আনোয়ার হোসাইন সোহেল : আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের মালিকানাধীন বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম ও বিডি থাই ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানির উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। তবে কোম্পানি-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাপ্লাই কমে যাওয়ায় উৎপাদন সীমিত করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী বিষয়টি বিএসইসিকে জানানোর কথা থাকলেও কোম্পানিটি তা গোপন করেছে। গত প্রায় এক বছরে কোম্পানিটির শেয়ারদর ২৫ শতাংশ কমেছে। এতে বিনিয়োগকারীদের মুনাফায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। তবে গত কমিশনের কিছু অসাধু কমিশনার কারসাজি করে বিডি থাই ফুড অ্যান্ড অ্যালুমিনিয়াম বেভারেজ কোম্পানির শেয়ারদাম বাড়িয়ে ১৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ শেয়ার ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) কাছে বিক্রি করে দিয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে বিডি থাই ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানি বন্ধ পাওয়া গেছে। বাজারে ঘুরে তাদের কোনো পণ্যও পাওয়া যায়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কারখানা-সংশ্লিষ্ট অনেকেই জানিয়েছেন বেশ কিছুদিন ধরে বিডি থাই ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
ক্ষুদ্র বিনিয়োগাকারীরা বলছেন, ধারাবাহিক দরপতন, অস্বাভাবিক মূল্য ওঠানামা এবং কোম্পানির আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ এখন কার্যত নিঃস্ব হওয়ার পথে রয়েছে। তারা আরও বলেন, একসময় ‘গ্রোথ স্টক’ হিসেবে আলোচনায় থাকা বিডি থাইয়ের শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়। স্বল্প সময়ের মধ্যে শেয়ারটির দাম কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়, যা অনেক বিনিয়োগকারীকে আকৃষ্ট করে। উচ্চ দামে শেয়ার কিনে বিপুলসংখ্যক সাধারণ বিনিয়োগকারী বাজারে প্রবেশ করেন। তবে পরবর্তী সময়ে শেয়ারদরে ধস নামলে তারা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েন।
গত বছরের মার্চ মাস থেকে কোম্পানির শেয়ারদর টানা নিম্নমুখী। আর্থিক প্রতিবেদনেও প্রত্যাশিত মুনাফার প্রতিফলন নেই। বরং বিক্রি ও মুনাফা হ্রাসের তথ্য প্রকাশের পর শেয়ারটিতে বিক্রির চাপ আরও বেড়ে যায়। অনেক বিনিয়োগকারী অভিযোগ করেছেন, কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে পরিষ্কার বার্তা না থাকায় বাজারে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। অনেক বিনিয়োগাকারীর আশঙ্কা কোম্পানিটি আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী জাহিদ মালেক ও তার পরিবারের মালিকানাধীন হওয়ায় নতুন সরকার এলে এর ওপর আরও খড়্গ নেমে আসতে পারে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে পলাতক রয়েছেন জাহিদ মালেক।
বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধারদেনা করে কিংবা সঞ্চয়ের টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন তারা। দরপতনের কারণে এখন মূলধনের বড় অংশই উধাও। কেউ কেউ শেয়ার বিক্রি করতে চাইলে ক্রেতা না পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন। এতে তাদের বিনিয়োগ কার্যত আটকে আছে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো কোম্পানির মৌলভিত্তি দুর্বল হলে শুধু গুজব বা কৃত্রিম চাহিদার ভিত্তিতে দর বাড়ানো টেকসই হয় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাস্তব আর্থিক চিত্র প্রকাশ পেলে শেয়ারদর স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসে। বিডি থাইয়ের ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিনিয়োগকারীরা। তাদের দাবি, অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির সময় যথাযথ তদন্ত ও সতর্কতা জারি করা হলে অনেকেই ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতেন। বাজার কারসাজির অভিযোগও খতিয়ে দেখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ডিএসই’র তথ্য অনুযায়ী, বিডি থাইয়ের শেয়ারটির লেনদেনের পরিমাণও কমে এসেছে। বাজারে আস্থাহীনতার কারণে নতুন করে ক্রেতা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ফলে দরপতন অব্যাহত রয়েছে। গত বছরের মার্চ থেকে চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি (গতকাল) পর্য্ন্ত প্রায় একবছরে কোম্পানিটির শেয়ারদর কমেছে ২৫ শতাংশ। কোম্পানিটি ২০২৪ সালে বিনিয়োগকারীদের শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। তার আগে কোম্পানিটি ২০২১ সালে বিনিয়োগকারীদের ২ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছিলো।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, বিডি থাইয়ের বর্তমানে ১৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ শেয়ারের মালিক আইসিবি। বাকি শেয়ারগুলোর মধ্যে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের হাতে রয়েছে ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ, অধ্যাপক রুবিনা হামিদের ২ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং শাবানা মালেকের ২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিনিয়োগের আগে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, নগদ প্রবাহ, পরিচালনা পর্ষদের স্বচ্ছতা ও ব্যবসায়িক সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি। শুধু দ্রুত মুনাফার আশায় বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।এ বিষয়ে কোম্পানিটির চেয়ারপাসন রুবিনা হামিদকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। তবে বিডি থাই অ্যালুমিনিয়ামের সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং ম্যানেজার আবু জাহিদ শেয়ার বিজকে বলেন, বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম ও বিডি ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানির চেয়ারপাসন (রুবিনা হামিদ) হাসাপতালে আছেন। তার পক্ষে থেকে আমাকে কথা বলতে বলেছেন। আমাদের কারখানা বন্ধ হয়নি। তবে উৎপাদন কমানো হয়েছে। যেসব কোম্পানিতে আমরা এতদিন থাই অ্যালুমিনিয়াম সাপ্লাই দিতাম, তাদের বাজেট না থাকায় এমনটি করতে হয়েছে। আমরা পর্যাপ্ত অর্ডার পাচ্ছি না। সে কারণে কমে গেছে উৎপাদন। বিডি থাই ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানির বিষয়ে তিনি কোনো তথ্য দিতে পারবেন না বলেও জানান।
এ বিষয়ে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র ও পরিচালক মো. আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, যদি কোনো কোম্পানির উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয় বা বন্ধ করা হয়, সেক্ষেত্রে অবশ্যই ওই কোম্পানিকে প্রাইস সেনসিটিভ তথ্য হিসেবে বিএসইসি ও তালিকাভুক্ত স্টক এক্সচেঞ্জকে জানাতে হবে। যদি উৎপাদন বন্ধ থাকে, সেক্ষেত্রে আমরা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।
গতকাল মঙ্গলবার কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দর ছিলে ১১ টাকা ১০ পয়সা।
ডিএসইর দেওয়া সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৬ অনুযায়ী, কোম্পানিটিতে বর্তমানে বিনিয়োগাকারীদের শেয়ার রয়েছে ৬২ দশমিক ৮৪, উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে রয়েছে ২৯ দশমিক ১৮ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ রয়েছে ৭ দশমিক ২০ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিয়োগ রয়েছে শূন্য দশমিক ৭৮ শতাংশ।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post