প্রতিনিধি, রংপুর: একসময় বাংলাদেশে আঙুর চাষ ছিল অনেকটা কল্পনার মতো। দেশের আবহাওয়া ও মাটিতে এ ফল ফলানো কঠিন বলেই ধারণা ছিল সবার। তবে সেই ধারণাকে বদলে দিয়ে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় গড়ে উঠছে একের পর এক আঙুরের বাগান। উদ্যমী কৃষকদের হাত ধরে এখন এখানে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষের সম্ভাবনা জোরালো হয়ে উঠেছে। ফলে বদলে যাচ্ছে অর্থনীতির চিত্র। আঙুরসহ ব্যতিক্রমী ফসল চাষাবাদ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন এই অঞ্চলের কৃষক। দেখা গেছে, উপজেলার ভেন্ডাবাড়ী, খেজমতপুর, রামনাথপুর, মিলনপুরসহ কয়েকটি গ্রামে প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয় আঙুর চাষ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই উদ্যোগই এখন বাণিজ্যিক রূপ নিতে শুরু করেছে।
স্থানীয় কৃষক তহিদুল ইসলাম এ পরিবর্তনের অন্যতম উদাহরণ। কয়েক বছর আগে ইউটিউব ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শ নিয়ে ছোট পরিসরে আঙুর চাষ শুরু করেন তিনি। শুরুতে নানা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও ধৈর্য, শ্রম ও সঠিক পরিচর্যায় এখন তিনি সফল। তার বাগানে এখন দেশি-বিদেশি নানা জাতের আঙুর ঝুলছে থোকায় থোকায়। স্থানীয় বাজারে এসব আঙুর বিক্রি হচ্ছে ভালো দামে।
তহিদুল বলেন, ‘প্রথমে অনেকে হাসাহাসি করেছিল। এখন আমার বাগান দেখে অনেকেই আঙুর চাষে আগ্রহী হচ্ছে। আমাদের এলাকার মাটিতেও আঙুর চাষ সম্ভব—এটা প্রমাণ করতে পেরে ভালো লাগছে।’
শুধু তহিদুল নন, তার দেখাদেখি আরও অনেক কৃষক আঙুর চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। কৃষক মাসুদ তালুকদার জানান, তার বাগানেও প্রচুর আঙুর ধরেছে। স্বাদে মিষ্টি হওয়ায় বাজারে এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। তিনি মনে করেন, পরিকল্পিতভাবে আঙুর চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে ভবিষ্যতে বিদেশেও রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি হবে।
স্থানীয় বাজারে পীরগঞ্জের আঙুর ইতোমধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিদেশি আঙুরের তুলনায় তাজা ও তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় ক্রেতাদের
উপজেলার ভেন্ডাবাড়ী, খেজমতপুর, রামনাথপুর, মিলনপুরসহ কয়েকটি গ্রামে আঙুর চাষ এখন বাণিজ্যিক রূপ নিতে শুরু করেছে।
আগ্রহও বেশি। ফলে কৃষকরাও সরাসরি লাভবান হচ্ছে। কৃষকদের দাবি, প্রতি বিঘা জমিতে আঙুর চাষ করে ধানের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি আয় করা সম্ভব।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জও। অতিরিক্ত বৃষ্টি, রোগবালাই ও বাজারজাতকরণের সমস্যা কৃষকদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। এছাড়া মানসম্মত চারা ও আধুনিক প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবও একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সুমন আহমেদ বলেন, ‘আঙুর একটি উচ্চমূল্যের ফল। আমরা চাই কৃষকরা নতুন নতুন ফসল চাষে এগিয়ে আসুক। পীরগঞ্জে আঙুর চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও জানান, বড় পরিসরে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ সম্প্রসারিত হলে এটি শুধু কৃষকদের আয়ের পথই খুলবে না, বরং স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এদিকে রাজবাড়ীর প্রকৌশলী ফারদিন আহমেদ নিজের ৫০ শতাংশ জমিতে করেছেন আঙুর বাগান। কম্পিউটার সায়েন্সে পড়াশোনা করেছেন এই যুবক। প্রকৌশল বিষয়ে শিক্ষকতা ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি আঙুর চাষেও সফল হয়েছেন। নিজ গ্রামে প্রায় ৫০ শতাংশ জমিতে আঙুর চাষ শুরু করেছেন। তার বাগানে রয়েছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের আঙুর। সাফল্য পাওয়ায় তিনি আরও দেড় একর (১৫০ শতাংশ) জমিতে আঙুর চাষের উদ্যোগ নিয়েছেন।
রাজবাড়ী গোয়ালন্দ উপজেলার কুটি পাচুরিয়া গ্রামে
ফারদিন আহমেদের বাড়ি। তিনি জানান, আধুনিক পদ্ধতিতে আঙুর চাষের পাশাপাশি তিনি গবেষণা ও করছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘গ্রেপ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাগ্রো অ্যান্ড রিসার্চ’। ফল বিক্রির পাশাপাশি কাটিং, কলম ও চারা বিক্রির মাধ্যমে তিনি লাভবান হয়েছেন।
প্রথমে শখ করে বাড়ির উঠানে একটি আঙুর গাছ রোপণ করেছিলেন ফারদিন। প্রথম ফলন খাওয়ার উপযোগী না হলেও ইউটিউব দেখে আঙুর চাষে আগ্রহী হন। পরে তিনি বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষের সিদ্ধান্ত নেন এবং ২০২৫ সালের মে মাসের শেষে বাবার ৫০ শতাংশ জমিতে বাগান শুরু করেন । তিনি বিভিন্ন স্থান থেকে দেশি-বিদেশি ২০৪ জাতের প্রায় ৪৮০টি গাছ সংগ্রহ করে রোপণ করেন।
ফারদিন জানান, বাগানে ২০৪ জাতের ৪৮০টির বেশি গাছ সংগ্রহ করেছেন, যার অধিকাংশেই ফলন এসেছে। কিছু জাত বীজবিহীন। সর্বনিম্ন ১৫০ টাকা থেকে শুরু করে ১৩ হাজার টাকা মূল্যের চারা আছে । বাগানে প্রায় ১৩ হাজার চারা উৎপাদন করা হয়েছে, ইতোমধ্যে প্রায় ৪ লাখ টাকার চারা বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে বাগানে প্রায় দুই-তিন লাখ টাকার আঙুর রয়েছে। মোট বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ১৩ লাখ টাকা, যার বড় অংশ প্রথম বছরেই উঠে আসবে বলে আশা করছেন তিনি।
গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ রায়হানুল হায়দার বলেন, তরুণ উদ্যোক্তা ফারদিন আহমেদ কেমিক্যাল ছাড়াই উচ্চফলনশীল আঙুর চাষ করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন । তিনি বিভিন্ন জাত নিয়ে কাজ করছেন, যা সম্ভাবনাময়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তাকে কারিগরি সহায়তা দেওয়া হবে।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post