নিজস্ব প্রতিবেদক : রাষ্ট্রের রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক কর কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। সহকারী কর কমিশনার মোসা. তানজিনা সাথী নিজের পাশাপাশি মা-বাবার নামেও সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তানজিনা সাথী, তার বাবা মোশারফ হোসেন মল্লিক এবং মা রানী বিলকিসের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করেছে। গত ১০ মার্চ দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলাগুলো করা হয়।
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তানজিনা সাথীর বাবা মোশারফ হোসেন মল্লিকের নামে ৭ কোটি ৮৮ লাখ ২৮ হাজার ৬৫৫ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে; যার কোনো বৈধ উৎস দেখাতে পারেননি তিনি। একইভাবে তার মা রানী বিলকিসের নামে ১ কোটি ৫৬ লাখ ৫৮ হাজার ৫৬৩ টাকার সম্পদেরও বৈধ উৎসের প্রমাণ মেলেনি।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ওই দম্পতির নিজস্ব কোনো উল্লেখযোগ্য আয়ের উৎস নেই। তবুও তাদের নামে বিপুল সম্পদ দেখানো হয়েছে। দুদকের ধারণা, মেয়ের অর্জিত অবৈধ অর্থ আড়াল করতেই তাদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে এবং আয়কর নথিতে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
অন্যদিকে তানজিনা সাথীর নিজের নামেও রাজধানীর মালিবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের সন্ধান পেয়েছে দুদক। এসব সম্পদের আর্থিক মূল্য প্রায় ৫ কোটি ৬৬ হাজার ৯৪ টাকা। তবে এসব সম্পদের বিপরীতে বৈধ আয়ের কোনো উৎস পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে তানজিনা সাথী ও তার মা-বাবার নামে প্রায় ১৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকার বেশি অবৈধ সম্পদের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক।
তিন মামলার এজাহারে যা বলা হয়েছে: সহকারী কর কমিশনার হিসেবে মোসা. তানজিনা সাথী কর অঞ্চল-৭-এর কর সার্কেল-১৩৭ ও ১৪২ এবং কর অঞ্চল-৯-এর কর সার্কেল-১৮১ কর্তব্যরত ছিলেন। দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিপুল পরিমাণ উৎকোচ গ্রহণ করে নামে-বেনামে অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন এমন অভিযোগ নিয়ে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হয়। অনুসন্ধানকালে তানজিনা সাথীর নামে ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদ এবং ২ কোটি ৩৩ লাখ ৪৪ হাজার ৩৯৬ টাকার অস্থাবর সম্পদের খোঁজ পায় দুদক। সব মিলিয়ে ৫ কোটি ৪৮ লাখ ৪৪ হাজার ৩৯৬ টাকার সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেছে। যেখানে ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৩-২৪ করবর্ষ পর্যন্ত পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় আমলে নিলে অর্জিত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ কোটি ৭৯ লাখ ৭৭ হাজার ৩৯২ টাকা।
যার বিপরীতে তিনি ৭৯ লাখ ১৮ হাজার ২৯৮ টাকার সম্পদের পক্ষে দালিলিক প্রমাণ দেখাতে সমর্থ হয়েছেন। অর্থাৎ জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের পরিমাণ পাওয়া গেছে ৫ কোটি ৬৫ হাজার ৯৪ টাকার। যে কারণে প্রথম মামলার আসামি হয়েছেন।
অন্যদিকে, তার বাবা মো. মোশারফ হোসেন মল্লিকের নামে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ৭ কোটি ৮৮ লাখ ২৮ হাজার ৬৫৫ টাকার সম্পদের প্রমাণ পায় দুদক। মূলত মেয়ে তানজিনা সাথী অবৈধ টাকাকে বৈধ করার লক্ষ্যে তার বাবার নাম ব্যবহার করেছেন। অনুসন্ধানে দেখা যায় বাবা মো. মোশারফ হোসেন মল্লিকের নামে ৩ লাখ ২৯ হাজার টাকার স্থাবর সম্পদ এবং ৪ কোটি ৭৫ লাখ ৪ হাজার ৪২ টাকার অস্থাবর সম্পদ অর্থাৎ নগদ অর্থের প্রমাণ পায় দুদক। ২০০২-০৩ থেকে ২০২৩-২৪ করবর্ষ পর্যন্ত পারিবারিক ও অন্যান্য খাতে আয়কর নথিতে ব্যয় দেখিয়েছেন ৪ কোটি ১৭ লাখ ১৫ হাজার ৫৪ টাকা। সব মিলিয়ে ৮ কোটি ৯৫ লাখ ৪৮ হাজার ৯৬ টাকার সম্পদের মধ্যে বৈধ উৎস দেখাতে পেরেছেন মাত্র ১ কোটি ৭ লাখ ১৯ হাজার ৪৪১ টাকা। বাকিটুকু জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ বলে দুদক প্রমাণ পেয়েছে। আর ওই সম্পদ তার কন্যা তানজিনা সাথীর ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত টাকা বৈধ করার চেষ্টা করেছেন। এই মামলায় বাবার পাশাপাশি মেয়েকেও আসামি করা হয়েছে।
অনুরূপভাবে গৃহিণী মা মোসা. রানী বিলকিসের নামে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ১ কোটি ৫৬ লাখ ৫৮ হাজার ৫৬৩ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের প্রমাণ পেয়েছে দুদক। নিজের অবৈধ আয়কে বৈধ করার লক্ষ্যে তার মায়ের নামে ওই সম্পদ গড়ার অপরাধে মায়ের পাশাপাশি মেয়েকেও আসামি করা হয়েছে তৃতীয় মামলায়।
আসামিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ এর ২৭ (১) ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর ৫ (২) ধারা এবং দণ্ডবিধি ১০৯ ধারায় মামলাগুলো দায়ের করেন দুদকের সহকারী পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post