ফারুক রহমান, সাতক্ষীরা : ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর উপজেলা) আসনে ব্যস্ত সময় পার করছে রাজনৈতিক দলগুলো। বর্তমানে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা দুই দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শুরু না করলেও সম্ভাব্য দলীয় প্রার্থী মনোনীত হওয়ার মধ্য দিয়ে উভয় দলই মাঠের কার্যক্রম শুরু করেছে।
নির্বাচন ঘিরে রেখে উঠান বৈঠক, পথসভা ও মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ এবং দলীয় নেতাকর্মী সমর্থকদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন প্রার্থীরা। নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণের পাশাপাশি মূল প্রতিদ্বন্দ্বী এই দুই দলের প্রার্থী ভোটারদের আকৃষ্ট করতে নানামুখী উদ্যোগ বাস্তবায়নেরও স্বপ্ন দেখাচ্ছেন তারা।
দীর্ঘদিন পর ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নির্বাচনী আমেজ আর উš§াদনা দেখা দিয়েছে। প্রভাবমুক্ত পরিবেশে নবীন-প্রবীণের লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে মুখিয়ে আছেন তারা।
এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে মনোনয়ন দিয়েছে দল। অপরদিকে বিএনপি থেকে প্রাথমিক দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন ড. এম মনিরুজ্জামান।
এখন পর্যন্ত সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর উপজেলা) আসনে বিএনপি ও জামায়াত ইসলামীসহ ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের প্রার্থীর তৎপরতা চোখে পড়েছে। এর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মধ্যে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় আট মাস আগেই জামায়াত ইসলামীর পক্ষ থেকে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের কর্মপরিষদের সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দলের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। তিনি ১৯৯১ এবং ২০০১ সালে সাতক্ষীরা-৫ শ্যামনগর আসন থেকে জামায়াতের হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৯ সালের নবম জাতীয় নির্বাচনে মহাজোট প্রার্থীর বিরুদ্ধে এবং ২০১৮ সালে রাতের ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর নিকট পরাজিত হন তিনি।
এদিকে, গত ৩ নভেম্বর বিএনপির পক্ষ থেকে শ্যামনগর (সাতক্ষীরা-৪) আসনের জন্য মনোনীত করা হয়েছে সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক ড. এম মনিরুজ্জামানকে। ছাত্রজীবনে জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয় হলেও শেষ এক দশকে স্থানীয় বিএনপিকে পুনর্গঠনে মুখ্য ভুমিকা রেখেছেন তিনি। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামের শেষ সাত-আট বছরে মনিরুজ্জামানের অনবদ্য ভূমিকা দলীয় নেতাকর্মীদের দারুণভাবে উজ্জীবিত করে।
স্থানীয় বিভিন্ন দলের কর্মী-সমর্থক ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শ্যামনগর আসনে আগামী জাতীয় নির্বাচনে মূলত নবীন-প্রবীণের লড়াই হবে। জামায়াত দলীয় সাবেক দুবারের এমপির সঙ্গে বিএনপির উদীয়মান তরুণ নেতার মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা দেখছেন তারা।
অনেকের দাবি দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতের দুর্গ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া আসনটি ১৯৭৮ সালের পর (১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না) আবারও বিএনপির পকেটে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
আওয়ামী লীগের রিজার্ভ ভোট বিএনপির জয়ের সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করেছে। তবে অন্তর্দ্বন্দ্বে বিপর্যস্ত বিএনপি ঐক্যবদ্ধ না হলে সুযোগ নিতে পারে বর্তমান সময়ের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত।
শ্যামনগর পৌর সদরের নকিপুর বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আবুল হোসেন বলেন, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীকে মানুষ অনেক দিন ধরে দেখছে। তিনি এ আসনে দুবার নির্বাচিত হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তবে মনিরুজ্জামান শিক্ষিত এবং মার্জিত আচার ব্যবহারের মাধ্যমে অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন। সে কারণে তরুণদের পাশাপাশি বয়স্ক অনেকেই বিএনপি প্রার্থীর ওপর আস্থা রাখতে চান।
উপজেলার নওয়াবেকী এলাকার বিড়ালাক্ষ্মী গ্রামের আইনজীবী রায়হান ও ব্যবসায়ী আল আমিন বলেন, নেতাদের জামায়াত নির্ভরতায় ১৯৯১ সালের পর থেকে শ্যামনগরে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। মনিরুজ্জামানের চৌকস নেতৃত্বে বর্তমানে জামায়াতকে চ্যালেঞ্জ করার পর্যায়ে পৌঁছেছে বিএনপি। তবে উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ ও তার অনুসারীদের মনিরুজ্জামানকে মেনে না নেয়ার মানসিকতা আসনটি উদ্ধারে বিএনপির স্বপ্নকে প্রলম্বিত করতে পারে।
পানখালী গ্রামের প্রমথ মহালদার, জেলেখালীর হরিদাস ও বাদঘাটার আবু সায়াদসহ অসংখ্য সাধারণ ভোটরদের ধারণা নির্দিষ্ট ভোট ব্যাংক থাকলেও আ.লীগ কর্মী সমর্থকসহ প্রায় ৭৩ হাজার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটসহ জামায়াতের বিপক্ষে যেতে পারে। আবার পরপর তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে না পারা তরুণরা অল্প বয়সী বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর দিকে ঝুঁকছে। এমতাবস্থায় অন্তর্দ্বন্দ্ব নিরসন না হলে সমূহ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও শ্যামনগর আসন পুনরায় হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
নির্বাচনের বিষয়ে উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি মো. শহিদুল ইসলাম জানান, আগে থেকে জামায়াত নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছে। সাধারণ ভোটাররা জামায়াতের ওপর আস্থা রাখতে চায়। প্রতিপক্ষের অভ্যন্তরীণ কোন্দল কিংবা তৎপরতা তার দলের ভাবনার বিষয় না।
অপরদিকে, উপজেলা বিএনপির একাংশের আহ্বায়ক সোলায়মান কবীর জানান, মাত্র মনোনয়নের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ায় অনেকে ক্ষুব্ধ হয়ে দূরে থাকার ইঙ্গিত দিলেও তফসিল ঘোষণার পর নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কেটে যাবে। সংখ্যালঘুসহ আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক এবার জামায়াতের বিরুদ্ধে তাদের দলের প্রার্থীকে বিজয়ী করার বার্তা দিচ্ছে।
বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত অংশের নেতা নুর ইসলাম বলেন, এখনও চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়নি দল। তফসিল ঘোষণার পর আনুষ্ঠাানিকভাবে দলীয় প্রার্থী নিশ্চিত না করা পর্যন্ত তারা সমবেতভাবে কিছু করতে পারছেন না। ঐক্যবদ্ধ না হলে বিএনপির জেতার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাবে।
উল্লেখ্য, এই সংসদীয় আসন একটি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। মোট ভোটার ২ লাখ ৯৮ হাজার ৬৪৪ জন। ৯৬টি কেন্দ্রের এই সংসদীয় আসনে নারী ভোটার এক লাখ ৪৮ হাজার ১৩৩ জন। পুরুষ ভোটার এক লাখ ৫০ হাজার ৫০৭ এবং তৃতীয় লিঙ্গের চারজন ভোটার রয়েছে।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post