ওয়াহিদুর রহমান রুবেল, কক্সবাজার: অনুমোদিত ভবনের নকশায় বেজমেন্টে কিচেন না থাকলেও তথ্য গোপন করে বেজমেন্টে কিচেন তৈরি করে ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে ‘সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা লিমিটেড’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পক্ষ থেকে বেজমেন্টের কিচেন সরিয়ে নিতে বলা হলেও তা আমলে নিচ্ছে না প্রতিষ্ঠানটি। পর্যাপ্ত ফায়ার সিকিউরিটি না থাকায় চরম নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা জানিয়েছেন হোটেলে বেড়াতে আসা পর্যটক ও কর্মরত শ্রমিক। এ অবস্থায় অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা এড়াতে মুনাফালোভী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেছেন হোটেল কর্তৃপক্ষ।
তথ্য বলছে, কক্সবাজারের ইনানীর মোহাম্মদ শফির বিল এলাকায় পাঁচ তারকা মানের হোটেল ‘সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা’ ২০১৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে রিসোর্টটি উদ্বোধন করেন। সে সময় রিসোর্টটি ‘রয়েল টিউলিপ’ নামে পরিচিত হলেও বর্তমানে ‘সি পার্ল রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা লিমিটেড’ নামে পরিচিত। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, হোটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল হক শামীম সে সময় নিজেকে আওয়ামী লীগ ঘরানার লোক দাবি করতেন। একই সঙ্গে হোটেলটিতে আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পারিবারিক আত্মীয়ের শেয়ার আছে বলে প্রচার করতেন। ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে জমি দখল করতে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কয়েকবার বিরোধে জড়ায় প্রতিষ্ঠানটি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হোটেলের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হোটেল যে নকশায় নির্মাণের জন্য অনুমোদন নেওয়া হয় সেখানে বেজমেন্টে কিচেন ছিল না। কিন্তু নির্মাণ শেষে ক্ষমতার জোরে বেজমেন্টে (ভূগর্ভস্থ কক্ষে) রান্নাঘর (কিচেন) স্থাপন করেন। অথচ নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য এবং অবকাঠামোগত ঝুঁকি এড়ানোর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বেজমেন্টে কখনও আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। বের হওয়ার পথ (এক্সিট রুট) সীমিত থাকার কারণে পর্যটকদের জীবনহানির ঝুঁকি রয়েছে। এ ছাড়া সঠিক ভেন্টিলেশন না থাকলে রান্নাঘরের ধোঁয়া, তাপ ও কার্বন মনোক্সাইড বেজমেন্টে জমে গিয়ে শ্বাসকষ্টসহ চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন কর্মচারীরা। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স থেকে বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও বেজমেন্ট থেকে কিচেন সরানোর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। বেজমেন্ট থেকে কিচেন সরানোর জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স থেকে সর্বশেষ ২০২৫ সালের জুলাই মাসে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কক্সবাজার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ফায়ার সেফটি সংক্রান্ত বিষয়ে ২০২৫ সালের ৭ জুলাই অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কক্সবাজার কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক তানহারুল ইসলামকে প্রধান করে (বর্তমানে উপসহকারী পরিচালক ঢাকা) একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি ৩০ জুলাই হোটেল পরিদর্শন করে ভবনের বেজমেন্টের রেস্টুরেন্ট অন্যত্র সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। ভবনের দুই সিঁড়ির লবির মধ্যে বিদ্যমান পার্টিশনও সরিয়ে নিতে বলা হয়। এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ৩১ জুলাই অধিদপ্তরে জমা দেয় তদন্ত কমিটি। প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে আরও একটি নোটিশ দেওয়া হয় প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে। তবে তা আমলে নেয়নি প্রতিষ্ঠানটি।
জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কক্সবাজার কার্যালয়ের ওয়ারহাউস ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে বেজমেন্টে কিচেন নির্মাণ করে আইন ভঙ্গ করেছে। ফায়ার সার্ভিসের এনওসির জন্য তারা আবেদন করেন। তাদের আবেদনের ভিত্তিতে অধিদপ্তরের গঠিত কমিটি বেজমেন্ট থেকে কিচেন সরানোসহ কয়েকটি সুপারিশ করে প্রতিবেদন দেওয়া হয়। যদি বেজমেন্ট থেকে কিচেন সরানো না হয় তবে এনওসি দেওয়া হবে না।
অভিযোগ রয়েছে, নানা অনিয়মের কারণে পরিবেশ অধিদপ্তরও ছাড়পত্র দেয়নি। পরে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্র দিতে বাধ্য হয়েছে।
এদিকে, প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারহোল্ডারদের বিরুদ্ধে শেয়ার কারসাজির গুরুতর অভিযোগ ওঠে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর তারা কৃত্রিম সংকট, মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ও গুজবের মাধ্যমে রিসোর্টের শেয়ারের দর অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করে। রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল হক শামীমসহ শেয়ারহোল্ডাররা কারসাজি করে নিজেদের মধ্যে বারবার শেয়ার কেনাবেচা করে কৃত্রিমভাবে এ দাম বৃদ্ধি করেন। ২০২৩ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তদন্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য বেরিয়ে আসে।
হোটেলের জিএম এডি আইসা বেজমেন্টে কিচেন স্থাপনের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘হোটেল নির্মাণের সময় অনুমোদন না থাকলেও পরে আমরা বেজমেন্টে কিচেন স্থাপনের অনুমোদন নিয়েছি। এতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র (ফায়ার এক্সটিংগুইসারস) রয়েছে। বেশ কয়েকবার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ পরিদর্শন করেছেন। আমরা নবায়নের আবেদন করেছি। আশা করছি নবায়ন হবে। তবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স থেকে নোটিশ প্রদানের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন তিনি।’
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post