নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি : পুঁজিবাজারকে চাঙা ও টেকসই করতে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ সংস্থা এবং নতুন সরকারের কঠোর নজরদারি এখন সবচেয়ে বড় দাবি। বারবার অনিয়ম, কারসাজি ও তথ্য গোপনের ঘটনায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হয়েছে। এ আস্থা ফেরাতে শুধু সূচক বাড়লেই হবে না, বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। যাতে বাজারে কেউ নিয়ম ভেঙে লাভবান হতে না পারে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা নিরাপদে বিনিয়োগের পরিবেশ পানÑএমনটাই মনে করছেন পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর তিন দিন দেশে কোনো সরকার ছিল না। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হতে যাচ্ছে-এমন খবরে পুঁজিবাজারের সূচক বেড়েছিল। কিন্তু সরকার গঠনের পর থেকে আবারও তা কমতে থাকে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নিজে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে। তারা বাজার বিশ্লেষণ করে ঠিক পদক্ষেপও নিতে পারেননি। তাই আস্থাসংকটে ভালো শেয়ারেরও দর কমছে। সরকার পতন, নতুন সরকার গঠন এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় পুঁজিবাজারে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। এছাড়া পুঁজিবাজারে কারসাজির সঙ্গে জড়িত অনেকের বিরুদ্ধে বর্তমান কমিশন ব্যবস্থা না নেওয়ায় নতুন করে বড় বিনিয়োগ হয়নি।
আগের বিনিয়োগকারীরাও ভয়ে সরে গিয়েছিলেন বলে মনে করছেন পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটিয়ে স্থিতিশীল সরকারের সুবাতাসে দেশের পুঁজিবাজারে আবারও আস্থা ও স্থিতিশীলতা ফিরবেÑএমনটাই প্রত্যাশা বিনিয়োগকারীদের। নতুন রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের আভাসে সূচক ও লেনদেন উভয় ক্ষেত্রেই দেখা গেছে বড় ধরনের উত্থান। তবে এই ধারাবাহিকতা কতদিন থাকে তা এখন দেখার বিষয় বলে মনে করছেন পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, ২০১০ সালের বড় ধসের পর বাজার ঘুরে দাঁড়াবেÑএমন আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং গত প্রায় দেড় দশকের বেশি সময়ে নানা অনিয়ম, দুর্বল কোম্পানিকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) অনুমোদন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতার কারণে বিনিয়োগকারীরা বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়ে পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থা হারিয়েছে। এতেই কার্যত পুঁজিবাজারকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) নেতারা অভিযোগ তুলেছেন, ২০১০ সালে পুঁজিবাজার কেলেঙ্কারির পর পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা অধ্যাপক এম খায়রুল হোসেন বাজারে কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো বিনিয়োগকারীদের নানা নীতি ও বিধিমালার ফাঁদে ফেলেছে। এতে অনেক বিনিয়োগকারী নিঃস্ব হয়েছেন। তারই দেখানো পথে হেঁটেছেন আওয়ামী লীগ সরকারের অত্যন্ত আস্থাভাজন কমিশনার অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিশন। বাজার কারসাজিকারীদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে বিনিয়োগকারীদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। নামে-বেনামে নিজেই জড়িয়েছেন বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাতের কাজে। কমিশনকে তিনি এতটাই কবজা করেছেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বলে কোনো কিছুই ছিল না তার নেতৃত্বাধীন কমিশনে। ইনসাইডার ট্রেডিং, আইপিও অনুমোদন, প্লেসমেন্ট বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও তোলা হয় উভয় কমিশনের বিরুদ্ধে। আবার নির্বাচনের ঠিক আগ-মুহূর্তে এসে পাঁচ ব্যাংক একীভূত করা হলে ওই ব্যাংকগুলোর শেয়ারে বিনিয়োগ করা বিনিয়োগকারীদের শেয়ার শূন্য ঘোষণা করা হয়। এতে বড় ক্ষতির মুখে পড়ে বিনিয়োগকারীরা।
সরকারের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের পুঁজিবাজারে যেসব সংস্কার হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার এসেছে মার্জিন লোনের ক্ষেত্রে। গত ১৫-২০ বছরে পুঁজিবাজারে যেসব অনিয়ম, কারসাজি ও স্ক্যান্ডাল হয়েছে, তার বড় অংশই মার্জিন লোনকে কেন্দ্র করে। বাজার ম্যানুপুলেশন, ভুয়া খবর ছড়িয়ে দাম বাড়ানো বা দুর্বল ফান্ডামেন্টালের শেয়ারকে কৃত্রিমভাবে ওপরে তোলার মতো ঘটনাগুলো এ ব্যবস্থার সুযোগ নিয়েই ঘটেছে। নতুন আইনের মাধ্যমে মার্জিন লোনে নিয়ন্ত্রণ আসায় বাজারে ইতিবাচক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদিও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কিছু সংস্কার সবার পছন্দ হয়নি। তবুও এসব সংস্কার ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, একই সঙ্গে পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি খুবই প্রয়োজন। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান যেমনÑইউনিলিভার, নেসলে, আলিকো কিংবা আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো বিশ্বের অন্য দেশে লিস্টেড হলেও বাংলাদেশে নয়Ñএটা বাজারের জন্য বড় দুর্বলতা। ভালো কোম্পানির শেয়ার বাজারে এলে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদে আস্থা নিয়ে বিনিয়োগ করতে পারবে। অতীতে ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের মতো সংকট প্রমাণ করেছে, পুঁজিবাজারকে জুয়া খেলার জায়গা বানালে সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা, তারা সাহসী সংস্কার ও ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে।
অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো এম হেলাল আহমেদ জনি শেয়ার বিজকে বলেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে এর নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে পুনর্গঠন করে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দক্ষ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন। যাতে পুরোনো অনিয়ম ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ হয়। সেইসঙ্গে শুধু পুঁজিবাজার নয়, দেশের সব আর্থিক সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালীকরণ করতে হবে। ইতোপূর্বে যারা মার্কেটে কারসাজি করেছে বা বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নিতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।
তিনি বলেন, এছাড়া পুঁজিবাজারে ঘন ঘন নীতি-পরিবর্তন হলে বিনিয়োগকারীদের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়। তাই নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি। সর্বোপরি সরকারকে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, আমরা প্রতিষ্ঠানসমূহে রাজনৈতিক বা পেশিশক্তি দিয়ে কোনো হস্তক্ষেপ করব না। প্রতিষ্ঠান তার স্ব-স্ব বিধিবিধানের আলোকে পরিচালিত হবে। তাহলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো সম্ভব হতে পারে।
পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্বাচনের পর বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট কাটতেই বাজারে গতি সঞ্চার হয়েছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের ওপর বিনিয়োগকারীরা জোরালো আস্থা রেখেছেন। তবে বাজারের এই ইতিবাচক গতি ধরে রাখা শেষ পর্যন্ত সামষ্টিক অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলোর উন্নতির ওপর নির্ভর করবে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post