তামান্না ইসলাম : বাংলাদেশ আজ একটি টানাপোড়েনের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে উন্নয়নের ঝলমলে সব সূচক, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনে নিত্যদিনের সংগ্রাম। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। স্বাধীনতার পর গত ৫০ বছরে দেশ অনেক দূর এগিয়েছে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই উন্নয়নের সুফল কি সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছেছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই চোখে পড়ে অসংখ্য অসমতা ও উপেক্ষার চিত্র। বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প অনেকটাই অবিশ্বাস্য। ১৯৭১ সালে যে দেশটি শুরু করেছিল শূন্য থেকে, যুদ্ধবিদ্ধস্ত অবকাঠামো নিয়ে, সেই দেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশ। আমাদের পোশাক শিল্প বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম। প্রবাসী আয় আমাদের অর্থনীতির একটি বড় স্তম্ভ। কৃষিতে আমরা এখন প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ।
পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে—এসব মেগা প্রকল্প আমাদের গর্বিত করে। ঢাকা শহর এখন আধুনিক গণপরিবহনের স্বাদ পেয়েছে। মানুষ এখন দ্রুত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে পারছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমরা অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছি। এখন প্রায় শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায়।
শিক্ষার হারও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার হার এখন ছেলেদের সমান, এমনকি কোথাও কোথাও বেশি। স্বাস্থ্য খাতেও আমরা অনেক অগ্রগতি করেছি। শিশু মৃত্যুহার কমেছে, মাতৃমৃত্যুও কমছে। গড় আয়ু বেড়ে এখন ৭২ বছরের বেশি।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। ফ্রিল্যান্সিংয়ে বাংলাদেশি তরুণদের সুনাম আছে বিশ্বজুড়ে। মোবাইল ব্যাংকিং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। গ্রামের মানুষও এখন ডিজিটাল সেবা পাচ্ছে।
কিন্তু এই উন্নয়নের পাশাপাশি আরেকটি বাংলাদেশ আছে, যা আমরা অনেক সময় দেখতে চাই না। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান আসলে কতটা উন্নত হয়েছে? একজন দিনমজুর, একজন রিকশাচালক, একজন ছোট দোকানদার—তাদের জীবনে কি আসলেই উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে?
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ। ডাল, তেল, চাল, আটা—সবকিছুর দাম এত বেড়ে গেছে যে মধ্যবিত্ত পরিবারেও চলে ঠেকাঠেকি। পেঁয়াজের দাম বাড়লে সংসারে হাহাকার পড়ে যায়।
শিক্ষা খাতে যতই অগ্রগতি হোক, মানসম্মত শিক্ষা এখনও অনেকের নাগালের বাইরে। সরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষকের অভাব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এখনও প্রকট। যারা একটু ভালো শিক্ষা চান, তাদের বেসরকারি স্কুলে যেতে হয়, যেখানে খরচ আকাশছোঁয়া। কোচিং ছাড়া পরীক্ষায় ভালো করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এতে পরিবারের উপর বাড়তি চাপ পড়ছে।
স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা আরও শোচনীয়। সরকারি হাসপাতালে যেতে গেলে লম্বা লাইন, ওষুধের অভাব, চিকিৎসকের উদাসীনতা—এসব সহ্য করতে হয়। গরিব মানুষের জন্য এটাই একমাত্র ভরসা, কিন্তু সেখানে তারা পায় না সঠিক সেবা। বেসরকারি ক্লিনিকে খরচ এত বেশি যে একটি অসুখ পুরো পরিবারকে ঋণের জালে জড়িয়ে ফেলে।
বেকারত্ব এখনও একটি বড় সমস্যা। শিক্ষিত যুবকরা বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় থাকে। সরকারি চাকরিতে প্রতিটি পদে প্রতিযোগীর সংখ্যা শত বা হাজারে। বেসরকারি খাতে চাকরি পেলেও বেতন এত কম যে তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। অনেকেই তাই বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে, কিন্তু সবাই তো আর যেতে পারে না।
ঢাকা শহর এখন বিশ্বের অন্যতম জনবহুল শহর। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এসে ভিড় করছে এই শহরে। কিন্তু এই শহর কি সবার জন্য? বস্তিতে যারা থাকে, তারাও তো এই শহরেরই মানুষ। কিন্তু তাদের জীবন কেমন? একটি ছোট ঘরে পাঁচ-ছয়জন মানুষের বাস, পানির জন্য লাইনে দাঁড়ানো, স্যানিটেশনের অভাব্তএটাই তাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা।
যানজট ঢাকার এক নম্বর সমস্যা। মেট্রোরেল এসেছে, কিন্তু তা শুধু একটি রুটে। পুরো শহরের জন্য এটা যথেষ্ট নয়। রাস্তায় মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে। এতে কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, জ্বালানি খরচ বাড়ে, মানুষের স্বাস্থ্যের উপরও প্রভাব পড়ে। বায়ুদূষণ এখন ভয়াবহ পর্যায়ে। শীতকালে ঢাকা হয়ে ওঠে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর একটি।
নদীদূষণও গুরুতর সমস্যা। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ—এসব নদী এখন মৃত। শিল্পকারখানার বর্জ্য, গৃহস্থালির ময়লা সব ফেলা হয় এই নদীগুলোতে। পানির রং কালো হয়ে গেছে, দুর্গন্ধ সহ্য করা যায় না। এসব নদীর পাড়ে যারা থাকে, তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেশি।
শহরের উন্নয়নের ঝলক দেখা গেলেও গ্রাম এখনও পিছিয়ে আছে। সরকারি সেবা পৌঁছাতে দেরি হয়। রাস্তাঘাট অনেক জায়গায় এখনও খারাপ। বর্ষাকালে অনেক গ্রাম প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। হাসপাতাল, স্কুল, বাজার—সবকিছু দূরে। গ্রামের মানুষকে শহরমুখী করে তুলছে এই সুবিধার অভাব।
কৃষকদের সমস্যা আরও গভীর। ন্যায্য দাম না পেয়ে তারা ফসল ফেলে রাখতে বাধ্য হয়। মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভের সিংহভাগ নিয়ে নেয়। কৃষি উপকরণের দাম বাড়ছে, কিন্তু ফসলের দাম বাড়ছে না সেই অনুপাতে। এতে কৃষি পেশা ক্রমেই অলাভজনক হয়ে উঠছে। নতুন প্রজন্ম আর কৃষিকাজে আগ্রহী নয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব গ্রামীণ বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। লবণাক্ততা বাড়ছে উপকূলীয় অঞ্চলে। খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়—এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। কৃষকরা আর বুঝে উঠতে পারছে না কখন কোন ফসল ভালো হবে। ঐতিহ্যবাহী চাষাবাদ পদ্ধতি আর কার্যকর নয়।
উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি এখনও প্রকট। প্রতিটি প্রকল্পে নির্ধারিত বাজেটের বড় অংশ চলে যায় দুর্নীতিতে। ফলে মানসম্মত কাজ হয় না, সময়মতো শেষ হয় না। রাস্তা তৈরি হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই ভেঙে যায়। সেতু, কালভার্ট মানসম্মত হয় না। জনগণের করের টাকা এভাবে নষ্ট হয়।
সরকারি সেবা পেতেও অনেক সময় দুর্নীতির আশ্রয় নিতে হয়। জমির দলিল, পাসপোর্ট, বিভিন্ন লাইসেন্স—এসব পেতে ঘুষ দিতে হয়। সাধারণ মানুষ চাইলেও এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কিছু করতে পারে না। অভিযোগ করলে উল্টো হয়রানি হতে হয়।
বিচার ব্যবস্থাও ধীরগতির। একটি মামলার নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। গরিব মানুষের পক্ষে এত দীর্ঘ সময় মামলা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। ফলে তারা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। যাদের টাকা আছে, তারা মামলা দীর্ঘায়িত করে নিজেদের সুবিধা আদায় করে নেয়।
এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের সবার সচেতন হতে হবে। শুধু সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে দিলে হবে না, নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব আছে। ছোট ছোট পরিবর্তন থেকেই বড় পরিবর্তন আসে।
প্রথমত, আমাদের সৎ থাকতে হবে। দুর্নীতিকে না বলতে হবে। ঘুষ না দেওয়া, ঘুষ না নেওয়া্তএটা শুরু করতে হবে নিজের থেকে। হয়তো শুরুতে কষ্ট হবে, কিন্তু এভাবেই পরিবর্তন আসবে। আমরা যদি দুর্নীতি বন্ধ করতে পারি, সরকারি সেবা অনেক উন্নত হবে, প্রকল্পের মান বাড়বে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শুধু সাক্ষরতার হার বাড়ালে হবে না, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে, তাদের বেতন বাড়াতে হবে। স্কুলের অবকাঠামো উন্নত করতে হবে। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারলেই দেশ এগিয়ে যাবে।
তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যসেবা সবার জন্য নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি হাসপাতালের মান উন্নত করতে হবে। চিকিৎসক ও নার্সদের সংখ্যা বাড়াতে হবে। চিকিৎসা সামগ্রীর জোগান নিয়মিত রাখতে হবে। স্বাস্থ্যবীমার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে বড় অসুখে কেউ নিঃস্ব না হয়।
চতুর্থত, পরিবেশ রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। নদী দূষণ বন্ধ করতে হবে। বৃক্ষরোপণ বাড়াতে হবে। প্লাস্টিক ব্যবহার কমাতে হবে। প্রত্যেক নাগরিককে পরিবেশ সচেতন হতে হবে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ পৃথিবী রেখে যেতে হবে।
পঞ্চমত, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মনোযোগ দিতে হবে। ছোট ও মাঝারি শিল্পকে উৎসাহ দিতে হবে। তরুণদের উদ্যোক্তা হতে সাহায্য করতে হবে। কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। প্রত্যেকের হাতে কাজ থাকলে দেশ এগিয়ে যাবে।
বাংলাদেশ এক অপার সম্ভাবনার দেশ। মানুষের শ্রম আছে, মেধা আছে, স্বপ্ন আছে। যা নেই তা হলো সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং সর্বজনীন উন্নয়ন। উন্নয়ন হতে হবে সবার জন্য, শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে। নইলে এই উন্নয়নের গল্প থেকে যাবে অসম্পূর্ণ্তকিছু মানুষের ভাগ্য বদলাবে, আর বাকিরা থেকে যাবে উপেক্ষিত। সত্যিকারের উন্নয়ন সেদিনই হবে, যেদিন উন্নয়নের আলো পৌঁছাবে প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি মানুষের কাছে। সেদিনই বাংলাদেশ পারবে উন্নয়ন আর উপেক্ষার এই দ্বন্দ্ব থেকে বেরিয়ে আসতে।
শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post