ইমতিয়াজ আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ : দ্রুত এগিয়ে চলেছে নারায়ণগঞ্জে কদমরসুল সেতুর কাজ। এর মধ্যে সেতুর দ্বিমুখী ওসেল (ওস্টারবাগ সেল) স্ট্যাটিক লোড পরীক্ষা শুরু হয়েছে। নদীর বুকে দাঁড়িয়ে থাকা কংক্রিটের পিলারগুলো যেন আলাদা করে জানান দিচ্ছে, এখানে শুধু আরেকটি সেতু নয়, পরীক্ষিত হচ্ছে দেশের অবকাঠামো নির্মাণে এক নতুন প্রকৌশল পদ্ধতি। সেতুটি বাস্তবায়িত হলে শিল্পাঞ্চল ও বন্দরে ব্যবসা বাড়বে। কর্মসংস্থানেও গতি আসবে, এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলাবাসীর বহুদিনের স্বপ্ন কদমরসুল সেতু নির্মাণ প্রকল্পে এবার শুরু হয়েছে দ্বি-মুখী ওসেল স্ট্যাটিক লোড পরীক্ষা। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এই পরীক্ষার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো দেশে বড় পরিসরে একটি আধুনিক ফাউন্ডেশন টেস্টিং পদ্ধতি প্রয়োগ করছে।
সাধারণভাবে বাংলাদেশের সেতু নির্মাণে পাইল ফাউন্ডেশনের সক্ষমতা যাচাই করতে যে লোড টেস্ট করা হয়, তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ওপরের দিক থেকে চাপ প্রয়োগ করে। এতে পরীক্ষার জন্য বড় আকারের রিঅ্যাকশন ফ্রেম, ভারী লোড এবং দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়। কিন্তু ওসেল স্ট্যাটিক লোড টেস্ট ভিন্ন। এই পদ্ধতিতে পাইলের ভেতরে স্থাপন করা একটি হাইড্রোলিক সেল নিচের দিকে এবং ওপরের দিকে একযোগে চাপ প্রয়োগ করে, ফলে পাইলের প্রকৃত বহনক্ষমতা অনেক বেশি নির্ভুলভাবে নির্ণয় করা যায়।
এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (মাননিয়ন্ত্রণ) মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, এই প্রকল্পে আমরা শুধু একটি সেতু নির্মাণ করছি না, আমরা একটি মানদণ্ড স্থাপন করতে চাই। ওসেল পদ্ধতিতে পাইলের স্কিন ফ্রিকশন ও এন্ড বেয়ারিং আলাদাভাবে জানা যায়, যা ভবিষ্যতের ডিজাইনকে আরও নিরাপদ ও অর্থনৈতিক করবে।
শীতলক্ষ্যা নদী শুধু একটি নদী নয়, এটি একটি জটিল ভূতাত্ত্বিক অঞ্চল। নদীর তলদেশে রয়েছে নরম পলিমাটি, বালু ও সিল্টের স্তর, যা বড় স্প্যানের সেতুর জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। কদমরসুল সেতুর দৈর্ঘ্য প্রায় ১ হাজার ৩৮৫ মিটার, যার প্রতিটি পিলারের ফাউন্ডেশন ডিজাইন করতে হয়েছে গভীর বিশ্লেষণের মাধ্যমে।
এলজিইডির ব্রিজ ডিজাইনার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী গোলাম মাওলা জানান, এখানে পাইলের দৈর্ঘ্য ও ব্যাস নির্ধারণে শুধু কোড অনুসরণ করলেই চলত না। নদীর প্রবাহ, স্কাওয়ার ডেপথ, ভবিষ্যৎ নাব্যতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবÑসবকিছু বিবেচনায় নিতে হয়েছে। ওসেল টেস্ট আমাদের সেই ডিজাইন যাচাইয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।
বুধবার বিকালে বন্দর এলাকায় ওসেল স্ট্যাটিক লোড পরীক্ষার কাজ সরেজমিনে পরিদর্শন করেন এলজিইডি সদর দপ্তরের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তাদের সঙ্গে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও বন্দর উপজেলার প্রকৌশলী, প্রকল্প পরিচালক, কনসালট্যান্ট এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিরা।
পরিদর্শনকালে দেখা যায়, পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত পাইলের ভেতরে বসানো হয়েছে বিশেষ হাইড্রোলিক সেল। ধাপে ধাপে চাপ প্রয়োগ করে ডিজিটাল সেন্সরের মাধ্যমে রেকর্ড করা হচ্ছে পাইলের ডিফরমেশন ও সেটেলমেন্ট। এই ডেটা বিশ্লেষণ করেই চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ হবে পাইলের অনুমোদিত লোড।
এলজিইডির যশোর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী তারিকুল জামান বলেন, এই পদ্ধতিতে মাঠপর্যায়ের কাজ অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে কোনো ছাড় নেই। এতে সময় একটু বেশি লাগলেও ভবিষ্যতে ঝুঁকি অনেক কমে যাবে।
কদমরসুল সেতু প্রকল্পের ইতিহাসও কম জটিল নয়। ২০১৭ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রকল্প যাচাই কমিটির সভায় প্রথম এই সেতুর পরিকল্পনা গৃহীত হয়। ২০১৮ সালে একনেক সভায় ৫৯০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্প অনুমোদন পায়। কিন্তু ভূমি জটিলতা, নকশা পরিবর্তন ও প্রশাসনিক ধীরগতির কারণে নির্মাণকাজ শুরু হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালে সংশোধিত প্রস্তাবের মাধ্যমে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকৌশলীরা বলছেন, এই বাড়তি ব্যয়ের একটি বড় অংশ যাচ্ছে উন্নত ফাউন্ডেশন ডিজাইন, মাননিয়ন্ত্রণ ও আধুনিক পরীক্ষাপদ্ধতির পেছনে।
বন্দর ও নারায়ণগঞ্জ সদর-এই দুই অংশের মানুষের জন্য কদমরসুল সেতু কেবল একটি যোগাযোগ অবকাঠামো নয়, এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রতীক। প্রতিদিন হাজারো মানুষ নৌকা ও ফেরির ওপর নির্ভর করে শীতলক্ষ্যা পারাপার হন। সেতু নির্মিত হলে শিল্পাঞ্চল, বন্দর, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের গতি বাড়বেÑএমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
বন্দর উপজেলার এক বাসিন্দা বলেন, আমরা শুধু চাই সেতুটা হোক, কিন্তু যেন টেকসই হয়। আগের মতো তড়িঘড়ি করে কাজ করলে পরে ভোগান্তি বাড়ে। এলজিইডি কর্মকর্তারা বলছেন, কদমরসুল সেতু প্রকল্পে ওসেল স্ট্যাটিক লোড টেস্ট চালু করা মানে ভবিষ্যতের সেতু নির্মাণে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা। এতে শুধু একটি প্রকল্পের মান বাড়বে না, বরং দেশের অবকাঠামো খাতে আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ব্যবহারের পথ প্রশস্ত হবে।
ওসেল স্ট্যাটিক লোড পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণের পরই চূড়ান্ত ফাউন্ডেশন ডিজাইন অনুমোদন পাবে। এরপর শুরু হবে পূর্ণমাত্রায় পাইলিং ও সুপারস্ট্রাকচার নির্মাণের কাজ। প্রকৌশলীদের আশা, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কদমরসুল সেতু শীতলক্ষ্যার বুকে দাঁড়িয়ে যাবে একটি নিরাপদ ও টেকসই যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে।
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post