রামিসা রহমান : অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক গত ১৮ মাসে তলানিতে পৌঁছেছে। শত চেষ্টা করেও সম্পর্ক ঠিক হয়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। নতুন সরকারের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক ঠিক হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষরা। তাদের মতে, বিএনপির এই জয়ে দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলবে।
বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শোক বার্তা নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন তার সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। এ সময় তারেক রহমানের সঙ্গে এক বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল বাংলদেশ জামায়াতে ইসলামী। গত বছরের শেষের দিকে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইসলামপন্থি এই দলটির ছাত্র সংগঠন বড় ধরনের জয় পায়; যা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উত্থানের ইঙ্গিত দেয়। তখন দিল্লির কৌশলগত মহলে নিদ্রাহীন রাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির জয়লাভ করার পর শশী থারুর নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘এটি হয়তো অধিকাংশ ভারতীয়ের মনে তেমন কোনো আলোড়ন সৃষ্টি করেনি, তবে ভবিষ্যতের জন্য এটি একটি উদ্বেগজনক ইঙ্গিত।’
জামায়াত-নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটকে অনেক পেছনে ফেলে বিএনপি যখন বিজয়ের দিকে এগিয়ে যান, তখন ভারতের অনেকে এটিকে সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি সুযোগ হিসেবে দেখতে পান।
জামায়াতে ইসলামীর উত্থানে দিল্লির উদ্বিগ্ন হওয়ার একাধিক কারণ ছিল। প্রথমত ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে জামায়াত পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিল। পাশাপাশি ইসলামপন্থি এই দলটি শরিয়াহ আইন বাস্তবায়নের পক্ষেও কথা বলেছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে বক্তব্য দিতে গিয়ে জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের হুঁশিয়ারি দেন, ভারত যদি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘হস্তক্ষেপ করার সাহস দেখায়’, তবে পঞ্চাশ লাখ বাংলাদেশি তরুণকে নিয়ে ‘পবিত্র যুদ্ধ’ ঘোষণা করা হবে।
দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের অবনতির প্রধান কারণ ছিল তাদের ভাষায় ভারতের নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের উগ্রবাদের উত্থান রোধে অক্ষমতা। অথবা এতে তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। সরকারের এই সীমাবদ্ধতায় শুধু বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, বরং এর প্রভাব ভারতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল বলেও ভারত মনে করে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, জামায়াতে ইসলামীর নেতারা দেশের শীর্ষ কওমি আলেমদের সঙ্গে একটি বৈঠক করেছে। বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে ইসলামী বিধানভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ইসলামপন্থি শক্তির ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির মুফতি আবু জাফর কাসেমি বলেন, ‘আমাদের অতীতের সব মতপার্থক্য ভুলে যেতে হবে এবং কোনো রাজনৈতিক দলকে সুযোগ দেওয়া যাবে না।’
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি দ্য প্রিন্টকে বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পেছনের ঘটনাপ্রবাহে জামায়াতে ইসলামী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ইউনূস সরকারের ওপর জামায়াত উল্লেখযোগ্য প্রভাব বজায় রেখেছিল, যা সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হয়েছে।
দিল্লির উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছিল মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে জামায়াতের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা। ২০২৬ সালের ২৪ জানুয়ারির এক প্রতিবেদনে ইকোনমিক টাইমস লিখেছিল, নির্বাচনের আগে উগ্র ইসলামপন্থি দলটিকে কাছে টানার মার্কিন প্রচেষ্টা কূটনৈতিক মহল ও বাংলাদেশ-বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভ্রƒকুটি সৃষ্টি করেছে।
এর আগে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ঢাকায় অবস্থানরত এক মার্কিন কূটনীতিকের অডিও রেকর্ডিং সংগ্রহ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে তিনি বর্ণনা করেছিলেন কীভাবে ওয়াশিংটন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চায়।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব তীব্রভাবে বেড়ে যায়। ভারত হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে-এই বিষয়টি বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ভালোভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। হাসিনার শাসনামলে দুই দেশ ঘনিষ্ঠ কৌশলগত মিত্র ছিল। তবে তার অপসারণের পর দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটে।
পরিস্থিতি রাতারাতি বদলাবে না। ২০০১-০৬ সময়কালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের জোটসঙ্গী ছিল জামায়াত। তখন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সবচেয়ে খারাপ সময়গুলোর একটি অতিক্রম করে।
এখন বিএনপি ক্ষমতায় আসায় এবং জামায়াতের পরাজয়ের পর ভারত ও বাংলাদেশ নতুনভাবে শুরু করার আশা করতে পারে।
এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, নতুন সরকারের উচিত বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিক সম্মানভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখা। কারণ দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা রয়েছে, যা উভয় দেশের উন্নয়ন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি ও সীমান্ত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় থাকলে তা দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে। তাই বাস্তবতা ও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় রেখে সুসমন্বিত ও ইতিবাচক কূটনৈতিক সম্পর্ক ধরে রাখতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post