নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি: পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের কোম্পানি ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস লিমিটেডের শেয়ারদর কারণ ছাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় ফের আলোচনায় উঠে এসেছে শেয়ারবাজারের বহুল আলোচিত-সমালোচিত মুখ আবুল খায়ের হিরুসহ তার সহযোগীদের নাম। ২০২৪ সালের পর থেকে কারণ ছাড়াই কোম্পানিটির শেয়ারদর প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এমন অস্বাভাবিকভাবে শেয়ারদর বাড়ার পেছনের পুঁজিবাজারের পুরোনো খেলোয়ার হিরুর হাত রয়েছে বলে অভিযোগ বাজারসংশ্লিষ্টদের।
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মতে, একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানিটির শেয়ার নিয়ে কারসাজি করছে। মূলত চক্রটি কৃত্রিমভাবে শেয়ারদর বাড়িয়ে প্রচুর অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, শীর্ষ এক ব্রোকারেজ হাউস থেকে শেয়ারটি নিয়ে কারসাজি হচ্ছে। তবে দেশের পুঁজিবাজারে কারসাজির ইতিহাস নতুন নয়।
প্রথমে গোপন তথ্য বাজারে ছড়ানো হয়, তারপর কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো হয়, এরপর শেয়ার বিক্রি করে কোম্পানির পক্ষ থেকে সংবেদনশীল গোপন তথ্য প্রকাশ করা হয়। পুরোনো এই কৌশলে দিনের পর দিন বিনিয়োগকারীদের নিঃস্ব করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ডমিনেজ স্টিল অ্যান্ড বিল্ডিং সিস্টেমস এই পুরোনো খেলার পুনরাবৃত্তি করেছে। এর ফলে আবারও নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জানা গেছে, একটি চক্র কোম্পানিটির বিক্রির গুজব ছড়িয়ে শেয়ারদর বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া দুর্বল মৌল ভিত্তি শেয়ার নিয়ে হরহামেশা কারসাজি চলছে। এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার খতিয়ে দেখা উচিত।প্রথম পৃষ্ঠার পর
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রভাবেই এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে, যা সামগ্রিক বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সূত্রে জানা গেছে, শেয়ারের দর অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার কারণ জানতে চেয়ে গত ৭ এপ্রিল কোম্পানিটিকে চিঠি পাঠায় ডিএসই। চিঠির জবাবে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়, কোনো রকম অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়ছে।
জানা গেছে, ডমিনেজ স্টিলের দুটি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে নরসিংদীর কারখানা বন্ধ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কোম্পানিটির শেয়ারদর অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে বলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) নজরে এসেছে। ফলে কোম্পানিটিতে বিনিয়োগের আগে বিনিয়োগকারীদের সচেতন হওয়া উচিত বলে মনে করে উভয় স্টক এক্সচেঞ্জে কর্তৃপক্ষ।
ডিএসইর তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত দরবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গত বছরের এপ্রিলে কোম্পানিটির শেয়ারদর ছিল ১৪ দশমিক ৯ টাকা। বর্তমানে ডমিনেজ স্টিলের শেয়ারদর ৫৪ টাকা ১০ পয়সা। অর্থাৎ ডমিনেজ স্টিলের শেয়ারদর এক বছরে ৭২ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেড়েছে।
২০২০ সালে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলামের সময় ডমিনেজ স্টিলের আইপিও অনুমোদন দেন। প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে কোম্পানিটি পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত হয়। আইপিওর মাধ্যমে এটি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৩০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। এজন্য আইপিওতে তিন কোটি শেয়ার বিক্রি করে কোম্পানিটি।
বিএসইসির অনুমোদনের সময়ই দুর্বল মানের কোম্পানিটির অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু ওই সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থা শীর্ষ পর্যায়ের সমর্থন থাকায় এটির আইপিও অনুমোদনে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি ইস্যু ম্যানেজারকে। কোম্পানিটিকে পুঁজিবাজারে আনতে ইস্যু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল শাহজালাল ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট। শাহজালাল ইক্যুইটির মালিকানায় রয়েছেন ছাগলকাণ্ডে আলোচিত এনবিআরের সাবেক কর্মকর্তা মতিউর রহমান ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান বর্তমানে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইউনুছ। চক্রটি ছিল বিএসইসির সাবেক দুই চেয়ারম্যান এম খাইরুল হোসেন ও শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলামের ঘনিষ্ঠ। এ কারণে শাহজালাল ইক্যুইটির হাত ধরে নিম্নমানের অনেক কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির সুযোগ পায় গত দুই কমিশনের সময়কালে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির বছর না ঘুরতেই এটি ‘বি’ শ্রেণিভুক্ত হয়। আর ভালো মুনাফা দেখিয়ে পুঁজিবাজারে আসা কোম্পানিটি এখন লোকসানি প্রতিষ্ঠান। আর এই উৎপাদন বন্ধের ক্ষেত্রেও আইন মানেনি কোম্পানিটি। ফলে কোম্পানিটির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে মনে করেন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এ বিষয়ে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) এবং কোম্পানি সচিবকে একাধিকবার কল করলে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিংয়ের শেয়ারকারসাজি নিয়ে প্রশ্ন করলে রেগে যান আলোচিত-সামালোচিত আবুল খায়ের হিরু। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমি এখন শেয়ারবাজারে নেই। মানুষ আমার নামে মিথ্যাচার করছে।’
তবে এর আগে হিরু ও তার পরিবার শেয়ার কারসাজির অভিযোগে জরিমানাও গুনেছেন। হিরুর বিরুদ্ধে শেয়ার কেলেঙ্কারির একাধিক মামলাও রয়েছে। তিনি সমবায় অধিদপ্তরের উপ-নিবন্ধক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। জানা গেছে, এশিয়া ইন্স্যুরেন্স, সোনালী পেপারসহ বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার কারসাজির দায়ে তাকে ও তার সহযোগীদের কয়েক দফায় কয়েকশ কোটি টাকা জরিমানা করেছিল বিএসইসি।
শেয়ার ব্যবসায়ী আবুল খায়ের হিরুর বিরুদ্ধে ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারের কারসাজিরও অভিযোগ ছিল। হিরু শেয়ার ব্যবসায় আসেন ২০০৬ সালে। তবে ২০১৯ সালের নভেম্বরে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার দিয়ে কারসাজিতে তার হাতেখড়ি। আর ‘মাস্টার’ হয়েছেন মূলত ২০২০ সালের জুলাই থেকে একের পর এক বীমা কোম্পানির শেয়ারের দর আকাশচুম্বী করে। কারসাজি করেই ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত ১০৬ কোটি টাকা রিয়েলাইজড গেইন করেন তিনি।
ছাত্র-জনতার অবিস্মরণীয় অভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। এর মাধ্যমে টানা ১৬ বছরের আওয়ামী লীগের নজিরবিহীন দুঃশাসন ও স্বেচ্ছাচারিতার অবসান ঘটে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে কোণঠাসা অবস্থায় আছেন আবুল খায়ের হিরু। সম্প্রতি হিরুর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মোনার্ক মার্টকে এক লাখ টাকা জরিমানা করে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ২ ডিসেম্বর দেশের পুঁজিবাজারে ডমিনেজ স্টিলের লেনদেন শুরু হয়। কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ১৫০ কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ১০২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। রিজার্ভে রয়েছে ৭৩ কোটি ১৮ লাখ টাকা। মোট শেয়ারসংখ্যা ১০ কোটি ২৬ লাখ। এর ৩০ দশমিক ২০ শতাংশ রয়েছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ৮ দশমিক ৩২, বিদেশি বিনিয়োগকারী দশমিক শূন্য ৪ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে বাকি ৬১ দশমিক ৪৪ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post