নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি : আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশের অর্থনীতিতে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় পুঁজিবাজার ও অন্যান্য বিনিয়োগ ক্ষেত্র থেকে ধীরে ধীরে টাকা তুলে নিচ্ছেন অনেক বিনিয়োগকারী। বাজারে এখন আস্থার চেয়ে অনাস্থার প্রভাবই বেশি দেখা যাচ্ছে।
বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় এলে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তুলনামূলকভাবে কমবে। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় ও প্রধান দুই দলের একটি হিসেবে বিএনপির সঙ্গে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার একটি পরিচিত সম্পর্ক রয়েছে। ফলে বিএনপি সরকার গঠন করলে কিছুটা হলেও স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে। আর এর ব্যতিক্রম হলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে তা নিয়ে ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।
এদিকে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে গতকাল রোববার প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) দাম বাড়ার ক্ষেত্রে দাপট দেখিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বস্ত্র খাতের কোম্পানিগুলো। তবে অন্য খাতের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের দরপতন হয়েছে। এতে মূল্যসূচকের পতন হয়েছে। একই সঙ্গে কমেছে লেনদেনের পরিমাণ।
দিনের লেনদেন শেষে ডিএসইতে সব খাত মিলে দর বাড়ার তালিকায় নাম লিখিয়েছে ১৬২টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট। বিপরীতে দাম কমেছে ১৬২টির। আর ৬৯টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে।
অন্যদিকে তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১৯টির শেয়ার দাম বেড়েছে। বিপরীতে ৩টির দাম কমেছে এবং ১টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। আর বস্ত্র কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৩০টির শেয়ারদর বেড়েছে এবং ১১টির দর কমেছে। বাকি ১৭টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে।
অধিকাংশ বস্ত্র ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বাড়ার দিনে ভালো কোম্পানি বা ১০ শতাংশ অথবা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৭৯টির শেয়ার দাম বেড়েছে। বিপরীতে ৯৪টির দাম কমেছে এবং ৩৪টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। মাঝারি মানের বা ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেওয়া ২৭টি কোম্পানির শেয়ারদর বাড়ার বিপরীতে ৩৯টির দাম কমেছে এবং ১৩টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণে ‘জেড’ গ্রুপে স্থান হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৫৬টির শেয়ারদর বেড়েছে। বিপরীতে দর কমেছে ২৯টির এবং ২১টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। আর তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মধ্যে ৮টির দর বেড়েছে। বিপরীতে ১৫টির দর কমেছে এবং ১১টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
এতে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৫ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ২২৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্য দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৬ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৬৫ পয়েন্টে অবস্থান করছে। আর বাছাই করা ভালো ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক আগের দিনের তুলনায় ৩ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৯৯৮ পয়েন্টে নেমেছে।
সবকটি মূল্যসূচক কমার পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও কমেছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ৪৭৮ কোটি ৫৩ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৫৮৭ কোটি ৪১ টাকা। এ হিসাবে আগের কার্যদিবসের তুলনায় লেনদেন কমেছে ১০৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
এই লেনদেনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজের শেয়ার। কোম্পানিটির ২২ কোটি ৯৪ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার লেনদেন হয়েছে ১৮ কোটি ১৯ লাখ টাকার। ১৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে কে অ্যান্ড কিউ।
এছাড়া ডিএসইতে লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছেÑইসলামী ব্যাংক, মুন্নু ফেব্রিক্স, লাভেলো আইসক্রিম, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং, ব্র্যাক ব্যাংক, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স এবং প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, অনিশ্চয়তার কারণে পুঁজিবাজারে লেনদেন কমে গেছে। অনেক বিনিয়োগকারী ঝুঁকি এড়াতে শেয়ার বিক্রি করে নগদ অর্থ ধরে রাখছেন বা নিরাপদ খাতে চলে যাচ্ছেন। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও অপেক্ষাÑদেখি নীতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনেকের ধারণা, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠন করলে বিএনপি ও আওয়ামী লীগÑএই দুই বড় দলই বিরোধিতায় নেমে পড়বে, যা আবারও রাজপথে সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ পরিবেশ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে।
একজন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা রাজনীতি বুঝি না, কিন্তু স্থিতিশীলতা চাই। বিএনপি ক্ষমতায় এলে অন্তত পরিচিত রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই দেশ চলবে। কিন্তু নতুন বা বিতর্কিত কোনো শক্তি ক্ষমতায় এলে দুই বড় দলই রাস্তায় নামবে-এটাই আমাদের ভয়।’
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ শেয়ার বিজকে বলেন, । তবে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিষ্কার হলে ধীরে ধীরে আস্থা ফিরে আসে এবং বাজার আবার স্বাভাবিক ধারায় ফিরে যায়। এই প্রবণতা শুধু বাংলাদেশের নয়, এটি বিশ্বব্যাপী একটি সাধারণ বাস্তবতা।
তিনি আরও বলেন, তবে নির্বাচন শেষ হলে ও নতুন সরকারের নীতির দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হলে অর্থনীতি ও বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক আস্থার সংকট থাকলে বিনিয়োগ প্রবাহ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। বিনিয়োগকারীরা মূলত দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, নীতিগত ধারাবাহিকতাও সহিংসতামুক্ত পরিবেশ চান। এই তিনটি বিষয়ের নিশ্চয়তা না পেলে বাজার থেকে অর্থ তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়তেই থাকে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আস্থা ও অনাস্থার টানাপোড়েনে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ এখন বেশ সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের বড় অংশই মনে করছেন, আগামী সরকারের ধরনই নির্ধারণ করবে বাজারে আস্থা ফিরবে নাকি অনিশ্চয়তা আরও গভীর হবে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post