হাসান শিরাজী: ধরুন, ফাহিম নামের এক তরুণ গবেষকের কথা। সে দেশের একটি নামকরা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। টানা এক বছর ল্যাবে রাত জেগে সে এমন একটি ছোট যন্ত্র বা সেন্সর তৈরি করল, যা দিয়ে খুব সহজেই পানিতে ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি ধরা যায়। তার এই কাজ নিয়ে বিদেশি নামিদামি জার্নালে বড়সড় প্রবন্ধ ছাপা হলো। বিভাগের শিক্ষকরা পিঠ চাপড়ে দিলেন, সবাই হাততালি দিলেন; কিন্তু তারপর?
তারপর আর কিছুই হলো না। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির তাকে ফাহিমের সেই থিসিস পেপারটায় ধুলো জমতে শুরু করল। সে নিজে পড়াশোনা শেষ করে অন্য একটা চাকরিতে ঢুকে গেল। আর ঠিক তিন বছর পর দেখা গেল, ভিনদেশি একটি কো¤‹ানি ঠিক একই রকম প্রযুক্তির একটি সেন্সর বাজারে ছেড়ে কোটি কোটি টাকা মুনাফা লুটছে। উদ্ভাবনের মূল আইডিয়াটা ফাহিমের হলেও আইনি মালিকানা বা ‘প্যাটেন্ট’ তার বা তার বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই। তাই লাভ যা হওয়ার, সব বাইরের মানুষেরই হলো।
এটি শুধু ফাহিমের একার গল্প নয়, এটি বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরির করুণ বাস্তব চিত্র। আমাদের ছেলেমেয়েরা দারুণ সব আইডিয়া নিয়ে কাজ করছে, চমৎকার সব গবেষণা করছে। কিন্তু সেই গবেষণার ফসল যখন বাস্তব দুনিয়ার পণ্য হয়ে বাজারে আসার কথা, তখন দেখা যায় তার কোনো মালিকানা আমাদের নেই। একেই বলা যায় আমাদের ভয়ংকর ‘প্যাটেন্ট ঘাটতি’।
কেন এমন হচ্ছে? আমরা কেন আমাদের আবিষ্কার নিজেদের নামে নিবন্ধন করছি না? কারণগুলো খুব সাধারণ, কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এগুলো চরমভাবে অবহেলিত।
প্রথমত, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এমন কোনো সংস্কৃতিই গড়ে ওঠেনি। শিক্ষকদের প্রমোশন বা পদোন্নতি হয় কয়টি গবেষণাপত্র বা ‘জার্নাল পেপার’ ছাপা হলো, ঠিক তার ওপর ভিত্তি করে। তারা কোনো পণ্য তৈরি করলেন কি না, বা সেই পণ্যের প্যাটেন্ট নিলেন কি না, তার কোনো দাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে নেই। ফলে শিক্ষকরাও ছাত্রদের শুধু ‘পেপার’ লেখার জন্যই চাপ দেন, প্যাটেন্ট করার জন্য নয়।
দ্বিতীয়ত, একটি প্যাটেন্ট বা মেধাস্বত্ব নিবন্ধন করার প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল এবং অনেক সময়সাপেক্ষ। এর জন্য প্রচুর টাকারও প্রয়োজন হয়। একজন সাধারণ ছাত্র বা শিক্ষকের পক্ষে একা সেই আইনি খরচ টানা বা আইনজীবীদের পেছনে ছোটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এমন কোনো আলাদা বিভাগ বা সেল নেই, যারা ছাত্রদের হয়ে এই প্যাটেন্ট করার কাজটি দেখভাল করবে।
আমাদের পাশের দেশ ভারত বা দূরপ্রাচ্যের চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একেকটি প্যাটেন্টের কারখানা। তারা জানে, শুধু জ্ঞান বিতরণ করলেই হবে না, সেই জ্ঞানকে স¤‹দে পরিণত করতে হবে। আমাদের নীতিনির্ধারকদেরও এবার এই সত্যটা বুঝতে হবে। দেশের মেধাকে এভাবে অন্যের হাতে তুলে দেওয়া আর কতদিন চলবে?
পরিস্থিতি বদলাতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্যাটেন্টমুখী করতে নীতিনির্ধারক ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিতেই হবেÑ
১. বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘প্যাটেন্ট সেল’ বা টিটিও গঠন: দেশের প্রতিটি বড় ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘টেকনোলজি ট্রান্সফার অফিস’ প্রতিষ্ঠা করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এদের কাজই হবে ছাত্রদের উদ্ভাবনী আইডিয়াগুলো খুঁজে বের করা, আইনিভাবে সেগুলো প্যাটেন্ট করতে সাহায্য করা এবং পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন কো¤‹ানির সঙ্গে চুক্তি করিয়ে দেওয়া।
২. জাতীয় প্যাটেন্ট ফান্ড তৈরি: সরকার বা ইউজিসিকে একটি বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে। উদ্ভাবনটি যদি আসলেই সম্ভাবনাময় হয়, তবে প্যাটেন্ট ফাইলিংয়ের পুরো খরচ এই ফান্ড থেকে দিতে হবে। টাকার অভাবে যেন কোনো উদ্ভাবন মালিকানাহীন না থাকে।
৩. শিক্ষকদের মূল্যায়নের নিয়ম বদলানো: শিক্ষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে শুধু জার্নাল পেপারের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। কেউ যদি সফলভাবে কোনো প্রযুক্তির প্যাটেন্ট করতে পারেন, তবে তাকে গবেষণাপত্রের চেয়েও বেশি নম্বর বা গুরুত্ব দিতে হবে। এতে করে শিক্ষকরাই ছাত্রদের বাস্তবমুখী উদ্ভাবনে বেশি উৎসাহ দেবেন।
৪. শিল্পকারখানার সাথে সেতুবন্ধ: আমাদের দেশের শিল্পকারখানাগুলো বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। দেশীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় ফান্ড দিতে উৎসাহী করতে হবে। যারা ফান্ড দেবে, তাদের জন্য সরকার কর ছাড়ের সুবিধা ঘোষণা করতে পারে। এতে ইন্ডাস্ট্রি এবং একাডেমিয়ার মধ্যে দূরত্ব কমবে।
মেধা আমাদের কম নেই। ফাহিমের মতো হাজারো তরুণ প্রতিদিন ল্যাবে নতুন কিছু করার স্বপ্ন দেখছে। শুধু দরকার তাদের সেই স্বপ্নের আইনি সুরক্ষা। আমাদের উদ্ভাবনগুলো যেন শুধু কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের অর্থনীতি বদলে দেওয়ার হাতিয়ার হয়, সেই ব্যবস্থা করার দায়িত্ব এখন রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। নয়তো ‘আমাদের উদ্ভাবন, অন্যের প্যাটেন্ট’Ñএই দীর্ঘশ্বাসের গল্পটা চলতেই থাকবে।
প্রিন্ট করুন




Discussion about this post