নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশে প্রথমবারের মতো চালু হলো ইনভেস্টমেন্ট ম্যাচমেকিং পোর্টাল। গতকাল বুধবার এই পোর্টাল চালু করে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। গতকাল এক ভিডিওবার্তায় নিজেদের ওয়েবসাইটের সঙ্গে যুক্ত এই পোর্টাল চালু করার ঘোষণা দেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।
বিডার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রচারিত ওই ভিডিওবার্তায় আশিক চৌধুরী বলেন, গত এক বছর প্রায়ই আমাদের কাছে স্থানীয় উদ্যোক্তারা এসেছেন বিদেশি বিনিয়োগকারী খুঁজে দেয়ার জন্য। আবার একইসঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আমাদের কাছে আসেন জানতে যে, তাদের জন্য আমরা একজন বাংলাদেশি বিনিয়োগকারী খুঁজে বের করে দিতে পারি কি না, যার সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা একটি জয়েন্ট ভেঞ্চার করতে পারেন। কিন্তু কেউ কাউকে চেনেন না। এই সমস্যাটা দূর করার জন্য আমরা বিডার ওয়েবসাইটে একটি ম্যাচমেকিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছি, যে প্ল্যাটফর্মের সাহায্যে তারা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে।’
‘স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কাছে আমরা আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারা এই ম্যাচমেকিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করার জন্য রেজিস্ট্রেশন করুন। সেইসঙ্গে বিদেশি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে পরিচিত হন,’ যোগ করেন বিডা চেয়ারম্যান।
বিডার তথ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগ সেবাকে আরও আধুনিক করতে বিডা এ উদ্যোগ নিয়েছে। এই প্ল্যাটফর্মে সরকারি ও বেসরকারি প্রকল্প একসঙ্গে দেখা যাবে এবং উদ্যোক্তারা তাদের নিজস্ব প্রকল্প তালিকাভুক্ত করতে পারবেন।
বিডার ওয়েবসাইটে ঢুকে দেখা যায়, সাইটের ওপর বিটুবি ম্যাচমেকিং নামে একটি ট্যাব যুক্ত করা হয়েছে। তাতে ক্লিক করলে রেজিস্ট্রেশনের অপশন চলে আসবে।
উদ্যোক্তারা মাত্র তিন ধাপে এই প্ল্যাটফর্মে যোগ দিতে পারেন-এক. আইডি তৈরি; দুই. উদ্যোক্তা প্রোফাইল তৈরি এবং তৃতীয় ধাপে ব্যবসার তথ্য দিয়ে প্রকল্প প্রোফাইল তৈরি। এতেই প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করে নিজেদের প্রত্যাশিত বিদেশি বিনিয়োগকারী খুঁজে পেতে পারেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা।
পোর্টালে আরও আছে, দেশের বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্পের সমন্বিত তালিকা। সব যোগাযোগ সহজেই ট্র্যাক করার সুবিধা পাবেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিডার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান আশিক চৌধুরী। এর পর থেকে বিদেশি বিনিয়োগ টানতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন তিনি। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগও বাড়তে শুরু করেছে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রথম বছরে দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বেড়েছে ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, সম্প্রতি যেসব দেশে গণঅভ্যুত্থান ঘটেছে, সেসব দেশে পরবর্তী এক বছরে এফডিআই উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালের পর এফডিআই কমেছে ১৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ, চিলিতে ২০১৯ সালের পর কমেছে ১৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ, সুদানে ২০২১ সালের পর ২৭ দশমিক ৬০ শতাংশ, ইউক্রেনে ২০১৪ সালের পর ৮১ দশমিক ২১ শতাংশ, মিসরে ২০১১ সালের পর ১০৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ আর ইন্দোনেশিয়ায় ১৯৯৮ সালের পর ১৫১ দশমিক ৪৯ শতাংশ কমেছে। এই ধারাবাহিক হ্রাসের মধ্যে বাংলাদেশে এফডিআইয়ের ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ বৃদ্ধির চিত্র বিশেষভাবে নজরকাড়া বলে মনে করেন বিডার চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিদেশি বিনিয়োগ ছিল ৪৮৮ দশমিক ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৭০ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলারে। ২০২৩ সালে বিনিয়োগের পরিমাণ হয় ৯২৪ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার, তবে ২০২৪ সালে কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৬৭৬ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলারে। আর ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯২ দশমিক ৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে।
বিডা জানায়, ব্যবসায় ভালো মুনাফা হওয়ায় বিদেশি কোম্পানিগুলো তাদের মুনাফার একটি বড় অংশ পুনর্বিনিয়োগ করেছে। এর ফলে এ বছর জানুয়ারি-জুন সময়ে নিট প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬১ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, ট্যারিফ ঝুঁকি এবং মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের ফলে বৈশ্বিক গ্রিনফিল্ড এফডিআই’র ধারা নিম্নমুখী হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে নতুন মূলধনে প্রবৃদ্ধি হয়েছে তিন শতাংশ।
মূল কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে অবস্থিত তাদের স্থানীয় ইউনিটগুলোকে কার্যকরভাবে অর্থায়ন করছে, যা প্রতিফলিত হয়েছে ইন্টার-কোম্পানি ঋণের ২২৯ শতাংশ বৃদ্ধিতে।
জানুয়ারি-জুন অগ্রগতির পাশাপাশি জুলাই থেকে জুন অর্থবছর হিসাব করলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট এফডিআই প্রবাহ আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৯ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিডা, বেপজা, বেজা, ভেটপা এবং বিএসসিআইসি-এই বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোম্পানির মোট ১৮৫ কোটি ডলারের প্রস্তাবিত বিনিয়োগ নিবন্ধিত হয়েছে। এর মধ্যে ৬৫ কোটি ডলারের বেশি প্রস্তাব এসেছে বিদেশি কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে।
গতকাল চালু হওয়া ইনভেস্টমেন্ট ম্যাচমেকিং পোর্টাল বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post