শেয়ার বিজ ডেস্ক : চীনের অর্থনীতি ২০২৫ সালে পাঁচ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশটির সরকারের নির্ধারিত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করলেও দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল সমপ্রসারণগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো (এনবিএস) সোমবার এ তথ্য জানিয়েছে।
চতুর্থ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) চীনের অর্থনীতি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা তৃতীয় প্রান্তিকের ৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকের ৫ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কম। এর ফলে স্পষ্ট হয়েছে যে বছরের শেষ দিকে প্রবৃদ্ধির গতি কমে গেছে।
এনবিএস জানিয়েছে, ‘বিভিন্ন চাপের মধ্যেও জাতীয় অর্থনীতি স্থিতিশীল অগ্রগতি বজায় রেখেছে।’ তবে একই সঙ্গে তারা স্বীকার করেছে, বাইরের পরিবেশের পরিবর্তন, অতিরিক্ত সরবরাহ এবং দুর্বল চাহিদার কারণে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা ও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ট্রেড ওয়ার ও শুল্ক চাপ সত্ত্বেও চীন এই লক্ষ্য পূরণ করতে পেরেছে মূলত শক্তিশালী রপ্তানির কারণে। ২০২৫ সালে চীনের রপ্তানি ৬ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ৯৮৯ বিলিয়ন ইউয়ানে (প্রায় ৩ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার)। একই সময়ে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রেকর্ড ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। চীনা কোম্পানিগুলো এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা ও ইউরোপে নতুন বাজার খুঁজে পাওয়ায় রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে।
তবে ভোগ এবং রিয়েল এস্টেট খাত অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিসেম্বরে খুচরা বিক্রয় মাত্র শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে, যা আগের মাসের ১ দশমিক ৩ শতাংশের চেয়েও কম। পুরো বছরে ফিক্সড অ্যাসেট ইনভেস্টমেন্ট ৩ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। এর মধ্যে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ কমেছে ২ দশমিক ২ শতাংশ এবং রিয়েল এস্টেট খাতে বড় ধস নেমে ১৭ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গৃহস্থালির আস্থার অভাব ও বাড়ির দামের পতনের কারণে মানুষ খরচ কমিয়ে সঞ্চয় বাড়াচ্ছে। এতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা আরও দুর্বল হচ্ছে।
ইএনজির গ্রেটার চায়না চিফ ইকোনমিস্ট লিন সং বলেছেন, ২০২৫ সালের লক্ষ্য পূরণ হলেও বছরের দ্বিতীয়ার্ধে প্রবৃদ্ধির গতি স্পষ্টভাবে কমেছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো ডেক্সটার রবার্টস বলেন, চীন এখনও রপ্তানিনির্ভরতা থেকে বের হতে পারছে না এবং ঘরোয়া আস্থা ও ভোগ বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
২০২৫ সালে চীনের মোট জিডিপি দাঁড়িয়েছে ১৪০ দশমিক ১৯ ট্রিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ১৯ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার)। খাতভিত্তিক হিসেবে কৃষি খাত বেড়েছে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ, শিল্প খাত ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সেবা খাত ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। শিল্প উৎপাদন বেড়েছে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ, যেখানে হাই-টেক ও ইকুইপমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে ৯ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
খুচরা বিক্রি বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং অনলাইন বিক্রি বেড়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। বাণিজ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশ ৫৭ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে। শহুরে বেকারত্বের হার ৫ দশমিক ২ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি প্রায় শূন্যে স্থির রয়েছে।
নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, ২০২৬ সালে শুরু হতে যাওয়া ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় চাহিদা বাড়ানো, শিল্প খাত আধুনিকীকরণ এবং রিয়েল এস্টেট খাতের ঝুঁকি কমানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের অর্থনীতি এখন একটি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ভোগ পুনরুদ্ধার ও সম্পত্তি বাজারের স্থিতিশীলতাই হবে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post