সাখাওয়াত সাব্বির, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম বন্দরের কার শেডগুলোয় এখন অদ্ভুত নীরবতা। একটা সময় যেখানে সারি সারি গাড়ি আর শ্রমিকদের কোলাহলে মুখর থাকত পুরো এলাকা, সেই শেড প্রায় শূন্য। তিনটি শেডের মোট ধারণক্ষমতা ১ হাজার ২৫০ ইউনিট। কিন্তু বর্তমানে সেখানে আছে মাত্র ৬১৪টি গাড়ি, যার মধ্যে ৪১৩টি আবার নিলামযোগ্য পুরোনো। সদ্য আমদানি হওয়া গাড়ির সংখ্যা মাত্র ২০১টি। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় বাংলাদেশের গাড়ি আমদানির বাজারে কী ভয়াবহ মন্দা নেমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির নেতিবাচক গতিপ্রকৃতি মিলিয়ে এই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বিক্রি কমে যাওয়ায় অনেক গাড়ি ব্যবসায়ী লোকসানে পড়েছেন; এ কারণে শুল্ক কমানো ও আমদানিযোগ্য গাড়ির বয়সসীমা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে বারভিডা।
চট্টগ্রাম বন্দরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান এক করুণ বাস্তবতার ছবি তুলে ধরে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে মাত্র ২ হাজার ৯১২টি গাড়ি এসেছে দেশে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ কম। গত বছরের মার্চে রেকর্ড পরিমাণ গাড়ি খালাস হলেও চলতি বছরের মার্চে তা সর্বনিম্নে নেমেছে। গত বছর মাত্র তিন মাসেই আমদানি হয়েছিল প্রায় চার হাজার গাড়ি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৫১৮টি, ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ১৫৩টি, মার্চে ৪৯৭টি এবং এপ্রিল মাসে আমদানি হয় ৭৪৪টি গাড়ি। দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যান দেখলে এই পতন আরও স্পষ্ট। ২০১৯ সালে বন্দর দিয়ে গাড়ি এসেছিল ৬১ হাজার ৪৬৭টি। ২০২১ সালে তা ছিল ৫৫ হাজার ১৫১টি। কিন্তু এরপর থেকে ক্রমাগত নিম্নমুখী। ২০২২ সালে ৩০ হাজার ৮৮০টি, ২০২৩ সালে ২৪ হাজার ১৫০টি, ২০২৪ সালে ২০ হাজারটি এবং ২০২৫ সালে ১৪ হাজার ১৬৪টি। ছয় বছরের ব্যবধানে আমদানি কমেছে প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, আগের সময়ের তুলনায় বর্তমানে শেডে গাড়ির সংখ্যা অনেক কম। ফলে এখানে এখন কোনো ধরনের গাড়ির জট নেই। বৈশ্বিক নানা সংকটের কারণে গাড়ি আমদানি কিছুটা কমেছে। ব্যবসায়ীরাও নানা সমস্যায় রয়েছেন। তাই ব্যবসা কম হয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন শেয়ার বিজকে বলেন, বিগত কয়েক বছরে দেশে রিকনডিশন্ড গাড়ি আমদানি কমে যাওয়ার পেছনে বৈশ্বিক ও দেশীয় নানা কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের রিকনডিশন্ড গাড়ির বাজারে দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে জনপ্রিয় মডেলের মধ্যে ছিল জাপানি নির্মাতা টয়োটার প্রিমিও ও অ্যালিয়ন। ২০২১ সালের মার্চ থেকে মডেল দুটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এর পর থেকেই বাংলাদেশে এসব গাড়ির নতুন স্টকের সরবরাহ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। বিশেষ করে মধ্য ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের মধ্যে ব্যাপক চাহিদা থাকা এই সেডান গাড়িগুলোর বাজারে এক ধরনের সংকট তৈরি হয়। ২০২০ সালে করোনা মহামারির প্রভাব বৈশ্বিক গাড়িশিল্পকে বড় ধরনের চাপে ফেলে। জাপানে গাড়ি উৎপাদন কমে যায়, অকশন কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ে এবং সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ সংকট দেখা দেয়। একই সময়ে আন্তর্জাতিক শিপিং ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় জাপান থেকে বাংলাদেশে রিকনডিশন্ড গাড়ি আমদানির খরচও অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। ফলে অনেক আমদানিকারক আগের মতো নিয়মিত চালান আনতে পারেননি।
তিনি আরও বলেন, ২০২২ সালের পর দেশে ডলারের সংকট তীব্র হলে গাড়ি আমদানির ওপর তার সরাসরি প্রভাব পড়ে। বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সামাল দিতে ব্যাংকগুলো বিলাসপণ্য আমদানিতে সতর্ক অবস্থান নেয়। ফলে গাড়ি আমদানির এলসি খোলায় অনাগ্রহ তৈরি হয়। এ ছাড়া ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় গত কয়েক বছরে গাড়ির দাম আরও বেড়েছে। কারণ একই গাড়ি আমদানিতে আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে বাড়তি শুল্ক, পরিবহন ব্যয় ও ব্যাংকিং খরচ যুক্ত হয়ে রিকনডিশন্ড গাড়ির বাজারে মূল্যচাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের এই কর্মকর্তা বলেন, দেশীয়ভাবে গাড়ি সংযোজন ও উৎপাদন কার্যক্রমও ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান স্থানীয়ভাবে গাড়ি অ্যাসেম্বলিং ও উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানোয় বাজারে বিকল্প সরবরাহ তৈরি হয়েছে। ফলে সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর রিকনডিশন্ড গাড়ির বাজারেও এর কিছুটা প্রভাব পড়েছে। এ ছাড়া বিশ্ববাজারের প্রবণতার সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশেও এখন ধীরে ধীরে এসইউভি, ক্রসওভার ও হাইব্রিড গাড়ির চাহিদা বাড়ছে। ফলে প্রচলিত সেডানভিত্তিক বাজার কিছুটা সংকুচিত হয়েছে। অনেক ক্রেতা এখন জ্বালানিসাশ্রয়ী ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর গাড়ির দিকে ঝুঁকছেন।
বাংলাদেশে গাড়ি আমদানিতে ৮০০ থেকে সাড়ে ৮০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয়। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে জ্বালানির সংকট ও দাম বৃদ্ধি। ফলে গাড়ি কেনায় আগ্রহ কমে গেছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ রিকনডিশন্ড ভেহিক্যালস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বারভিডার) সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট হাবিব উল্লাহ ডন জানান, আমরা ব্যবসায়ীরা ভালো নেই। ডলারসংকট ও ব্যাংক খাতের অবস্থা সুবিধাজনক নয়। এলসি ও পেমেন্ট প্রক্রিয়া নিয়ে আমরা ঝামেলায় পড়ছি। বাজারে নগদ টাকার প্রবাহ কমে গেছে। তাই আমাদের বেচাকেনাও কমে গেছে। এখন ক্রেতারা গাড়ি কেনায় আগ্রহী নন। বিশেষ করে জ্বালানির অনিশ্চয়তার কারণে তেলের গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে অনেকেই দ্বিধায় আছেন। তাই ইলেকট্রিক গাড়ির দিকে ঝুঁকছেন ক্রেতারা।
এই সংকট উত্তরণে আসন্ন জাতীয় বাজেটে বেশ কিছু দাবি নিয়ে সরকারের দরজায় কড়া নেড়েছে বারভিডা। সংগঠনটি হাইব্রিড, প্লাগ-ইন হাইব্রিড ও জাপানের রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিতে শুল্ক কমানোর দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি মাইক্রোবাসের সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার, পিকআপে শুল্ক কমানো, নতুন ও রিকনডিশন্ড গাড়ির শুল্কায়নে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে আমদানিযোগ্য গাড়ির বয়সসীমা বর্তমান পাঁচ বছর থেকে আট বছরে উন্নীত করার দাবিও তুলেছে সংগঠনটি।
বারভিডার হিসাবমতে, রিকনডিশন্ড মোটরযান আমদানি ও বিপণন খাতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার স্থানীয় বিনিয়োগ রয়েছে। সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো বছরে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা রাজস্ব দেয়। ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজসহ এ খাতকে ঘিরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ২০২৪ সালের পর বৈদেশিক মুদ্রার সংকট কিছুটা কমলেও শুল্ক ও কর হার অপরিবর্তিত থাকার মধ্যে ‘টাকার অবমূল্যায়নের’ কারণে আমদানি করা গাড়ির দাম বেড়ে যায়। এতে গাড়ি অধিকাংশ ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে যায়, কমে যায় বিক্রি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গাড়ির বাজারে এই মন্দা এক দিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ শুল্কের চাপ ছিলই। তার ওপর ডলার সংকট, ব্যাংক খাতের অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কা পরিস্থিতিকে সংকটজনক করে তুলেছে। জ্বালানিসংকটের কারণে তেলচালিত গাড়ির চাহিদা কমলেও বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার এখনও বাংলাদেশে পরিপক্ব হয়নি। ফলে মাঝখানে পড়ে যাচ্ছে পুরো গাড়ির বাজার। এই পরিস্থিতিতে বাজেটে কার্যকর শুল্ক ছাড় না দিলে এবং ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা না এলে স্বল্প মেয়াদে এই খাত ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে দীর্ঘদিন ধরে লাখো মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িত এই খাতটি সরকারের নজরে না পড়লে বিনিয়োগকারীরা একে একে সরে যাবেন, সেই আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post