শেখ শাফায়াত হোসেন : আন্তব্যাংক ফরেক্স মার্কেটে ইউএস ডলারের দর বেড়ে গত চার দিনে ১২১.৮৯ টাকা থেকে ১২২.৫০ টাকা হয়েছে। ডলারের এই দরবৃদ্ধির কোনো মৌলিক কারণ দেখছেন না ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন।
তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, এটা চাহিদা এবং সরবরাহের অসামাঞ্জস্যতা ছাড়া আর কিছু বলে মনে হচ্ছে না। ডলারের বাজার অনেক দিন ধরেই স্থিতিশীল ছিল। অনেক ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রি করেছে যাতে তাদের অবস্থান কমবেশি নিরাপদ থাকে। অন্যদিকে, রেমিট্যান্স প্রবাহে সাধারণত মাসের ১৮ থেকে ২৫ তারেখের মধ্যে কিছুটা ধীরগতি দেখা দেয়। তাছাড়া গত সপ্তাহে কিছু আমদানিকারক তাদের এলসির বিপরীতে কিছুটা আগেই পাওনা পরিশোধ করেছেন।
বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলার’র অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা) এর এই সদস্য আরও বলেন, আশা করা হচ্ছে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ডলারের বাজার আগের অবস্থানে ফিরে আসবে এবং দর আগের মতো ১২২ টাকায় স্থিতিশীল হবে। আমাদের চলতি হিসাব এখন ভালো অবস্থানে রয়েছে। দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।
গত বুধবার দেশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে ডলারের বিক্রয়মূল্য ছিল সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৭৫ পয়সায়, যা একদিন আগে ছিল সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৩০ পয়সা।
বুধবার স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে ডলারের বিক্রয়মূল্য ছিল ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা এবং ক্রয়মূল্য ছিল ১২১ টাকা ৭৫ পয়সা।
রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকে ডলারের বিক্রয়মূল্য ছিল ১২২ টাকা ৬০ পয়সা এবং ক্রয়মূল্য ছিল ১২১ টাকা ৬০ পয়সা।
ঢাকা ব্যাংক এক ডলার বিক্রি করেছে ১২২ টাকা ৫০ পয়সায় এবং ক্রয় করেছে ১২১ টাকা ১৫ পয়সায়।
গত সপ্তাহে এই হার কিছুটা কম ছিল। ডলারের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আন্তঃব্যাংক বিনিময় হারকেও প্রভাবিত করেছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের সর্বোচ্চ দাম ছিল ১২২ টাকা ৫০ পয়সা, যা আগের দিন গত মঙ্গলবার ছিল ১২২ টাকা।
গত সোমবার পর্যন্ত ডলারের আন্তঃব্যাংক বিনিময় হার ছিল ১২১ টাকা ৮০ পয়সার আশপাশে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে আমদানি এলসি খোলা হয়েছে ৬০৩ কোটি ডলারের, আগস্টে যার পরিমাণ ছিল ৫৩৮ কোটি ডলার।
এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ছয়টি ব্যাংক থেকে প্রতি ডলার ১২১ টাকা ৮০ পয়সা দরে ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার কিনেছে। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো থেকে মোট ২১২ কোটি ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, দীঘদিন ধরেই আন্তঃব্যাংক ডলারের দর ১২১ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। হঠাৎ করেই ডলারের দর কিছুটা বেড়ে ১২২ টাকা হয়। বুধবার তা আরও কিছুটা বেড়ে প্রায় ১২৩ টাকার কাছাকাছি উঠে আসে।
বুধবার দেশের মুদ্রাবাজারে প্রধান মুদ্রাগুলোর মধ্যে দাম বেড়েছে ইউয়ানের। আর কমেছে ইউরো, পাউন্ড, অস্ট্রেলীয় ডলার, সিঙ্গাপুরি ডলারের। অপরিবর্তিত আছে ভারতীয় রুপি ও জাপানের ইয়েন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত বৈদেশিক মুদ্রার দামের চেয়ে কিছুটা বেশি দামে খোলাবাজারে বিক্রি হয়। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামার সঙ্গে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচও ওঠানামা করে।
এদিকে একই সময়ে সোনার দামে বড় ধরনের পতন ঘটে। রেকর্ড দামে পৌঁছানোর পর দিনেই এমন পতন দেখেছে বিশ্ববাজারে সোনার দাম। গত মঙ্গলবার একদিনে সোনার দাম ২ শতাংশের বেশি কমে যায়।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ২.৩ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৫৬ ডলার ১৯ সেন্টে। এর আগের দিন সোমবার এটি ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৩৮১ ডলার ২১ সেন্টে পৌঁছেছিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমাতে পারে এমন প্রত্যাশা সোনার বাজারকে উত্তপ্ত করেছিল। গত এক বছরে ডলার সূচক প্রায় আট শতাংশ কমেছে, আর সেই ফাঁকেই সোনার দাম বাড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ।
বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ নীতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পর অনেক দেশ এখন তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সোনার অংশ বাড়াচ্ছে। চীন টানা ১৮ মাস ধরে রিজার্ভে সোনা যোগ করছে। পোল্যান্ড, তুরস্ক, সৌদি আরবও একই পথ অনুসরণ করছে।
সাম্প্রতিক বছরে বাংলাদেশ বিনিময় হারের দিক থেকে বড় পরিবর্তনের দিকে গেল। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে ডলার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক। তবে আইএমএফের তথ্য বলছে, বিশ্বের ৩৬টি দেশ তাদের মুদ্রা পুরোপুরি ভাসমান (ফ্রি ফ্লোট) করে রেখেছে। বেশির ভাগ দেশই নিয়ন্ত্রিত ফ্লোটিং বা ক্রলিং পেগ নীতি অনুসরণ করে।
এদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩১ মাস পর আবার ৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। সম্প্রতি গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক শূন্য ২ বিলিয়ন ডলার। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম৬ অনুযায়ী, রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার।
এস এস/
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post