নিজস্ব প্রতিবেদক : ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রত্যাহারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ অনতিবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়েছে তৈরি পোশাকশিল্পের দুই শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)।
গতকাল সোমবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সংগঠন দুটি জানায়, বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের কাঁচামাল ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে, যা সরাসরি রপ্তানি প্রতিযোগিতা ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
‘পাটশিল্পের পরে গার্মেন্টশিল্প বন্ধের পাঁয়তারা’ শীর্ষক এ সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান, সহসভাপতি রেজওয়ান সেলিম, পরিচালক ফয়সাল সামাদ প্রমুখ।
বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, চরম পরিতাপের বিষয় হলো, বিশ্ববাজারের মন্দাভাব, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটের মতো ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ যখন আমাদের শিল্পকে কোণঠাসা করছে, ঠিক তখনই সুতা আমদানিতে শুল্কারোপের মতো এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত আমাদের সামনে এসেছে। যদিও আমরা পোশাক রপ্তানিকারীরাই বাংলাদেশের স্পিনিং মিলগুলোর উৎপাদিত সুতার একমাত্র ক্রেতা, তারপরও এ রকম একটি স্পর্শকাতর ও সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পোশাকশিল্পের স্বার্থকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। ট্যারিফ কমিশনের সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলার মধ্যেই আমাদের মতামতকে পাশ কাটিয়ে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
তিনি বলেন, নিঃসন্দেহে সুতা আমদানিতে শুল্কারোপ রপ্তানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এরই মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় পোশাক রপ্তানি ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ কমেছে এবং শুধু ডিসেম্বর মাসে তা ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ কমেছে। এর ওপর উচ্চ দামে সুতা কিনতে হলে ক্রেতারা ক্রয়াদেশ কমিয়ে দেবেন, যা প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারকদেরও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের প্রতি আমাদের আমাদের একান্ত অনুরোধÑসুতা আমদানিতে শুল্কারোপের সিদ্ধান্ত অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করা হোক। বস্ত্র খাতকে সুরক্ষা দিতে হলে আমদানিতে শুল্ক না বসিয়ে তাদের সরাসরি নগদ সহায়তা বা বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।
সেলিম রহমান বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করা, জ্বালানির মূল্য যৌক্তিকীকরণ, রপ্তানিমুখী সুতা উৎপাদনকারীদের করপোরেট ট্যাক্সে রেয়াত এবং স্বল্প সুদে ঋণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে স্পিনিং মিলগুলোর উৎপাদন খরচ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও তৈরি পোশাকশিল্পের প্রতিযোগী সক্ষমতা ধরে রাখার স্বার্থে সরকার অনতিবিলম্বে সুতা আমদানিতে শুল্কারোপের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করবে। এই অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা না হলে আমরা আমাদের শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হব।
এই একতরফা পদক্ষেপ সরাসরি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সেফগার্ড চুক্তির ৩ ও ৪ নম্বর অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুযায়ী, আমদানির ওপর এ-জাতীয় কোনো রক্ষণশীল শুল্কারোপের আগে অবশ্যই একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পে সিরিয়াস ইনজুরির বিষয়টি অকাট্যভাবে প্রমাণ করতে হয়; কিন্তু এখানে এটা করা হয়নি। এভাবে একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা কেবল অনভিপ্রেতই নয়, বরং নীতিগতভাবেও চরম প্রশ্নবিদ্ধ। সুতা আমদানিতে শুল্কারোপের সিদ্ধান্তটি শিল্প, তথা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য মারাত্মক বিপর্যয়কর বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আমদানি করা সুতার চেয়ে দেশীয় সুতার দাম ৩৫ থেকে ৬০ সেন্ট বেশি নেওয়া হয়। এটি ২০ সেন্ট পর্যন্ত বেশি হলেও দেশীয় শিল্পের স্বার্থে দেশের সুতা কিনতে প্রস্তুত রয়েছেন তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকরা। তাদের দাবি, সরকার সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রত্যাহার করার আগে এটি নিশ্চিত করলে তাদের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি থাকবে না।
জানা গেছে, বর্তমানে ভারত থেকে আমদানি হওয়া সুতাই দেশের বেশিরভাগ রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পে ব্যবহার করা হয়। ৩০ কার্ডের এক কেজি সুতা বাংলাদেশি মিলগুলো বিক্রি করে প্রায় তিন মার্কিন ডলারে, যা ভারতীয় উৎপাদকেরা বিক্রি করে দুই ডলার ৬০ সেন্টে। মূলত কম দামের কারণেই বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা ভারতের সুতা আমদানি করেন। এছাড়া চীন, ভিয়েতনামসহ কয়েকটি দেশের সুতা আমদানিতে আরো কম ব্যয় হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সুতা আমদানিতে শুল্কারোপ হলে তা নিঃসন্দেহে রপ্তানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আমরা দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো রক্ষা করার পক্ষে, তবে এই মুহূর্তে বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে সেটি তৈরি পোশাকশিল্পে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এরই মধ্যে গত ছয় মাস ধরে আমাদের রপ্তানি নিম্নমুখী রয়েছে। সুতায় বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহার হলে রপ্তানি আরও বড় ধরনের হোঁচট খাবে।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post