিও অগ্রাধিকার পেয়েছে।
প্রান্তিক পর্যায়ের বিনিয়োগকারীদের অন্তর্ভুক্ত করতে জেলাপর্যায়ে বিনিয়োগ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে রাজধানীকেন্দ্রিক বাজার কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে সারাদেশে পুঁজিবাজারের বিস্তার ঘটানো সম্ভব হবে। একইসঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ বিনিয়োগ সুবিধা চালুর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
পুঁজিবাজারে টেকসই উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগকারীদের দক্ষতা ও সচেতনতা বাড়ানো জরুরিÑএই উপলব্ধি থেকেই তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগ শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অনলাইন ও অফলাইনÑউভয় মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এই প্রশিক্ষণ বাস্তবায়ন করবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ বিনিয়োগকারী গড়ে ওঠার পাশাপাশি গুজবনির্ভর বিনিয়োগ প্রবণতা কমবে বলে মনে করছেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা। ফলে বাজারে অস্থিরতা কমে স্থিতিশীলতা আসবে।প্রথম পৃষ্ঠার পর
পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে স্বচ্ছতার অভাবকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই সমস্যা সমাধানে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া তথ্য প্রকাশের মান উন্নয়ন, আর্থিক প্রতিবেদনের নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়েও জোর দেওয়া হচ্ছে। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে এবং বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ এম মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, পুঁজিবাজারের উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরেই একটি সুসংগঠিত রোডম্যাপ অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু বাজার পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে পরিকল্পনা করলে হবে না; বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নব্যবস্থার সঙ্গে পুঁজিবাজারকে কীভাবে যুক্ত করা যায়, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। তার মতে, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নে পুঁজিবাজারকে কার্যকর উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে হলে নীতিগত সংস্কার অপরিহার্য।
পুঁজিবাজারের জন্য বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া রোডম্যাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বাজার সংস্কারের জন্য পৃথক কমিশন গঠন করা। এই কমিশনের প্রধান কাজ হলো বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করবে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুপারিশ করবে।
একইসঙ্গে গত ১৫ বছরে সংঘটিত বিভিন্ন অনিয়ম তদন্তে একটি বিশেষ কমিশন গঠনের কথাও ওই ইশতেহারে বলা হয়েছে। এতে অতীতের ভুলগুলো চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে সেগুলো এড়ানোর পথ সুগম হবে।
রোডম্যাপ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে প্রণীত ১৮০ দিনের রোডম্যাপ বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। সার্বিক পরিকল্পনার প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকি অংশ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিশেষ করে বিএসইসির আওতাধীন যেসব কার্যক্রম রয়েছে, তার একটি বড় অংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। পাশাপাশি অর্থমন্ত্রণালয় ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাও তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। কমিশনের কাঠামোগত বিষয়, যেমন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগÑএসব সরকারের এখতিয়ারভুক্ত হওয়ায় নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হচ্ছে।
রোডম্যাপের আওতায় বন্ড মার্কেট উন্নয়নসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতেও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অনেকগুলো উদ্যোগ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে কিংবা বাস্তবায়নের শেষপর্যায়ে রয়েছে।
তবে তথ্যপ্রযুক্তি-সম্পর্কিত কিছু উদ্যোগÑবিশেষ করে ব্লকচেইন প্রযুক্তি ও আধুনিক আইটি প্ল্যাটফর্ম উন্নয়নÑদীর্ঘমেয়াদি প্রকৃতির হওয়ায় এগুলো বাস্তবায়নে আরও সময় প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে কমিশন উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর সঙ্গে সম্ভাব্য প্রকল্প, ভায়াবিলিটি স্টাডি এবং অর্থায়ন কাঠামো নিয়ে আলোচনা চলছে।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, উন্নয়ন সহযোগীদের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় আইটি অবকাঠামো উন্নয়নসহ অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ কাজও পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে যেসব কাজ শেষ হয়েছে এবং যেগুলো চলমান রয়েছে, তা ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিয়ে গেলে সরকারের ঘোষিত রোডম্যাপ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে পুঁজিবাজার একটি অগভীর ও একমাত্রিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ডিএসইর তালিকাভুক্ত উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কোম্পানি আর্থিক সংকটে উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে বা আর্থিক সংকটে রয়েছে। বাজারে ট্রেজারি বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড ও ডিবেঞ্চার থাকলেও করপোরেট বন্ডের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। ফলে বড় প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য পুঁজিবাজার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
বিশ্বের উন্নত ও উদীয়মান পুঁজিবাজারগুলো বহুমাত্রিক এবং বৈচিত্র্যময়। সেখানে ইকুইটির পাশাপাশি বন্ড, ডেরিভেটিভস, কমোডিটি এবং অবকাঠামোভিত্তিক বিভিন্ন আর্থিক পণ্য সক্রিয়ভাবে লেনদেন হয়। এর বিপরীতে বাংলাদেশের বাজার মূলত ইকুইটিনির্ভর, যা বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত করে দেয়। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারাচ্ছেন।
একসময় পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য ছিল। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে নিট বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। তবে পরবর্তী সময়ে এই প্রবণতা উল্টো দিকে মোড় নেয়।
বিশেষ করে ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ধারাবাহিকভাবে বিদেশি বিনিয়োগে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসেও নেতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। এতে বাজার থেকে বিদেশি মূলধন বেরিয়ে যাচ্ছে, যা সামগ্রিক আস্থার সংকটকে আরও গভীর করছে।
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, পুঁজিবাজারের বর্তমান সংকট কোনো একক পদক্ষেপে সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো, করনীতি এবং বাজার স্থাপত্যÑএই তিনটি ক্ষেত্রে সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন। রোডম্যাপের মাধ্যমে সরকার এই তিনটি ক্ষেত্রেই কাজ করার পরিকল্পনা নিয়েছে। যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে পুঁজিবাজার আবারও বিনিয়োগকারীদের আস্থার জায়গায় পরিণত হতে পারে।
তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অতীতে নেওয়া অনেক উদ্যোগই কাক্সিক্ষত ফল দেয়নি। তাই এবার কার্যকর মনিটরিং, জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ডিএসই চেয়ারম্যান মো. মমিনুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে পুঁজিবাজার নিয়ে আলাদা একটি পরিকল্পনা ছিল। লক্ষ্য হলো, দেশের অর্থনীতিকে ঋণনির্ভরতা থেকে বের করে এনে বিনিয়োগনির্ভর কাঠামোর দিকে নেওয়া। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই ডিএসই নিজেদের দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছে। একটি স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান তিনটি দায়িত্ব হলোÑলেনদেন কার্যক্রম দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা, কোম্পানিগুলোর মূলধন সংগ্রহ প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সহায়তা করা এবং বাজারে কোনো ধরনের কারসাজি বা অনিয়ম হলে তা শনাক্ত করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) জানানো। ডিএসই বর্তমানে এসব কাজ আরও স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালনা করার চেষ্টা করছে।
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু পরিকল্পনা নয়Ñবাস্তবায়নই হবে সফলতার মূল চাবিকাঠি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারলে পুঁজিবাজারে নতুন আস্থা তৈরি হবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা দেবে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post