হাসান শিরাজী: মিরপুরের বাসিন্দা রহমান সাহেবের গল্পটা দিয়ে শুরু করা যাক। মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ তিনি। গ্রীষ্মের এক ভ্যাপসা গরমের রাত। ছেলেটা সামনে এসএসসি পরীক্ষা দেবে, মেয়েটারও স্কুল আছে। হঠাৎ পুরো এলাকায় চলে গেল বিদ্যুৎ। আইপিএস ব্যাটারিও বেশিক্ষণ সার্ভিস দিতে পারল না। ঘামে ভিজে একাকার পুরো পরিবার, হাতপাখার বাতাসেও স্বস্তি নেই। তার ওপর মাস শেষে যখন বিদ্যুতের বিল হাতে আসে, রহমান সাহেবের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হয়। গত কয়েক বছরে বিদ্যুতের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে সংসারের অন্যান্য খরচ চালানো দায় হয়ে পড়েছে।
রহমান সাহেবের এই গল্পটা শুধু তার একার নয়। বাংলাদেশের লাখো পরিবারের প্রতিদিনের বাস্তব চিত্র। বিশ্বজুড়ে কয়লা, গ্যাস বা তেলের দাম বাড়ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন বা মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের মতো আন্তর্জাতিক ঘটনার সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমাদের রান্নাঘর আর ড্রয়িংরুমে। এই যে অন্যের ওপর বা আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভর করে আমাদের বেঁচে থাকাÑএখান থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী?
এই প্রশ্নের একটাই উত্তরÑ‘জ্বালানি নিরাপত্তা’ বা এনার্জি সিকিউরিটি। আর সাধারণ মানুষের জন্য এই নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় ঢাল হতে পারে ‘নবায়নযোগ্য শক্তি’ বা রিনিউয়েবল এনার্জি, সহজ কথায় যার মানেÑসৌরবিদ্যুৎ (সোলার) এবং বায়ুবিদ্যুৎ (উইন্ড)। সূর্য আমাদের বিল পাঠায় না, বাতাসও আমাদের কাছে টাকা চায় না। তাহলে এই অফুরন্ত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমরা কেনো নিজেদের বাড়ি, রাস্তা আর শহরকে আলোকিত করছি না?
আজকে আমরা জানব, কীভাবে খুব সহজ কিছু পরিকল্পনার মাধ্যমে আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে পারি এবং কীভাবে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে এই খাতকে আরও বেশি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া যায়।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের সফলতা: আমাদের করণীয় নিয়ে কথা বলার আগে চলুন একটু বিশ্বের দিকে তাকাই। জার্মানির কথাই ধরুন। শীতপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও তারা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছে। সেখানে এমন অনেক গ্রাম আছে, যারা নিজেদের প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ নিজেরাই উৎপাদন করে, উল্টো বাড়তি বিদ্যুৎ সরকারের কাছে বিক্রি করে।
চীনের কথা না বললেই নয়। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সোলার প্যানেল এবং উইন্ড টারবাইন উৎপাদনকারী দেশ তারা। তাদের বড় বড় শহরে প্রতিটি বহুতল ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল থাকাটা একরকম নিয়মে পরিণত হয়েছে।
পাশের দেশ ভারতের কেরালার কোচি বিমানবন্দরের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, যেটি বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণ সৌরবিদ্যুৎ চালিত বিমানবন্দর। তুরস্ক এবং নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলো আরও এক ধাপ এগিয়ে হাইওয়ের রাস্তার ডিভাইডারে বায়ুকল বা উইন্ড টারবাইন বসিয়েছে। অর্থাৎ, নবায়নযোগ্য শক্তি এখন আর কোনো বিলাসী বা পরীক্ষামূলক বিষয় নয়, এটি টিকে থাকার প্রধান হাতিয়ার।
আমাদের দেশেও এই হাতিয়ারটি কাজে লাগাতে হবে। কিন্তু কীভাবে? চলুন কিছু বাস্তবসম্মত গাইডলাইন বা নির্দেশিকা নিয়ে আলোচনা করা যাক।
১. সোলার এবং উইন্ড পাওয়ার কোম্পানিকে দেশে আনা: আমাদের দেশে সোলার প্যানেল বা উইন্ড টারবাইন কেনা এখনো বেশ ব্যয়বহুল। এর প্রধান কারণ, এসব সরঞ্জামের বেশিরভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আমদানি শুল্ক, পরিবহন খরচÑসব মিলিয়ে দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। এক্ষেত্রে সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত দেশি-বিদেশি বড় কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে তাদের কারখানা স্থাপনে উৎসাহিত করা।
ট্যাক্স হলিডে ও প্রণোদনা: যারা বাংলাদেশে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি বা উইন্ড টারবাইন তৈরি করবে, তাদের জন্য অন্তত ১০ থেকে ১৫ বছরের ‘ট্যাক্স হলিডে’ বা কর মওকুফের ঘোষণা দেওয়া যেতে পারে।
বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল: সরকারের যেসব ‘ইকোনমিক জোন’ বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি হচ্ছে, সেখানে শুধু নবায়নযোগ্য শক্তির সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর জন্য আলাদা একটি ব্লক বরাদ্দ করা যায়। সেখানে তাদের স্বল্পমূল্যে জমি, গ্যাস, পানি এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
কাঁচামাল আমদানিতে শূন্য শুল্ক: প্যানেল বা টারবাইন তৈরির কাঁচামাল (যেমন: সিলিকন সেল, বিশেষ গ্লাস বা অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেম) আমদানির ওপর শুল্ক একদম শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে। যখন দেশেই এসব তৈরি হবে, তখন রহমান সাহেবের মতো মধ্যবিত্ত মানুষ অর্ধেক দামেই তার ছাদে সোলারের সেটআপ বসাতে পারবেন।
২. রাস্তার ডিভাইডারে বায়ুকল স্থাপন: এটি শুনতে অনেকটা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মতো লাগলেও বর্তমানে এটি অত্যন্ত বাস্তব এবং কার্যকর একটি প্রযুক্তি। আপনারা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, যখন হাইওয়ে দিয়ে বড় কোনো বাস বা ট্রাক সাঁই করে চলে যায়, তখন প্রচণ্ড একটা বাতাসের ঝাপটা লাগে। এই ঝাপটা বা কৃত্রিম বাতাসকে কাজে লাগিয়েই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।
প্রযুক্তির ধরন: এই প্রযুক্তির নাম ‘ভার্টিক্যাল অ্যাক্সিস উইন্ড টারবাইন’। এগুলো সাধারণ বায়ুকলের মতো বিশাল পাখাওয়ালা নয়। এগুলো দেখতে অনেকটা খাড়া সিলিন্ডার বা ড্রামের মতো, যা খুব অল্প জায়গায় বসানো যায়।
কীভাবে কাজ করবে: ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে কিংবা শহরের ভেতরের ব্যস্ত রাস্তা, যেমন এয়ারপোর্ট রোড বা মিরপুর রোডের ডিভাইডারের মাঝে মাঝে নির্দিষ্ট দূরত্বে এই ছোট ছোট টারবাইনগুলো বসানো যেতে পারে। দুপাশ দিয়ে যখন দ্রুতগতিতে গাড়ি চলবে, তাদের তৈরি করা বাতাসের ধাক্কায় এই টারবাইনগুলো ঘুরবে।
সুবিধা: এই ছোট টারবাইনগুলো থেকে যে বিদ্যুৎ তৈরি হবে, তা একটি ছোট ব্যাটারিতে জমা হবে। রাতের বেলা ওই রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের বাতিগুলো জ্বালাতে এই বিদ্যুৎই ব্যবহার করা হবে। ফলে রাস্তার আলোর জন্য জাতীয় গ্রিডের ওপর আর কোনো চাপ পড়বে না। সিটি করপোরেশন এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগ যৌথভাবে দেশি ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর (যেমন বুয়েট বা রুয়েট) সঙ্গে মিলে এই প্রকল্প হাতে নিতে পারে।
৩. বিশাল ছাদগুলোর সদ্ব্যবহার: ঢাকা শহরে এখন মেট্রোরেল একটি বিশাল স্বস্তির নাম। কিন্তু আপনি কি কখনো মেট্রোরেলের স্টেশনগুলোর দিকে খেয়াল করেছেন? উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রতিটি স্টেশনের ওপরে রয়েছে বিশাল আয়তনের ফাঁকা ছাদ। শুধু মেট্রোরেল নয়, কমলাপুর বা বিমানবন্দর রেলস্টেশন, গাবতলী বা সায়েদাবাদের মতো বড় বাস টার্মিনালগুলোর ছাদও বছরের পর বছর অব্যবহƒত পড়ে থাকে।
মেগা স্ট্রাকচারে সোলার ইনটিগ্রেশন: এই বিশাল ছাদগুলো হতে পারে একেকটি আস্ত পাওয়ার প্ল্যান্ট। সরকারি উদ্যোগে এই ছাদগুলোতে হাই-ক্যাপাসিটি সোলার প্যানেল বসানো যেতে পারে।
স্টেশনগুলোর স্বয়ংসম্পূর্ণতা: একটি মেট্রোরেল স্টেশন বা রেলস্টেশনে সারা দিন প্রচুর লাইট, ফ্যান, এসি, লিফট বা এস্কেলেটর চলে। ছাদের সোলার প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে দিনের বেলা স্টেশনের সম্পূর্ণ চাহিদা মেটানো সম্ভব।
নেট মিটারিং সিস্টেম: ছুটির দিনে বা শীতকালে যখন বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকে, তখন এই সোলার প্যানেলগুলোতে তৈরি হওয়া উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ ‘নেট মিটারিং’ সিস্টেমের মাধ্যমে সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যোগ করা যেতে পারে। এর ফলে সরকারের বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচও কমে আসবে। সরকারি ভবনের পাশাপাশি বেসরকারি বড় শপিং মল বা গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোর ছাদকেও এই আইনের আওতায় আনা উচিত, যেন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা সোলারের জন্য ফাঁকা রাখা বাধ্যতামূলক হয়।
৪. ব্যাংকগুলো যুক্ত করা: ধরা যাক, ওপরের সব ব্যবস্থা নেওয়া হলো। কিন্তু রহমান সাহেব যখন হিসেব করে দেখলেন তার বাড়ির ছাদে দুই কিলোওয়াটের একটি সোলার সিস্টেম বসাতে প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা খরচ হবে, তখন তিনি পিছিয়ে গেলেন। মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে এককালীন এত বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করা প্রায় অসম্ভব। ঠিক এই জায়গাতেই প্রয়োজন ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জোরালো ভূমিকা।
সহজ শর্তে ‘সবুজ ঋণ’: বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংককে ‘গ্রিন ফিন্যান্সিং’ বা সবুজ ঋণের জন্য একটি বড় অংকের ফান্ড বরাদ্দ রাখতে হবে। এই ঋণের সুদ হবে একেবারেই নামমাত্র, ধরুন ৩ থেকে ৪ শতাংশ।
ইএমআই বা কিস্তি সুবিধা: লোন শোধ করার প্রক্রিয়াটা হতে হবে একদম পানির মতো সহজ। ধরুন, রহমান সাহেব প্রতি মাসে ডেসকো বা ডিপিডিসিকে তিন হাজার টাকা বিদ্যুতের বিল দেন। ব্যাংক তাকে এমনভাবে লোন দেবে যেন তিনি সোলার প্যানেল বসানোর পর প্রতি মাসে ওই তিন হাজার টাকাই ব্যাংকের কিস্তি হিসেবে পরিশোধ করেন।
দীর্ঘমেয়াদি লাভ: এভাবে পাঁচ বা সাত বছর কিস্তি দেওয়ার পর রহমান সাহেবের লোন শোধ হয়ে যাবে। এরপরের ২০ বছর (একটি সোলার প্যানেলের সাধারণ আয়ুষ্কাল ২৫ বছর) তিনি সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে বিদ্যুৎ পাবেন। তার আর কোনো বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার টেনশন থাকবে না।
বাণিজ্যিক ঋণ: শুধু বাসাবাড়ি নয়, ছোট-বড় দোকান, রেস্টুরেন্ট বা ফ্যাক্টরির মালিকরাও যেন সহজেই এই ঋণ পান, তার ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক সময় জমির কাগজপত্রের জন্য লোন আটকে যায়, এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো সোলার প্যানেলের সরঞ্জামাদিকেই গ্যারান্টি বা ‘কোল্যাটারাল’ হিসেবে ধরতে পারে।
ভবিষ্যতের পথরেখা: জ্বালানি নিরাপত্তা এমন কোনো জাদুর কাঠি নয় যে, আজ বললেই কাল সব ঠিক হয়ে যাবে। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সদিচ্ছা। আমরা যদি আজ থেকে আমাদের রাস্তা, বাসাবাড়ি এবং সরকারি ভবনগুলোকে নবায়নযোগ্য শক্তির উপযোগী করে সাজাতে শুরু করি, তবে আগামী ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ জ্বালানি খাতে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশে পরিণত হতে পারে।
একটু কল্পনা করুন তো! আপনার বাড়ির বিদ্যুৎ আপনি নিজেই তৈরি করছেন। লোডশেডিং নামের শব্দটি আপনার ডিকশনারি থেকে চিরতরে মুছে গেছে। হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি চলার সময় ডিভাইডারের ছোট ছোট বায়ুকলগুলো বোঁ বোঁ করে ঘুরছে, আর রাতের বেলা চারপাশ আলোয় ভরিয়ে দিচ্ছে। মেট্রোরেল চলছে নিজের উৎপাদিত শক্তিতে। পরিবেশ দূষণ নেই, কয়লার কালো ধোঁয়া নেই।
এটি কোনো অবাস্তব স্বপ্ন নয়। সঠিক নীতিমালা, ব্যাংকগুলোর আন্তরিকতা এবং প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা গেলে এটিই হবে আমাদের আগামী দিনের বাংলাদেশ। আর এই পরিবর্তনের শুরুটা হতে হবে আমাদের নিজেদের চিন্তাধারা থেকে। রহমান সাহেবের মতো আমাদের সবাইকেই বুঝতে হবে, ছাদে ফেলে রাখা ফাঁকা জায়গাটা আসলে ফাঁকা নয়, ওটা আমাদের ভবিষ্যতের শক্তির আধার। আসুন, আমরা শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীই না হই, বরং হয়ে উঠি এক একজন গর্বিত বিদ্যুৎ উৎপাদক। তাহলেই নিশ্চিত হবে আমাদের এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজšে§র সত্যিকারের জ্বালানি নিরাপত্তা।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post