ইমতিয়াজ আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ: শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জ জেলায় এবার কাঁচা চামড়ার লক্ষ্য এক লাখ তিন হাজারটি। প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদুল আজহাকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জে জমে উঠেছে চামড়া সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রস্তুতি। আর সেই প্রস্তুতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে লবণ; কারণ কোরবানির পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যদি চামড়ায় লবণ না দেওয়া হয়, তবে কোটি টাকার সম্পদ মুহূর্তেই পচে যেতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই এবার আগেভাগেই মাঠে নেমেছে জেলা প্রশাসন। চামড়া নষ্ট হওয়া ঠেকাতে নারায়ণগঞ্জে ১ হাজার ২০০ টন লবণের চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি ও অতিরিক্ত দামের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে প্রশাসন।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত প্রস্তুতিমূলক সভায় উঠে এসেছে চামড়া সংরক্ষণের নানামুখী পরিকল্পনা। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. রায়হান কবির। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, কোরবানির মৌসুমে লবণের কোনো সংকট সৃষ্টি হতে দেওয়া হবে না। বাজার মনিটরিং থেকে শুরু
করে মাঠপর্যায়ে তদারকিÑসবকিছুতেই প্রশাসনের
নজর থাকবে।
ওই সভায় চামড়া ব্যবসায়ী, লবণ সরবরাহকারী, প্রাণিসম্পদ বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন ও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা অংশ নেন। সভায় চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও ট্যানারিতে সরবরাহের পুরো চেইন নিয়ে আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, শুধু লবণ মজুত করলেই হবে না, সেটি সময়মতো মাঠপর্যায়ে পৌঁছানোও নিশ্চিত করতে হবে।
সভায় জেলা প্রশাসক বলেন, কোরবানির মৌসুমে চামড়া নষ্ট হওয়া রোধে সময়মতো লবণ সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, মাঠপর্যায়ে সমন্বয় বাড়ানো এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে যেন কোনো ধরনের অপচয় না হয়, সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রশাসনের হিসেবে এ বছর নারায়ণগঞ্জে কোরবানির পশুর সংখ্যা ও চাহিদাÑদুইই বেড়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য বলছে, জেলার পাঁচটি উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে ৬ হাজার ৫৩৭টি খামারে কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে এক লাখ ১৩ হাজার ৭৫৪টি পশু। বিপরীতে জেলার মোট চাহিদা এক লাখ ৩ হাজার ৪৭টি। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত রয়েছে ১০ হাজার ৭০৭ পশু। আর সেই সঙ্গে বাড়বে চামড়ার পরিমাণও। জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জেলার চাহিদা পূরণের পরও অতিরিক্ত পশু অন্য এলাকায় সরবরাহ করা হবে।
খামারে প্রস্তুত পশুর তালিকায় রয়েছে ৬১ হাজার ৮৯৯টি ষাঁড়, ৬ হাজার ৪৮৬টি বলদ, ১৯ হাজার ৭৪৩টি গাভী, ২ হাজার ৮৪১টি মহিষ, ১৭ হাজার ১৭২টি ছাগল ও ৫ হাজার ৪৯৩টি ভেড়া। এ ছাড়া অন্যান্য শ্রেণির ১২৭টি পশুও রয়েছে। সংখ্যার এই বিশালতা অর্থনৈতিক চক্রের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।
উপজেলাভিত্তিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি কোরবানির পশু রয়েছে নারায়ণগঞ্জ সদর ও আড়াইহাজারে। সদর উপজেলায় ২৮ হাজার ১০০টি এবং আড়াইহাজারে ২৬ হাজার ৮৭৪টি পশু প্রস্তুত রয়েছে। এছাড়া বন্দর উপজেলায় ১৯ হাজার ৮২৭টি, রূপগঞ্জে ১৮ হাজার ৪৯৫টি এবং সোনারগাঁয়ে ২০ হাজার ৪৫৮টি পশু রয়েছে।
চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোরবানির পর প্রথম ২৪ ঘণ্টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে সঠিকভাবে লবণ প্রয়োগ না হলে চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। আর একবার চামড়া পচে গেলে সেটি আন্তর্জাতিক মানের থাকে না। ফলে দেশের রপ্তানি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
নারায়ণগঞ্জের চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছে, অতীতে বহুবার লবণের সংকট কিংবা অতিরিক্ত দামের কারণে চামড়া নষ্ট হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সময়মতো লবণ পৌঁছাতে না পারায় অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এবার তাই প্রশাসনের আগাম প্রস্তুতিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন তারা।
এদিকে ঈদকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশাসনের উদ্বেগ রয়েছে। কারণ কোরবানির পশুর হাট, চামড়া পরিবহন ও নগদ টাকার লেনদেনকে কেন্দ্র করে প্রতিবছরই সক্রিয় হয়ে ওঠে ছিনতাইকারী ও প্রতারক চক্র। এ বিষয়েও প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সী।
তিনি বলেন,‘অন্যান্যবারের মতো এবারও কোরবানির পশুর হাট থেকে শুরু করে পুরো জেলা নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হবে। ক্রেতা-বিক্রেতাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত ও চুরি-ছিনতাই রোধে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ বিশেষ করে পশুর হাটগুলোতে নগদ অর্থ নিয়ে চলাচলকারী ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হবে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল মান্নান মিয়া জানিয়েছেন, কোরবানির পুরো ব্যবস্থাপনাকে এবারও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ। তিনি বলেন, ‘ঈদুল আজহা পবিত্র উৎসব। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে জেলা ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর একটা চ্যালেঞ্জে থাকে। আমরা সব অংশীজনদের নিয়ে সম্মিলিতভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করি।’
তিনি জানান, জেলার বিভিন্ন পশুর হাটে ২৫টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম কাজ করবে। এসব টিম পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, অসুস্থ পশু শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেবে। একইসঙ্গে ক্রেতাদের সচেতন করতেও কাজ করবে তারা।
এবারের কোরবানির বাজারে আরেকটি বড় পরিবর্তন চোখে পড়ছেÑহাটের তুলনায় খামারভিত্তিক পশু বিক্রি বাড়ছে। শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত ক্রেতাদের বড় একটি অংশ এখন সরাসরি খামারে গিয়ে পশু কিনতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।
নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন খামারে এখন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভিড় দেখা যাচ্ছে। পরিবার নিয়ে খামারে গিয়ে পশু দেখা, ছবি তোলা, দরদাম করাÑসব মিলিয়ে এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
মুস্তাফিজ নামে এক ক্রেতা বলেন, ‘ফার্মের পরিবেশ সুন্দর থাকে। হাট থেকে গরু কেনা ঝামেলা হয়ে থাকে। মাঝেমধ্যে পরিবারের সদস্যরাও ফার্মে এসে গরু দেখতে পারে। এটা ভালো লাগে।’ আরেক ক্রেতা আমিনুল বলেন, ‘আমি গত কয়েক বছর ধরেই ফার্ম থেকেই গরু ক্রয় করি। ফার্মের গরুগুলো হাইজেনিকভাবে পালন করা হয়। খাবারও ভালো দেওয়া হয়। ফলে মাংসের গুণগত মানও ভালো থাকে।’
চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, খামারভিত্তিক পশু বাড়ার কারণে চামড়ার মানও উন্নত হচ্ছে। কারণ খামারে পালন করা পশুগুলোর শরীরে ক্ষত কম থাকে এবং নিয়মিত পরিচর্যার কারণে চামড়া তুলনামূলকভাবে ভালো মানের হয়।
নারায়ণগঞ্জের চামড়া বাজার ঘিরে এবার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশাÑচামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। কারণ গত কয়েক বছরে কোরবানির চামড়া নিয়ে হতাশা কম ছিল না। কোথাও বিনা মূল্যে চামড়া দিয়ে দিতে হয়েছে, কোথাও আবার পরিবহন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হয়েছে মৌসুমি সংগ্রাহকদের।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদি সময়মতো লবণ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় এবং চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়, তাহলে এ খাতে বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো যাবে। একইসঙ্গে ট্যানারি শিল্পও পাবে মানসম্মত কাঁচামাল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারায়ণগঞ্জের মতো শিল্পঘন এলাকায় চামড়া শুধু ধর্মীয় উৎসবের উপজাত নয়, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদ।
সেই কারণেই এবার নারায়ণগঞ্জে চামড়া রক্ষার লড়াই শুরু হয়েছে ঈদের আগেই। প্রশাসন, ব্যবসায়ী, খামারি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীÑসবাই যেন একই সুরে বলছে, ‘চামড়া বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলে অর্থনীতি বাঁচবে।’
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post