হাসান শিরাজী: রোজ সকাল সাতটায় ক্লাস সেভেনের রাইসাকে দেখলে মনে হয়, সে স্কুলে যাচ্ছে না, বরং পিঠে বিশাল এক পাথরের বস্তা নিয়ে কোনো যুদ্ধে যাচ্ছে। স্কুল, তারপর কোচিং, তারপর বাসায় ফিরে রাত জেগে গাইড বই মুখস্থ করা। দিন শেষে ক্লান্ত রাইসাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, ‘মা, আজ নতুন কী শিখলে?’ সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। সে জানে কীভাবে পরীক্ষার খাতায় হুবহু উগরে দিয়ে জিপিএ-৫ পেতে হয়, কিন্তু সে জানে না এই পড়াগুলো তার নিজের জীবনে কী কাজে লাগবে।
মাননীয় নীতিনির্ধারক ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ, রাইসার এই গল্পটা শুধু তার একার নয়। দেশের লাখ লাখ শিশুর প্রতিদিনের বাস্তব চিত্র এটি। আমরা আমাদের সন্তানদের মানুষ নয়, বরং নম্বর তোলার একেকটি যন্ত্র বা রোবট বানাচ্ছি। দেয়ালে আমাদের পিঠ অনেক আগেই ঠেকে গেছে। এখন সময় এসেছে ঘুরে দাঁড়ানোর।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে আমাদের আজকের এই খোলা চিঠিতে রইল এমন ৫টি জরুরি সংস্কারের গাইডলাইন; যা বাস্তবায়নে আর এক দিনও দেরি করা আমাদের উচিত হবে না।
১. মুখস্থবিদ্যার শেকল ভাঙুন
আমরা এমন এক প্রজš§ তৈরি করছি যারা না বুঝে মুখস্থ করতে ওস্তাদ। এই প্রথার অবসান ঘটাতে হবে এখনই।
করণীয়: পরীক্ষার খাতা থেকে এমন প্রশ্ন চিরতরে বাদ দিন; যা শুধু গাইড বই মুখস্থ করে লেখা যায়। মূল্যায়ন পদ্ধতি এমনভাবে সাজাতে হবে যেন শিক্ষার্থীরা নিজের মাথা খাটিয়ে চিন্তা করতে বাধ্য হয়। গাইড বই আর কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভরশীলতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে সিলেবাস ও পরীক্ষার ধরনে আমূল ও দৃশ্যমান পরিবর্তন আনাটা এখন সময়ের দাবি।
২. খাতা-কলমের বাইরে বাস্তবমুখী ও কর্মমুখী শিক্ষা
আমাদের তরুণরা বিশ্ববিদ্যালয় পেরোনোর পর বছরের পর বছর বেকার বসে থাকছে, কারণ পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে তাদের হাতে কোনো বাস্তব দক্ষতা নেই। রাইসারা যখন বড় হবে, তখন এই পৃথিবীর ধরনটাই বদলে যাবে।
করণীয়: স্কুল পর্যায় থেকেই প্রকল্পভিত্তিক (প্রজেক্ট-বেসড) কাজ বাধ্যতামূলক করুন। কোডিং, কারিগরি জ্ঞান, ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি (টাকা-পয়সার হিসাব বোঝা) কিংবা যোগাযোগের মতো বেসিক স্কিলগুলো পাঠ্যক্রমে যুক্ত করুন। নীতিনির্ধারকদের নিশ্চিত করতে হবে, পড়ালেখা শেষে কোনো শিক্ষার্থী যেন নিজেকে ‘অযোগ্য’ না ভাবে।
৩. শিক্ষকদের ‘কারিগর’ হিসেবে গড়ে তোলা
একটি দেশের সবচেয়ে মেধাবী মানুষগুলোর শিক্ষকতায় আসার কথা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি, আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো আর সামাজিক মর্যাদার অভাবে তা হচ্ছে না।
করণীয়: শিক্ষকদের বেতন কাঠামো সম্মানজনক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, যাতে এই পেশায় আসতে তরুণদের আগ্রহ বাড়ে। পাশাপাশি, পুরোনো আমলের পড়ানোর স্টাইল বাদ দিয়ে শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত ও আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। মনে রাখবেন, একজন হতাশ ও আর্থিক চিন্তায় জর্জরিত শিক্ষক কখনোই ক্লাসে শিশুদের আনন্দ নিয়ে পড়াতে পারবেন না।
৪. গ্রাম ও শহরের বৈষম্যের দেয়াল ভাঙা
ঢাকার একটি নামিদামি স্কুলের শিশুটি যে ডিজিটাল ক্লাসরুম বা সায়েন্স ল্যাবের সুবিধা পাচ্ছে, গ্রামের প্রত্যন্ত স্কুলের শিশুটির কাছে তা এখনও রূপকথার মতো।
করণীয়: নীতিনির্ধারকদের এখনই একটি সেন্ট্রালাইজড বা কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। দেশের প্রতিটি কোনায় শিক্ষার মান ও অবকাঠামো যেন সমান হয়, সেদিকে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ করতে হবে। শহরের স্কুলগুলোয় যা যা সুবিধা আছে, গ্রামের স্কুলগুলোতেও ধাপে ধাপে সেগুলো নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।
৫. ইঁদুর দৌড় থামিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া
জিপিএ-৫-এর এই অন্ধ ইঁদুর দৌড়ে আমরা শিশুদের সুন্দর শৈশবটা কেড়ে নিচ্ছি। তারা এখন আর মাঠে খেলে না, তারা শুধু ছুটছে আর ছুটছে।
করণীয়: পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, শিল্পচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে রুটিনের মূল অংশ করুন, ঐচ্ছিক নয়। প্রতিটি স্কুলে মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সিলর নিয়োগের নীতিমালা তৈরি করুন। এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে পরীক্ষায় খারাপ করলেও একটি শিশু জীবন শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করবে না।
মাননীয় মন্ত্রী ও নীতিনির্ধারকরা, স্কুল ভবনের রং বদলালে কিংবা শুধু বইয়ের প্রচ্ছদ বদলালে শিক্ষার মান বদলাবে না। বদলাতে হবে ভিত। রাইসাদের পিঠের বোঝা আর মনের চাপ কমানোর দায়িত্ব আপনাদেরই। আশা করি, আগামীকালের একটি সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য আজই আপনারা এই সাহসী পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করবেন। সময় কিন্তু ফুরিয়ে যাচ্ছে!
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post