নিজস্ব প্রতিবেদক: যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন বলেছেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে প্রচলিত সহায়তানির্ভর ধারা থেকে বের করে বিনিয়োগকেন্দ্রিক কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ দিতে ওয়াশিংটন প্রস্তুত।
তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমরা অতীতের সেই ব্যর্থ নীতিগুলো থেকে সরে আসছি, যেগুলো বিকৃত বাণিজ্যিক সম্পর্ক, সুবিধাবাদী প্রবণতা ও অস্বচ্ছ বাজারব্যবস্থাকে উৎসাহিত করেছিল। এর পরিবর্তে আমরা এমন একটি মডেলের দিকে এগোচ্ছি, যা উভয় দেশের জনগণের জন্য সুফল বয়ে আনবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটি এমন একটি নীতি, যা সহায়তার চেয়ে বাণিজ্যকে, অনুদানের চেয়ে বিনিয়োগকে এবং এমন এক প্রকৃত অংশীদারত্বকে গুরুত্ব দেয়, যা দুই দেশের জন্যই সুযোগ সৃষ্টি করবে।’
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) আয়োজিত ‘অ্যাডভান্সিং ইউএস-বাংলাদেশ ইকোনমিক পার্টনারশিপ’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের নীতিগত সংলাপে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রদূত ‘এগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড’ (এআরটি)-কে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের একটি রূপান্তরমূলক কাঠামো হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে বাণিজ্য প্রবাহ ও পারস্পরিক বিনিয়োগ বাড়বে।
ক্রিস্টেনসেন জানান, এআরটি কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ১৯ শতাংশ হারে শুল্ক সুবিধা পাবে। অন্যথায় এ হার ৩৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারত।
বিনিময়ে বাংলাদেশকে অশুল্ক বাধা কমানো এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ভারসাম্য আনতে উচ্চমানের মার্কিন পণ্যের আমদানি বাড়াতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বড় ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ টেনে রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, সয়াবিন, তুলা ও ভুট্টা ইত্যাদি ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তিনি বলেন, অন্যান্য উৎসের তুলনায় মার্কিন গমে পচন কম হয়, যা সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়াতে সহায়ক।
বাংলাদেশের শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, কৌশলগত অবস্থান ও ক্রমবর্ধমান কর্মশক্তির প্রশংসা করলেও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন ক্রিস্টেনসেন। তিনি বলেন, চুক্তি বাস্তবায়ন ও পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করা, স্থিতিশীল ও স্বচ্ছ নীতিগত পরিবেশ বজায় রাখা এবং ব্যবসায়িক পদ্ধতির আধুনিকায়ন জরুরি। রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘বিশ্বাস তৈরির জন্য চুক্তির সম্মান রক্ষা করা আবশ্যক।’ তিনি নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অস্বচ্ছতা কমানো, অতিরিক্ত করের চাপ হ্রাস এবং বৈষম্যহীন লাইসেন্সিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি শুল্ক প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক শ্রম ও পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
ডিজিটাল অর্থনীতির সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখনো বিপুল পরিমাণ লেনদেন নগদনির্ভর, যা ভিসা ও মাস্টারকার্ডের মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল আর্থিক সেবার সম্প্রসারণের বড় সুযোগ তৈরি করছে।
তিনি আরও বলেন, স্টারলিংক, গুগল পে ও মাইক্রোসফটের মতো শীর্ষ মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে আগ্রহ ও উপস্থিতি বাড়ছে।
প্রযুক্তি খাতের বাইরে রেলপথ, বন্দর ও বেসামরিক বিমান চলাচলের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো খাত আধুনিকায়নেও বাংলাদেশকে সহায়তা দিতে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র। এ ক্ষেত্রে তারা সরবরাহব্যবস্থা, নিরাপত্তা ও সিস্টেম ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা দিতে আগ্রহী।
বক্তব্যের শেষাংশে রাষ্ট্রদূত জুলাইয়ে অনুষ্ঠেয় ‘আমেরিকা উইক’সহ যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিভিন্ন আয়োজনে অংশ নিতে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে আমন্ত্রণ জানান।
তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক এখন একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও যৌথ সমৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post