মনিরুল হক: উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলছে প্রথম থেকেই। মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কায়দায় টার্গেট অডিয়েন্সকে নিয়ে করছে বিনিয়োগবিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা বা সেমিনার। জাঁকজমক আয়োজন দেখে অনেকেই সরল বিশ্বাসে বিনিয়োগ করছেন বড় অঙ্কের অর্থ। এভাবে গত ৫-৬ বছরে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মূল প্রতিষ্ঠান প্রমিস গ্রুপ। যার মোট সম্পদের পরিমাণ বর্তমানে এক হাজার কোটি টাকা বলে দাবি করছেন এর উদ্যোক্তারা।
২০১৯ সালে যাত্রা শুরু করে নগদহাট বাংলাদেশ লি. নামে। সম্প্রতি কিছুটা জটিলতা দেখা দেয়ায় নাম বদলে করা হয়েছে প্রমিস মার্ট লি.। তবে স্বভাব আগের মতোই রয়েছে।
প্রমিস গ্রুপের এই অঙ্গ প্রতিষ্ঠানটি ই-কমার্স ব্যবসার কথা বলে গ্রাহকদের তাদের অফিসে ডেকে নেয়। সেখানে তাদের কাছে চীন থেকে আমদানি করা পণ্য পাইকারি দরে কিনে নিজেদের দোকানে বিক্রি করার পরামর্শ দেয়া হয়। একই সঙ্গে বলা হয়, যদি আপনি নিজে বিক্রি করতে না পারেন, এটা যদি ঝামেলা মনে করেন, তাহলে প্রমিজ মার্টকে বিক্রি করার দায়িত্ব দিতে পারেন। তবে ওই পণ্য বিক্রির জন্য ৩৬ মাস সময় দিতে হবে। বিক্রয়লব্ধ মুনাফা থেকে কিস্তি দেয়া শুরু হবে প্রথম মাস থেকেই। সেখান থেকে ১০ শতাংশ সার্ভিস চার্জ কেটে রাখবে প্রমিজ মার্ট।
বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার করে বলা যাক। সম্প্রতি প্রমিস মার্টের পরিচিতিবিষয়ক একটি প্রেজেন্টেশনে প্রমিস মার্টের ব্র্যান্ড প্রোমোটার নাহিদা ফারহানাকে দেখা যায় একটি অনুষ্ঠানে তাদের ব্যবসা সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছেন। সেখানে তিনি বলছেন, প্রমিস মার্ট চীন থেকে পণ্য আমদানি করে। সেই পণ্য পাইকারি কিনে বিক্রি করার সুযোগ আছে। আবার কেউ চাইলে তাদের মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট পণ্য আমদানি করতে পারবে। এছাড়া ‘প্যাসিভ সেলিং পার্টনার’ হিসেবে বিটুবিতে তাদের কাছ থেকে পণ্য কিনে ব্যবসা করা যাবে। এতে তারা খুচরা মূল্যের ১০ লাখ টাকার পণ্য ৫০ শতাংশ ডিসকাউন্টে ৫ লাখ টাকায় বিক্রি করবেন। এই ৫ লাখ টাকার বিপরীতে প্রমিস মার্ট ৩৬ মাস ধরে গ্রাহককে মোট ৯ লাখ টাকা ফেরত দেবে। অর্থাৎ ৩ বছরে ৪ লাখ টাকা মুনাফা পাবে বিনিয়োগকারী; যা এমএলএম ব্যবসার ধরনের সঙ্গে মিলে যায় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, নগদহাট সম্পর্কে অনেক আগে থেকেই অভিযোগ ছিল। প্রমিস মার্টও একই ধাঁচের প্রচারণা চালিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে। এই কায়দায় ব্যবসা করে প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
জানা গেছে, আরজেএসসিতে নিবন্ধিত প্রমিস মার্ট ই-কমার্সের আড়ালে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে। সম্প্রতি কল্যাণপুরে তাদের অফিসে সরেজমিন ঘুরে, সেখানে উপস্থিত লোকজনদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া যায়।
প্রতিষ্ঠানটির প্রলোভনে পড়ে টাকা দিয়েছেন এমন অনেকেই শেয়ার বিজকে বলেন, কল্যাণপুরে ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিংয়ের পুরো অফিসে প্রমিস গ্রুপের কার্যক্রম দেখিয়ে চলে আইওয়াশ। তৃতীয় তলা থেকে সপ্তম তলা পর্যন্ত পুরোটায় চলে বিভিন্ন কার্যক্রম। এর মধ্যে ফ্রিল্যান্সিং, কোরিয়ান এবং জাপানি ভাষা শিক্ষা, সেলাই প্রশিক্ষণ, ছেলেমেয়েদের আবাসিক ব্যবস্থা, প্রমিস মার্ট শপ প্রভৃতি ধরনের ব্যবসা রয়েছে; যা দেখলে যে কেউ তাদের কথায় মজে গিয়ে বিনিয়োগ করবে।
সম্প্রতি প্রমিস মার্টের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে পারেন পান্থপথের বাসিন্দা নৃপেন চৌধুরী। তিনি এক সময় ব্যবসা করতেন। বর্তমানে অবসর জীবনযাপন করছেন। তাকে বৃদ্ধ বয়সে কিছু আয়ের জন্য তার এক পরিচিত ব্যক্তি সেখানে নিয়ে যান।
তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, এত দেখি এলাহী কাণ্ড। পুরো বিল্ডিংজুড়ে নানা ব্যবসা-বাণিজ্য। বিনিয়োগের জন্য প্রতি সপ্তাহে তিন দিন প্রোগ্রাম করা হয়। এই প্রোগ্রামে বিভিন্ন রকম লাভজনক স্কিম দেখানো হয়। ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিংসহ বিভিন্ন সরকারি প্রজেক্ট দেখিয়ে বিশ্বস্ততা অর্জন করা হয়। প্রোগ্রামে বলা হয়, এক লাখ টাকা বিনিয়োগে তিন বছরে টোটাল ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ফেরত দেয়া হবে। এখানে বিনিয়োগকারী চাইলে নির্দিষ্ট মূল্যের পণ্য ক্রয় করে নিজে বিক্রয় বা ভোগ করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে কোনো লভ্যাংশ দেয়া হবে না। লভ্যাংশ নিতে হলে ৩৬ মাসের চুক্তিবদ্ধ হতে হবে। আর সর্বনিম্ন ১০ হজার থেকে শুরু করে আনলিমিটেড বিনিয়োগ করা যাবে এবং বিনিয়োগের পরবর্তী মাসের ১০ তারিখ থেকে লভ্যাংশ দেয়া হবে। কেউ যদি ১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে, সে প্রতি মাসে আসল এবং লভ্যাংশ মিলে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা পাবে। এভাবে ৩৬ মাসে ১ লাখে মোট ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ফেরত পাবে।
তিনি আরও বলেন, কেউ বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করলে শুরু হয় মগজ ধোলাই। অর্থাৎ তাকে এমএলএম সিস্টেমে বিনিয়োগের ফাঁদে ফেলা হয়। শুরু হয় কোটিপতি বানানোর খেলা। নানা কায়দায় মাথায় ঢোকানো হয়, প্রমিস মার্টে প্রতি সপ্তাহে তিন লাখ টাকা বেতন পাওয়া সম্ভব। এছাড়া বিনিয়োগকৃত অর্থ মাত্র এক বছরেই দ্বিগুণ করা সম্ভব। এই কায়দায় বিনিয়োগ করতে হলে সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। এরপর কাউকে বিনিয়োগ করাতে পারলে তার বিনিয়োগকৃত অর্থ থেকে তিন শতাংশ অর্থ প্রথম বিনিয়োগকারী পাবেন। এরপর দ্বিতীয় বিনিয়োগকারী যদি কাউকে বিনিয়োগ করাতে পারেন তাহলে দ্বিতীয় বিনিয়োগকারী পাবেন ৩ শতাংশ এবং প্রথম বিনিয়োগকারী পাবেন ১ শতাংশ। এভাবে যত বিনিয়োগ বাড়বে তত র্যাঙ্ক বাড়বে। সর্বনিম্ন র্যাঙ্ক এক্সিকিউটিভ হতে হলে অন্তত পাঁচ লাখ টাকা বিনিয়োগ করাতে হবে। এরপর ১৫ লাখ বিনিয়োগ করাতে পারলে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ। এরপর ৪০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করাতে পারলে এরিয়া ম্যানেজার। এভাবে ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর হওয়া সম্ভব। একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টরের বেতন প্রতি সপ্তাহে ৩ লাখ টাকা। প্রতি মাসের ১, ৮, ১৫ এবং ২২ তারিখে বেতন অ্যাকাউন্টে যোগ করে দেবে প্রমিস মার্ট। বিকাশ বা ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করা যাবে।
প্রমিস মার্টের বিনিয়োগ কার্যক্রম ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পরিচালনা করা হয়। এখানে রেজিস্ট্রেশন করালে একটি ড্যাশবোর্ড দেখা যাবে। যেখান থেকে বিনিয়োগকারীর অ্যাকাউন্টে কত টাকা আছে দেখা যাবে এবং টাকা উত্তোলনের আবেদন করতে হবে।
জানা গেছে, প্রমিস গ্রুপের প্রমিস মার্টের পাশাপাশি প্রমিস অ্যাসেট লিমিটেডসহ মোট ১৫টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, পাইকারি হাট, ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লি., প্রমিস আইটি সলিউশন, ক্লিক দ্য ফটো, প্রমিস মিডিয়া, প্রমিস ফুটওয়্যার লি., মেগা স্টার। দুটি পত্রিকাও আছে। একটি আজকের দৈনিক, আরেকটি দৈনিক বার্তা।
প্রমিস মার্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইস্রাফিল মোল্লা। তিনি ছাড়াও এই কোম্পানির আরও কয়েকজন অংশীদার রয়েছেন। তিনি জানান, নগদহাট আরজেএসসির প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বন্ধ করা হয়েছে। তাছাড়া ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সদস্যপদ বাতিলের জন্যও আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেয়া হয়েছে।
ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১-এর ধারা ৩.১.৩-এ স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, ‘ডিজিটাল কমার্স বা ই-কমার্সের মাধ্যমে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) বা নেটওয়ার্ক ব্যবসা পরিচালনা করা যাবে না।’
এছাড়া ৩.১.১০ ধারায় উল্লেখ রয়েছে, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ব্যতিরেকে ডিজিটাল মাধ্যমে কোনো ধরনের অর্থ ব্যবসা পরিচালনা করা যাবে না।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মেজবাউল হক শেয়ার বিজকে বলেন, ইভ্যালির ঘটনার পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যখন ই-কমার্স খাতের জন্য নীতিমালা তৈরি করে, তখন আমরাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিষয়টির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। নীতিমালা অনুযায়ী, উচ্চ মুনাফার প্রলোভনে পণ্য ও সেবা বিক্রির বিষয়টিও নিষেধ করা আছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র বলেন, প্রমিস মার্টের কার্যক্রম দেখে নেটওয়ার্কিং ব্যবসাই মনে হচ্ছে। এটা ঝুঁকিপূর্ণ বলেই নীতিমালায় এ ধরনের ব্যবসা নিষেধ করা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল কমার্স সেলের উপসচিব মুহাম্মদ সাঈদ আলী বলেন, ডিজিটাল কমার্স নির্দেশিকা অনুযায়ী মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বা নেটওয়ার্কিং ব্যবসা পরিচালনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
ই-ক্যাবের সহায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন এমন এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অতীতে ডেসটিনি ২০০০ লি. বা ইভ্যালির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহক বা ক্রেতা ভজাতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের লোকদের সঙ্গে ছবি তুলে তা প্রচারের কাজে লাগাতেন। এটা খুবই কমন চর্চা মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বা নেটওয়ার্কিং ব্যবসায়।
গত ২৬ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদারের সঙ্গে তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে দেখা করতে যায় ইস্রাফিল মোল্লাসহ একটি প্রতিনিধি দল।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post