ফারিহা জামান নাবিলা : মানুষের বয়স বাড়লে যেন গাছের শুকনো পাতার মতো হয়ে যায় যে পাতাগুলো একসময় ছায়া দিত, অক্সিজেন দিত, সৌন্দর্য বাড়াত, শেষে সেগুলো ঝরে পড়ে যায়। একসময় যে বাবা-মা সন্তানকে বুকের ভেতর আগলে বড় করেছেন, আজ তারা নিজেদের সন্তানদের কাছেই অবহেলিত হয়ে বৃদ্ধাশ্রমে কাটাচ্ছেন জীবনের শেষ সময়টা। বয়সের ভারে যখন শরীর ক্লান্ত হয়, তখন সেই মানুষগুলো সবচেয়ে বেশি চায় আপনজনের ভালোবাসা। অথচ অনেক বাবা-মা আজ নিজেদের সন্তানদের কাছেই অবহেলিত হয়ে বৃদ্ধাশ্রমের দেয়ালে বন্দি। এই আশ্রয়গুলো তাদের জন্য যেন কোনো ঘর নয় বরং নিঃসঙ্গতার অদৃশ্য কারাগার।
বাংলাদেশে ধীরে ধীরে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়ছে। আগে যেখানে এগুলোকে ব্যতিক্রম মনে করা হতো, এখন শহরাঞ্চলে এটি অনেকটা স্বাভাবিক চিত্র হয়ে উঠেছে। পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হওয়া, ব্যস্ততার অজুহাত আর অর্থনৈতিক বাস্তবতা মিলিয়ে অনেক বাবা-মাকে সন্তানরা বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যাচ্ছে। ফলে জীবনের শেষ বয়সে, যখন সবচেয়ে বেশি দরকার হয় ভালোবাসা আর সঙ্গ তখন তারা কাটাচ্ছেন একাকিত্ব ও মানসিক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে।
বাংলাদেশের নগর এলাকায় বৃদ্ধাশ্রমের চাহিদা অনেক বেড়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেখানে ভর্তি হওয়া প্রবীণরা নিজের ইচ্ছায় আসেননি বরং পরিবার বা সন্তানের সিদ্ধান্তে বাধ্য হয়েছেন। তারা বৃদ্ধাশ্রমে থাকলেও প্রতিদিন সন্তানদের কথা ভাবেন এবং যোগাযোগের অভাব তাদের গভীরভাবে কষ্ট দেয়। বৃদ্ধাশ্রম তাদের শারীরিক নিরাপত্তা দিলেও মানসিক প্রশান্তি দিতে ব্যর্থ। উৎসব বা বিশেষ দিনে পরিবারের কাছ থেকে কোনো খবর পান না যা অনেক কষ্টদায়ক।
একাকিত্ব ও অবহেলার কারণে বৃদ্ধদের মধ্যে ডিপ্রেশন, স্মৃতিভ্রংশ, এমনকি আত্মহত্যার প্রবণতাও বাড়ছে। অন্যদিকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া প্রবীণরা নিজেদের সমাজের জন্য অপ্রয়োজনীয় বোঝা হিসেবে ভাবতে শুরু করেন যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মায়ের উপার্জন ক্ষমতা কমে যায়। তারা আর সংসারের খরচ চালাতে পারেন না। ফলে অনেক সময় সন্তানরা মনে করে তারা শুধু বোঝা। অর্থনৈতিক চাপে পড়ে বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো হয়। আধুনিক শহুরে জীবনে সন্তানরা চাকরি, ব্যবসা বা পড়াশোনায় এতটাই ব্যস্ত থাকে যে বাবা-মায়ের জন্য সময় বের করতে পারে না। সংসারে প্রবীণদের যত্ন নেয়া অনেকের কাছে বাড়তি দায় হয়ে দাঁড়ায়। তাই বৃদ্ধাশ্রমকে সহজ সমাধান মনে হয়।
আগে যৌথ পরিবারে প্রবীণরা সবার ভালোবাসা ও যত্ন পেতেন। এখন নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির কারণে সেই সম্পর্ক দুর্বল হয়ে গেছে। ফলে বাবা-মা অবহেলিত হন এবং শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধাশ্রমে ঠাঁই পান। অনেক তরুণ-তরুণী মনে করেন, বৃদ্ধদের সঙ্গে থাকা মানে স্বাধীনতা হারানো। তাদের উপস্থিতি অনেক সময় পরিবারে ঝামেলা মনে হয়। এই মানসিকতার পরিবর্তনই মূলত বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়ার বড় কারণ।
অনেক সন্তান বিদেশে বা দূরের শহরে বসবাস করেন। বাবা-মাকে একা রেখে যাওয়ার পরিবর্তে তারা বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে যায়। সমাজে এখন প্রবীণদের সম্মান ও মর্যাদা অনেক ক্ষেত্রেই কমে গেছে। পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বা সামাজিক কাজে প্রবীণদের মতামত উপেক্ষা করা হয়। এতে তারা নিজেদের অপ্রয়োজনীয় মনে করেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মায়ের নানা শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেয়। চিকিৎসা খরচ, ওষুধপত্র ও সার্বক্ষণিক দেখভালের দায়িত্ব নিতে না পেরে সন্তানরা বৃদ্ধাশ্রমকে সহজ পথ হিসেবে বেছে নেয়।
প্রবীণদের সবচেয়ে বড় চাহিদা টাকা-পয়সা নয় বরং স্নেহ ও সময়। তাই পরিবারে বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ তৈরি করতে হবে। ছোটবেলা থেকে সন্তানদের শেখাতে হবে বৃদ্ধ বাবা-মা বোঝা নন, বরং আশীর্বাদ। আজ যারা বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে যাচ্ছে, কাল তারাও একই অবস্থায় পড়বে। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, গণমাধ্যমে ও সামাজিক প্রচারণায় প্রবীণদের যত্ন নেয়ার গুরুত্ব তুলে ধরা উচিত।
গ্রামের মসজিদ-মন্দির বা শহরের কমিউনিটি সেন্টারে প্রবীণদের জন্য নিয়মিত মিলনমেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা স্বাস্থ্যসেবা আয়োজন করা যেতে পারে। এতে তারা নিঃসঙ্গতা কাটিয়ে আবারও সমাজের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন। সন্তানদের মনে রাখতে হবে, বাবা-মা বোঝা নয়Ñ তারা জীবনভর আমাদের জন্য যা করেছেন, তার ঋণ শোধ করা যায় না। পরিবারে ছোটদের শেখাতে হবে প্রবীণদের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের গুরুত্ব।
বৃদ্ধাশ্রমে থাকা বাবা-মা আসলে শুধু একখণ্ড আশ্রয় চান না, তারা চান সন্তানের ভালোবাসা, যত্ন আর উপস্থিতি। অর্থ দিয়ে হয়তো সেবা কেনা যায়, কিন্তু স্নেহ পাওয়া যায় না। বৃদ্ধাশ্রমের দেয়ালে আটকে থাকা নিঃশব্দ কান্না আমাদের পরিবার ও সমাজের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। মনে রাখতে হবে, আজ যারা বৃদ্ধাশ্রমে একাকিত্ব বয়ে বেড়াচ্ছেন, কাল হয়তো আমরাই সেই জায়গায় দাঁড়াব। জীবনভর যারা আমাদের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, তারা চাইবেন শেষ বয়সে মানসিক শান্তি ও পরিবারের কাছে থাকা। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি দেখলে বোঝা যায় অসংখ্য প্রবীণরা নিঃসঙ্গতার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন, যা মানবিক ও সামাজিকভাবে এক বিশাল ব্যর্থতা।
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post