নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি: আসন্ন কোরবানির ঈদ উপলক্ষে সরকারি ছুটির সঙ্গে মিল রেখে ব্যাংকও সাত দিন বন্ধ থাকবে। ছুটি শেষে ব্যাংক খুলবে আগামী ১ জুন। তবে ছুটির আগে আজ শনিবার ও আগামীকাল রোববার সব ব্যাংকের সব শাখা খোলা থাকবে। লেনদেন হবে স্বাভাবিক সময়সূচি অনুযায়ী।
সেইসঙ্গে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্প খাতে কর্মরতদের বেতন-বোনাস দেওয়ার সুবিধার্থে ২৫ ও ২৬ মে পোশাকশিল্প এলাকার কিছু ব্যাংক শাখা খোলা থাকবে। গত ১৮ মে বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করে সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের পাঠিয়েছিল।
এদিকে কোরবানির ঈদকে কেন্দ করে টানা ব্যাংক ছুটির কারণে দেশের অর্থনৈতিক লেনদেন ব্যবস্থায় নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ ছুটির সময় ব্যাংক বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ের ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা নগদ অর্থ উত্তোলন ও লেনদেন নিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, দীর্ঘ ছুটির সময় নগদ অর্থ সরবরাহ ব্যবস্থায় সমন্বয় না থাকলে সাময়িক তারল্য সংকট তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব বেশি পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে এখনো মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার পুরোপুরি সর্বজনীন নয়।
ঈদের সময় সাধারণত বাজারে নগদ টাকার প্রবাহ বাড়ে। পশু কেনাবেচা, কাঁচাবাজার, পরিবহন ও পারিবারিক খরচÑসব ক্ষেত্রেই নগদ অর্থের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তবে দেশের বড় একটি অংশ এখনো পুরোপুরি ডিজিটাল লেনদেনের আওতায় না আসায় নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা বেশি।
ব্যাংক ছুটির এই সময়ে এটিএম বুথগুলোর ওপর চাপ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কাও রয়েছে। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্তসংখ্যক এটিএম বুথ না থাকায় অনেক এলাকায় সময়মতো নগদ টাকা উত্তোলন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেকেই আগেভাগে টাকা তুলে রাখার চেষ্টা করেন, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। এছাড়া পশুরহাটে গরু কেনাবেচা শেষে নগদ অর্থ নিয়ে অনেকেই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, কারণ দেশের সব এলাকায় পর্যাপ্ত এটিএম বুথ না থাকায় বড় অঙ্কের টাকা নিরাপদে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় তাদের নানা ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘ ছুটির সময় নগদ অর্থ সরবরাহ ব্যবস্থায় সমন্বয় না থাকলে সাময়িক তারল্য সংকট তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব বেশি পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে এখনো মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার পুরোপুরি সর্বজনীন নয়।
তারা বলেন, উৎসবকালীন সময়ে ব্যাংকগুলোর উচিত ছিল আগেভাগে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ বিতরণ নিশ্চিত করা এবং এটিএম বুথে পর্যাপ্ত অর্থ সরবরাহ বজায় রাখা। পাশাপাশি ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার পরিধি বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তারা।
এদিকে সাধারণ মানুষও জানিয়েছেন তাদের উদ্বেগের কথা। অনেকেই বলছেন, ঈদের আগে বাজারে কেনাকাটা ও গরু-ছাগল কেনার সময় নগদ টাকার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি হয়। কিন্তু ব্যাংক বন্ধ থাকলে বা এটিএমে টাকা না থাকলে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়।
অন্যদিকে টানা ছুটির সময়ে গ্রাহকদের আর্থিক লেনদেন নির্বিঘ্ন রাখতে আগাম সতর্কতা জারি করা হয়েছে। দেশের সব তফসিলি ব্যাংককে এটিএম বুথে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পিওএস, ই-পেমেন্ট গেটওয়ে ও মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) সচল রাখতে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ ীয় ব্যাংক। যার মূল উদ্দেশ্য উৎসবের ব্যস্ত সময়ে যেন লেনদেনে ভোগান্তির মুখে না পড়েন সাধারণ মানুষ। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট থেকে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠানো হয়।
এ বিষয়ে অর্থনীতি বিশ্লেষক ও পলিসি থিংক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মো. মাজেদুল হক শেয়ার বিজকে বলেন, দেশের অর্থনীতি মূলত ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। আমদানি-রপ্তানি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, কাস্টমস ক্লিয়ারিংসহ রাজস্ব আহরণের প্রায় সব কাজই ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তাই দীর্ঘ সময় কার্যক্রম সীমিত থাকলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতায় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
তিনি বলেন, শুধু ঈদ বা উৎসবকালীন সময় নয়, বরং সারা বছরই ব্যাংকিং সেবাকে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর রাখা জরুরি। বিশেষ করে রোস্টার ভিত্তিতে ব্যাংকিং সেবা চালু রাখা এবং বিভাগীয় শহর, বন্দর এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক স্থানে নির্দিষ্ট কিছু শাখা খোলা রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে। এ ছাড়া বেনাপোল ও চট্টগ্রাম বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্যাংকিং সেবা সচল রাখা এবং জেলা শহরে অন্তত একটি করে শাখা খোলা রাখার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা দরকার। কারণ এসব এলাকার সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক লেনদেন জড়িত।
ঈদকে কেন্দ করে গরু কেনাবেচার মতো বড় আর্থিক লেনদেন হয় উল্লেখ করে মাজেদুল হক বলেন, এ সময় বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বড় হাটগুলোয় লেনদেন শেষে ব্যবসায়ীরা যাতে নিরাপদে টাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় রাখতে পারেন, সেটিই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। বাসায় বা ব্যক্তিগতভাবে বড় অঙ্কের নগদ অর্থ রাখা ঝুঁকিপূর্ণ বলেও তিনি সতর্ক করেন।
সব মিলিয়ে দীর্ঘ ব্যাংক ছুটি ও সীমিত শাখা কার্যক্রমের কারণে ঈদকেন্দি ক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা ব্যাংকিং সেবাকে আরও বিস্তৃত ও ধারাবাহিক রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, যাতে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি বজায় থাকে।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post