পুঁজিবাজার ও ব্যাংক খাত এই দুই গুরুত্বপূর্ণ খাতের ওপরই দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভরশীল। অথচ বিস্ময়করভাবে দেখা যাচ্ছে, গুরুতর অনিয়ম, আইন লঙ্ঘন এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের পরও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কার্যত নীরব ভূমিকা পালন করছে। ন্যাশনাল ব্যাংককে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই নীরবতার এক উদ্বেগজনক উদাহরণ।
তালিকাভুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ বাধ্যতামূলকÑএটি পুঁজিবাজারের একটি মৌলিক শর্ত। কিন্তু ন্যাশনাল ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই নিয়ম স্পষ্টভাবে লঙ্ঘিত হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। শেয়ার হোল্ডিং কমে যাওয়া, আবার হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়াÑএসব পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ডিসক্লোজার না দেওয়া বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। অথচ এই অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেই। এখানেই প্রশ্ন ওঠেÑনিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ভূমিকা কোথায়? বাংলাদেশ ব্যাংক মূলধন ও তারল্য ব্যবস্থাপনায় নজরদারি করে, আর বিএসইসি ও ডিএসই পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দায়িত্বে। কিন্তু যখন একটি প্রতিষ্ঠান বারবার নিয়ম ভেঙেও পার পেয়ে যায়, তখন তা শুধু একটি ব্যাংকের সমস্যা নয়; বরং পুরো নিয়ন্ত্রক কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ন্যাশনাল ব্যাংকের অতীতও অনিয়মে পরিপূর্ণ। পরিবারতন্ত্র, বেনামি ঋণ, কমিশনের বিনিময়ে ঋণ প্রদান, এমনকি পরিচালনা পর্যায়ে দ্বন্দ্বÑসব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বলতার দিকে ধাবিত হয়েছে। এর ফল ভোগ করছেন আমানতকারী ও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতাÑ সবকিছুই একটি গভীর ব্যবস্থাপনা সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এতকিছুর পরও দায়বদ্ধতার অভাব। শেয়ার লেনদেন বিষয়ে কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের অস্পষ্ট বক্তব্য, নিয়ন্ত্রকদের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়াÑএসবই একটি অস্বচ্ছ ও জবাবদিহিহীন পরিবেশ তৈরি করছে। এতে বাজারে আস্থা কমে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। তা ছাড়া দেশের ব্যাংক খাতের সার্বিক আবস্থা কিছুদিন আগেও যথেষ্ট উদ্বেগজনক ছিল। আর সেটা হয়েছে ব্যাংক পরিচালক তথা মালিক কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে। সেখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তথা দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ অবস্থান থেকে ন্যায়-সঙ্গতভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখলে এমন পরিস্থিতি দেখতে হতো না। আর দেশের অর্থণৈতিক পরিস্থিতিও এতটা দুর্দশাগ্রস্ত হতো না। এ অবস্থায় প্রয়োজন কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ। প্রথমত, শেয়ার ধারণ ও লেনদেন সংক্রান্ত সব অনিয়মের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে, যাতে কোনো প্রতিষ্ঠান প্রভাব খাটিয়ে নিয়ম এড়িয়ে যেতে না পারে। তৃতীয়ত, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, ‘সব জেনেও নীরবতা’ কোনো সমাধান নয়; বরং এটি সমস্যাকে আরও গভীর করে। অর্থনীতির স্বার্থে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post