পুঁজিবাজার ঢেলে সাজাতে সরকারের নানা উদ্যোগ
নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি
দেশের পুঁজিবাজার নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আর এ লক্ষ্যে পুঁজিবাজারে সঠিক তদারকি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, তালিকাভুক্ত কোম্পানির স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং বিদেশি ফান্ড ম্যানেজারদের আস্থা অর্জনে মরিয়া কর্তৃপক্ষ। এ উদ্দেশ্যে গত ৩০ এপ্রিল বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সংশোধন) আইন জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে। সংসদে বিলটি উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থনের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনেও (বিএসইসি) নতুন নেতৃত্ব আসে । খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন কমিশন ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণ করে। দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজারে কারসাজি নিয়ন্ত্রণে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো সম্ভব হয়নি ।
নতুন কমিশনের সময়ে বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি জরিমানা করা হয়েছে, তবে আদায় হয়েছে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। একই সঙ্গে বাজারে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। মূলধন
সংগ্রহের অন্যতম মাধ্যম হওয়া সত্ত্বেও গত প্রায় দুই বছরে পুঁজিবাজারে আসেনি কোনো নতুন আইপিও, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট ডিএসইএক্স সূচক ছিল ৫,৭৭৮ পয়েন্ট। সর্বশেষ ২৭ এপ্রিল লেনদেন শেষে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ৫,৩০০ পয়েন্টে। অর্থাৎ প্রায় ২০ মাসে সূচক কমেছে ৪৭৮ পয়েন্ট বা ৮ দশমিক ২৭ শতাংশ, যা বাজারে আস্থার সংকটকে আরও বাড়িয়েছে।
এ সময়ে ভালো মৌলভিত্তির কোনো নতুন কোম্পানিও তালিকাভুক্ত হয়নি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের সংস্কারের প্রত্যাশা করলেও সূচক ও লেনদেনের প্রবণতা সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি।
যদিও কমিশন নতুন বিধিমালা প্রণয়ন, সংস্কার টাস্কফোর্স গঠন এবং তদন্ত কার্যক্রম জোরদারসহ কিছু কাঠামোগত উদ্যোগ নিয়েছে, তবুও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় করতে প্রত্যাশিত সাফল্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতা ও অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি।
যদিও বিনিয়োগকারীদের একাংশের মতে, নির্বাচিত সরকার এলে দেশের পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে। তার পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি ক্ষমতা আসার পর বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেয়। ইতোমধ্যে বিএনপি পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ব্যাপক সংস্কার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বোর্ডে দক্ষ ও সৎ ব্যক্তি নিয়োগ এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের অঙ্গীকার করেছে। ২০২৬ সালের পরিকল্পনা অনুযায়ী,
তাদের লক্ষ্য বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, দুর্নীতি রোধ করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধি করে পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎসে পরিণত করা। গত ২১ এপ্রিল পুঁজিবাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার-বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনির সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) শীর্ষ কর্মকর্তারা। এতে পুঁজিবাজারের ইকোসিস্টেম, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সক্ষমতা, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ভূমিকা, সামগ্রিক কার্যক্রম, ডিএসইর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
সংসদে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছিলেন, দেশের পুঁজিবাজার উন্নত, প্রাণবন্ত ও গতিশীল করতে সরকারের একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে এটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের একটি শক্তিশালী উৎসে পরিণত হয়। তখন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও বলেছিলেন, পুঁজিবাজারের উন্নয়ন বিনিয়োগকারীদের আস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আর্থিক পণ্যের বহুমুখীকরণ ও বিনিয়োগ শিক্ষা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে একটি টেকসই পুঁজিবাজার গড়ে ওঠে।
এদিকে দেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘ বছর ধরে নানামুখী সংকটে জরাজীর্ণ। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, সবচেয়ে বেশি তৈরি হয়েছে আস্থার সংকট। সুশাসনের অভাব, প্রয়োজনীয় নজরদারি না থাকা এবং অনিয়ম ও কারসাজিকারীদের যথাযথ শাস্তির আওতায় না আনা—এসব কারণে তৈরি হয়েছে এই সংকট। পাশাপাশি নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্ত না হওয়া, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অদক্ষতা এবং ব্যাংক ঋণের ওপর অতিনির্ভরশীলতা যোগ করেছে নতুন মাত্রা। দেশের আর্থিক খাতে অনিয়মের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতায় পুঁজিবাজারেও বড় বড় অনিয়ম ও কারসাজির ঘটনা ঘটেছে। ২০১০ সালে রাজনৈতিক
ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যৌথভাবে কারসাজিতে জড়িত হয়ে বিনিয়োগকারীদের সর্বস্বান্ত করেছেন। বিভিন্ন মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগকারীদের অর্থ বিধিবহির্ভূতভাবে তছরুপের ঘটনাও ঘটেছে। ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে আইপিওর মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করে লুটপাট করা হয়েছে। আর এসব ঘটেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নাকের ডগায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার এমন ব্যর্থতা ও পুঁজিবাজারের উন্নয়নে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবই এই বাজারকে অকার্যকর হওয়া জন্য দায়ী। এ বিষয়ে বাংলাদেশ একাডেমি ফর সিকিউরিটিজ মার্কেটসের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী শেয়ার বিজকে বলেন, দেশের পুঁজিবাজারে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাম্প্রতিক সময়ে সরকার এ লক্ষ্যেই কিছু ইতিবাচক ও কাঠামোগত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে। সরকার বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি জোরদার করেছে। অনিয়ম ও কারসাজির বিরুদ্ধে নজরদারি বাড়ানো, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন আরও কঠোরভাবে যাচাই করা এবং তথ্য প্রকাশে শৃঙ্খলা আনতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরে আসার একটি ইতিবাচক বার্তা তৈরি হচ্ছে। ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) চেয়ারম্যান আবু আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বর্তমান সরকার বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করছে। এর অংশ হিসেবে বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, সুশাসন জোরদার, তদারকি কার্যক্রম আরও কার্যকর করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বাজারে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি প্রবাহ বাড়াতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার ও সহায়ক পরিবেশ তৈরির দিকেও সরকার কাজ করছে।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post