বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ইস্যুগুলোর একটি হলো একীভূত পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংকের আমানত সংকট। দীর্ঘদিন ধরে জমা রাখা অর্থ ও প্রত্যাশিত মুনাফা না পাওয়ার অভিযোগে ক্ষুব্ধ আমানতকারীরা এবার সরাসরি রাস্তায় নেমেছেন। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন এসব ব্যাংকের শত শত গ্রাহক।
তাদের দাবি একটাই—মুনাফাসহ সম্পূর্ণ আমানত দ্রুত ফেরত দিতে হবে এবং বিতর্কিত ‘হেয়ার কাট’ সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে।
সম্প্রতি দেশের পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক—ইউনিয়ন ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক—একীভূত করে একটি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বহু আমানতকারী অভিযোগ করছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে তাদের জমা অর্থ তুলতে পারছেন না এবং মুনাফা সম্পর্কেও স্পষ্ট কোনো নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই আমানতকারীরা আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান ফটকের সামনে জড়ো হতে থাকেন আমানতকারীরা। সকাল ১১টার দিকে তারা মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন।
বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন এবং দ্রুত তাদের আমানতের টাকা ফেরতের দাবি জানান। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং আন্দোলনকারীরা শাপলা চত্বরের প্রধান সড়ক অবরোধ করেন।
এতে মতিঝিল এলাকায় যান চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। অফিসগামী মানুষ ও সাধারণ পথচারীরা দীর্ঘ সময় ভোগান্তিতে পড়েন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে মোতায়েন হন। পরে জলকামান ব্যবহার করে সড়ক অবরোধ সরিয়ে দেওয়া হয় এবং পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করা হয়।
আন্দোলনরত আমানতকারীদের প্রধান অভিযোগ হলো ‘হেয়ার কাট’ নামে পরিচিত একটি সিদ্ধান্ত। তাদের দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নরের সময় নেওয়া এই সিদ্ধান্তের কারণে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের আমানতের ওপর মাত্র ৪ শতাংশ হারে মুনাফা দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে।
গ্রাহকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কার্যত তাদের প্রাপ্য মুনাফা কেটে নেওয়ার শামিল।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বক্তারা বলেন, সাধারণ আমানতকারীরা ব্যাংকে টাকা রাখেন নিরাপত্তা ও লাভের আশায়। কিন্তু এখন তাদের সেই বিশ্বাস ভেঙে পড়েছে।
তারা অভিযোগ করেন, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে মাত্র ৪ শতাংশ মুনাফা নির্ধারণ করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং এটি আমানতকারীদের প্রতি অবিচার।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেক গ্রাহক তাদের ব্যক্তিগত দুর্ভোগের কথাও তুলে ধরেন।
কেউ চিকিৎসার জন্য জমা রাখা টাকা তুলতে পারছেন না, কেউ আবার সন্তানের শিক্ষা ব্যয়ের জন্য সঞ্চিত অর্থের অপেক্ষায় আছেন।
বক্তাদের মতে, হাজার হাজার মানুষ বর্তমানে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ তুলতে না পারায় অনেক পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করছে।
তারা বলেন, “আমরা ব্যাংকে বিশ্বাস করে টাকা জমা রেখেছিলাম। এখন সেই টাকাই তুলতে পারছি না। এটি শুধু আর্থিক নয়, মানসিক সংকটও তৈরি করছে।”
আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি হলো—
* আমানতের পুরো অর্থ দ্রুত ফেরত দিতে হবে
* ‘হেয়ার কাট’ সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করতে হবে
* ব্যাংকিং কার্যক্রম দ্রুত স্বাভাবিক করতে হবে
* গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে
তাদের মতে, এসব দাবি পূরণ না হলে দেশের ব্যাংকিং খাতে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিক্ষোভকারীরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
তারা সতর্ক করে বলেন, যদি দ্রুত কোনো সমাধান না আসে, তাহলে আগামী ১২ মার্চ আবারও বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও করার মতো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
এছাড়া তারা দেশজুড়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার কথাও উল্লেখ করেন।
বিক্ষোভের পর মতিঝিল এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে যাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
ব্যাংকপাড়ার গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একীভূত ব্যাংক প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য হলো দুর্বল ব্যাংকগুলোকে স্থিতিশীল করা। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
যদি আমানতকারীরা তাদের টাকা নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন, তাহলে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্বচ্ছতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং কার্যকর যোগাযোগের মাধ্যমে গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ গ্রাহকরা সরকারের কার্যকর হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন।
তাদের মতে, দ্রুত সমাধান না হলে এই সংকট আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে এবং দেশের আর্থিক খাতের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
অতএব, আমানতকারীদের ন্যায্য দাবি বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post