ইমদাদ ইসলাম : ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রথম ধাপে গঠন করা হয় সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ ও বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন। এই ছয়টি সংস্কার কমিশনের সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এসব আলোচনায় ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়। এরপর এই ৮৪ প্রস্তাবকে অন্তর্ভুক্ত করে জুলাই সনদের খসড়া তৈরি করে ঐকমত্য কমিশন। খসড়ার ওপর আবার আলোচনা হয় এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতও নেওয়া হয়। সব দলের মতামত পর্যালোচনা করে অবশেষে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ লিখিত আকারে চূড়ান্ত করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঐতিহাসিক ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ স্বাক্ষর করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতারা। জুলাই সনদের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর অঙ্গীকারনামা। দলগুলোর নেতারা এতেও সই করেছেন। ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে জনগণের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেওয়া’—এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে অঙ্গীকারনামা শুরু হয়েছে। সনদের শুরুতে এর পটভূমি তুলে ধরে বলা হয়েছে, প্রায় দুইশ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন ও পরবর্তীকালে পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। কিন্তু স্বাধীনতার পর ৫৩ বছরেও মহান স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বর্ণিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের নীতি পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। বারবার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে।
প্রথম অঙ্গীকারে বলা হয়েছে, জনগণের অধিকার ফিরে পাওয়া এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে হাজারো মানুষের জীবন ও রক্তদান এবং অগণিত মানুষের সীমাহীন ক্ষয়ক্ষতি ও ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত সুযোগ এবং তৎপ্রেক্ষিতে জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে দীর্ঘ ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রণীত ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের দলিল হিসেবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবো।
অঙ্গীকারের দ্বিতীয় দফায় বলা হয়েছে, এই রাষ্ট্রের মালিক জনগণ; তাদের অভিপ্রায়ই সর্বোচ্চ আইন এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের অভিপ্রায় প্রতিফলিত ও প্রতিষ্ঠিত হয় রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে। এ অবস্থায় আমরা রাজনৈতিক দল ও জোটসমূহ সম্মিলিতভাবে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে জনগণের অভিপ্রায়ের সুস্পষ্ট ও সর্বোচ্চ অভিব্যক্তি হিসেবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ প্রণয়ন করা হয়েছে বিধায় এই সনদের সব বিধান, নীতি ও সিদ্ধান্ত সংবিধানে অন্তর্ভুক্তকরণ নিশ্চিত করা এবং বিদ্যমান সংবিধান বা অন্য কোনো আইনে ভিন্নতর কিছু থাকলে সেক্ষেত্রে এই সনদের বিধান-প্রস্তাব-সুপারিশ প্রাধান্য পাবে।
তৃতীয় দফায় বলা হয়েছে, এই সনদের কোনো বিধান, প্রস্তাব বা সুপারিশের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত যেকোনো প্রশ্নের চূড়ান্ত মীমাংসার এখতিয়ার বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ওপর ন্যস্ত থাকবে। চতুর্থ অঙ্গীকারে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর প্রতিটি বিধান, প্রস্তাব ও সুপারিশ সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে বলবৎ হিসেবে গণ্য হবে বিধায় এর বৈধতা, প্রয়োজনীয়তা কিংবা জারির কর্তৃত্ব সম্পর্কে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না। অঙ্গীকারনামার পঞ্চম দফায় বলা হয়েছে, ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এ বাংলাদেশের সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তথা সংবিধান, বিচার ব্যবস্থা, নির্বাচন ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশি ব্যবস্থা ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার বিষয়ে যেসব প্রস্তাব-সুপারিশ লিপিবদ্ধ রয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন, পরিমার্জন, লিখন ও পুনর্লিখন এবং বিদ্যমান আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন, পরিবর্তন, পরিমার্জন, লিখন, পুনর্লিখন বা নতুন আইন প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়ন বা বিদ্যমান বিধি ও প্রবিধির পরিবর্তন বা সংশোধন করব।
ষষ্ঠ দফায় উল্লেখ করা হয়েছে, আমরা ঐকমত্যে স্থির হয়েছি যে, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম এবং বিশেষত; ২০২৪ সালের অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে সাংবিধানিক তথা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হবে। সপ্তম দফায় বলা হয়েছে, আমরা সম্মিলিতভাবে ঘোষণা করছি যে, রাষ্ট্র ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকালে সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ডের বিচার, শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান ও শহীদ পরিবারসমূহকে যথোপযুক্ত সহায়তা প্রদান এবং আহতদের সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। সবশেষ দফায় উল্লেখ করা হয়েছে, আমরা এই মর্মে একমত যে, জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর যেসব প্রস্তাব বা সুপারিশ অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য বলে বিবেচিত হবে, সেগুলো কোনো প্রকার কালক্ষেপণ না করেই পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সরকার ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসমূহ সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করবে।
‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত কতিপয় প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের দিনেই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। যেখানে চারটি বিষয়ের ওপর একটি প্রশ্নে (হ্যাঁ-না) ভোট অনুষ্ঠিত হবে। প্রশ্ন চারটি হলো—(ক) নির্বাচনকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে। (খ) আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। (গ) সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সমপ্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে। এবং (ঘ) জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
আমাদের জানা দরকার গণভোট কী? গণভোট হলো জনগণের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতি। বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। এখানে জনগণই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সকল ক্ষমতার উৎস। সরকার নিজে সংবিধান সংশোধন করতে পারে না, কারণ সংবিধান সরকারের ঊর্ধ্বে। সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষমতা কেবল সংসদ (জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত এমপি) বা জনগণের (গণভোটের মাধ্যমে) হাতে থাকে। সংবিধান সংস্কারে গণভোট প্রয়োজন, কারণ এতে জনগণের মতামত সরাসরি প্রতিফলিত হয় এবং পরিবর্তনের বৈধতা নিশ্চিত হয়। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে গণভোট বিষয়ে জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গণভোট ২০২৬ সংসদ নির্বাচন ‘দশের চাবি আপনার হাতে’ শীর্ষক একটি প্রচারপত্র-লিফলেট প্রকাশ করা হয়েছে।
‘দেশের চাবি আপনার হাতে’ শীর্ষক লিফলেটে বলা হয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) গঠনে সরকারি দল ও বিরোধী দল একত্রে কাজ করবে। সরকারি দল ইচ্ছামতো সংবিধান সংশোধন করতে পারবে না। সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান চালু হবে। বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটিসমূহের সভাপতি নির্বাচিত হবেন। যত মেয়াদই হোক, কেউ সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব পর্যায়ক্রমে বাড়বে। ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য পার্লামেন্টে একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। দেশের বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করবে। আপনার মৌলিক অধিকারের সংখ্যা (যেমন: ইন্টারনেট সেবা কখনও বন্ধ করা যাবে না) বাড়বে। দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকে রাষ্ট্রপতি ইচ্ছেমতো ক্ষমা করতে পারবেন না। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য থাকবে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার মর্যাদার পাশাপাশি অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ভাষারও সাংবিধানিক স্বীকৃতি হবে। এ বিষয়গুলোর ওপর ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে উপরের সবকিছু পাবেন। ‘না’ ভোট দিলে কিছুই পাবেন না। মনে রাখবেন, পরিবর্তনের চাবি এবার আপনারই হাতে। আরও বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন: www.gonovote.gov.bd এবং www.gonovote.bd
তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা, খাদ্য মন্ত্রণালয়
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post