নয়ন তারা : স্বচ্ছ রাজনৈতিক চর্চার অন্যতম প্রতীক হলো ‘নির্বাচন’। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই গণতন্ত্রের প্রাণস্পন্দন। জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন এদেশের প্রান্তিক সাধারণ মানুষের চিরন্তন চাহিদা, যা দীর্ঘদিন ধরে বহু প্রত্যাশার অপর নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ষোড়শতম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন, ‘নির্বাচন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে জনগণের ইচ্ছার প্রকাশ ঘটে।’ আজ তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পর ইতিহাসের নজির হিসেবে দীর্ঘ ৩৬ বছর পর আগামী ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচন।
এই নির্বাচন শুধু একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠনের এক মহামঞ্চ। বিশ্ববিদ্যালয় হলো সেই জায়গা, যেখানে একদিকে চিন্তার স্বাধীনতা বিকশিত হয়, অন্যদিকে নাগরিক দায়িত্ববোধের ভিত্তি গড়ে ওঠে। তাই ছাত্র সংসদ নির্বাচন মানে শুধু পদ-পদবির প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটা হয়ে উঠতে পারে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশের এক অনন্য সুযোগ। প্রতিনিধিরা হয়ে উঠুক শিক্ষার্থীদের প্রকৃত কণ্ঠস্বর—এটাই সময়ের দাবি।
বহু প্রতীক্ষিত এই নির্বাচনের প্রাক্কালে ক্যাম্পাসে সৃষ্টি হয়েছে এক মিশ্র আবহ। কেউ উচ্ছ্বসিত, কেউ আবার সংশয়গ্রস্ত। তবে গণতন্ত্রের মূল মন্ত্র হলো সাম্য, স্বাধীনতা ও ভ্রাতৃত্ব। এই তিনটি মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিটি নির্বাচনে। শিক্ষার্থীরা যদি শৃঙ্খলা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও যুক্তিবোধের চর্চা করে, তবে তার প্রভাব পড়বে দেশের রাজনীতিতেও। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই রাষ্ট্রের অন্যতম সম্ভাবনাময় সম্পদ।
গণতন্ত্রের চর্চা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে শুরু হবে, তখন দেশের রাজনীতি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। প্রাথমিকভাবে দেখা যাবে নেতৃত্বের নতুন প্রজন্ম, যারা মতাদর্শে দৃঢ়, নীতিতে অবিচল এবং সত্যিকারের জনগণের প্রতিনিধি হয়ে উঠতে পারবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চিন্তা, মনন, আচার-আচরণ ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন। তারা কেবল ডিগ্রিধারী নাগরিক নয়, বরং সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক হয়ে উঠবে, যা রাষ্ট্র, সমাজ ও জাতির জন্য বয়ে আনবে ‘চির উন্নত মম শির’।
শিক্ষার্থীরাই হচ্ছে জাতির কারিগর। তারা যখন নিজেদের অধিকারের জন্য সংগঠিতভাবে দাঁড়াবে, তখনই পরিবর্তনের সূচনা ঘটবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে ছাত্রসমাজের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। কিন্তু আজ সেই ছাত্রসমাজের অনেকাংশেই বিভক্ত, ক্লান্ত, অনুপ্রেরণাহীন। এই বাস্তবতাকে বদলাতে হলে নতুন নেতৃত্বের উত্থান দরকার—এমন নেতৃত্ব, যারা ক্ষমতার জন্য নয়, আদর্শের জন্য রাজনীতি করবে।
সমাজে বৈষম্য, শোষণ ও দুর্নীতি অনেক আগেই কমে যেত, যদি ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষ সময়মতো জেগে উঠত। অধিকার আদায়ে উদাসীন জাতি কখনোই মর্যাদার আসনে পৌঁছাতে পারে না। তাই এবার আওয়াজ উঠুক অন্যায়ের বিরুদ্ধে, বঞ্চনার বিরুদ্ধে এবং শোষণের বিরুদ্ধে। বিশ্ববিদ্যালয় হোক সেই মঞ্চ, যেখানে ত্যাগ, আদর্শ, সংগ্রাম ও সত্যের জয়গান গাওয়া হয়।
সত্যিকারের রাজনীতি মানেই মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের কষ্টে সান্ত্বনা দেয়া এবং তাদের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব নেয়া। রাজনীতি কখনও ক্ষমতা অর্জনের প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আজকের বাস্তবতায় রাজনীতি অনেক সময়েই ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থসিদ্ধির উপকরণে পরিণত হয়েছে। এই প্রবণতাকে রুখতে হবে তরুণ প্রজন্মকেই। তাদের মধ্য থেকে উঠে আসুক সেইসব ব্যক্তিত্বসম্পন্ন তরুণ, যারা জনগণের জন্য কাজ করবে, যারা কেবল বক্তৃতায় নয়, বাস্তব কাজের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করবে তাদের নেতৃত্বের যোগ্যতা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যদি নিজেদের ক্যাম্পাসের সমস্যা সমাধানে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে, তবে এটি হবে বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে নতুন যুগের সূচনা। আবাসন সংকট, যাতায়াতের দুর্ভোগ, নিরাপত্তা সমস্যা, ক্যাফেটেরিয়ার মানহীন খাবার, একাডেমিক অনিয়ম প্রভৃতি বিষয়ে যদি নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কার্যকর উদ্যোগ নেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের আস্থা ফিরে আসবে। ছাত্রসংসদ তখন কেবল নির্বাচনী আমেজে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং হয়ে উঠবে বাস্তবিক পরিবর্তনের চালিকাশক্তি।
শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি যদি সত্যিকারের অর্থে ‘ছাত্রদের কণ্ঠস্বর’ হয়ে ওঠে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞানার্জনের জায়গা থাকবে না। এটি হয়ে উঠবে নেতৃত্ব গঠনের কারিগর। এখান থেকেই জন্ম নেবে আগামী দিনের সৎ, যোগ্য ও মানবিক নেতৃত্ব, যারা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে উন্নয়ন, শান্তি ও সমপ্রীতির পথে।
অতএব, আমাদের প্রত্যাশা—চাকসুর এই নির্বাচন কেবল একটি ভোটপ্রক্রিয়া নয়, বরং এটি হোক একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ। প্রার্থীরা যেন ব্যক্তিস্বার্থ নয়, শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। তারা যেন ‘ক্ষমতার আসনে নয়, দায়িত্বের আসনে’ বসে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করে।
নতুন প্রজন্মের হাতে যদি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা গড়ে ওঠে, তবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি হবে আরও আলোকিত, আরও মানবিক। আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়ে উঠুক নেতৃত্ব গঠনের কারিগর, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী বুঝবে রাজনীতি মানে মানবসেবা, ন্যায়প্রতিষ্ঠা এবং সত্যের পক্ষে অবস্থান নেয়া।
নবযাত্রার এই প্রভাতে আমাদের কামনা—চাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে এমন এক প্রজন্মের উত্থান ঘটুক, যারা আদর্শে দৃঢ়, কর্মে সাহসী এবং দেশপ্রেমে আপসহীন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি কণ্ঠস্বর হোক পরিবর্তনের প্রতিধ্বনি, প্রতিটি শিক্ষার্থী হোক জাতির আশার প্রদীপ। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অটুট থাকুক নতুন বাংলাদেশের প্রতিটি অধ্যায়ে। শুধু স্বপ্নে নয়, বাস্তবতায় ফিরে আসুক শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিক নেতৃত্বের দীপ্তি।
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post