নিজস্ব প্রতিবেদক : অস্বাস্থ্যকর ও ভেজাল খাদ্যে সয়লাব দেশ। নীরব বিষক্রিয়ায় রীতিমতো জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষ। ফুটপাতের দোকান থেকে নামিদামি রেস্টুরেন্টÑসর্বত্রই ভেজাল খাবারের সমারোহ। চাল, ডাল, আটা-ময়দা ও মসলাজাতীয় পণ্যে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশানো হচ্ছে। বিষাক্ত কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো হচ্ছে প্রায় সব ধরনের ফল। মাছ-মাংস অধিক সময় তাজা রাখতে মেশানো হচ্ছে বিষাক্ত ফরমালিন।
অপরদিকে খাবার আকর্ষণীয় দেখাতে ফুডগ্রেড কালারের পরিবর্তে মেশানো হচ্ছে কাপড়ে ব্যবহারের রং। ভয়ংকর তথ্য হচ্ছে, শিশুখাদ্য ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধেও দেওয়া হচ্ছে ভেজাল উপাদান। মাঠের কৃষিপণ্যে ছিটানো কীটনাশক খাবারের মাধ্যমে ঢুকছে পেটে। ফলে বিপন্ন হচ্ছে জনজীবন। বাড়ছে ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের জটিল রোগ। আর এসব জেনেও নির্বিকার প্রশাসন।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজির হোসাইন শেয়ার বিজকে বলেন, খাদ্যে ভেজাল সারা বছরের ন্যায় পবিত্র রমজান মাসেও অসাধু ব্যবসায়ীরা অব্যাহত রাখে। যদিও রমজান মুসলিমদের জন্য নাজাতের মাস। আর এ সময় অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফা নেওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। কারণ কম বিনিয়োগে তারা বেশি মুনাফা করতে চায়। এছাড়া রমজান শুরুর সপ্তাহ খানেক পূর্বে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং নির্বাচন পরবর্তী নবগঠিত সরকার বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা যথাযথভাবে দেখাতে পারেনি। খাদ্যে বিষ ও ভেজাল রোধে সরকার ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৫, নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ প্রণয়ন করেছে, এমনকি ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনেও খাদ্যে ভেজাল দেওয়া ও বিক্রির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় সাধারণ জনগণ সুফল পাচ্ছে না।
অন্যদিকে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) এক গবেষণায় আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, সারা দেশ থেকে সংগৃহীত খাদ্য নমুনার ৫২ শতাংশ দূষিত। প্রতিষ্ঠানটির ল্যাবে ৮২টি খাদ্যপণ্য পরীক্ষার পর দেখা যায়, গড়ে ৪০ শতাংশ খাদ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহনীয় মাত্রার চেয়ে ৩ থেকে ২০ গুণ বেশি নিষিদ্ধ ডিডিটি ও অন্যান্য বিষাক্ত উপাদান পাওয়া গেছে। এছাড়া ৩৫ শতাংশ ফল ও ৫০ শতাংশ শাকসবজির নমুনায় বিভিন্ন কীটনাশকের উপস্থিতি ধরা পড়ে। চালের ১৩টি নমুনায় অতিমাত্রায় বিষাক্ত আর্সেনিক ও পাঁচটিতে ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। হলুদের গুঁড়ার ৩০টি নমুনায় সিসা ও অন্যান্য ভারী ধাতু, লবণে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০-৫০ গুণ বেশি সিসা পাওয়া গেছে। এমনকি মাছ ও মুরগিতেও মিলেছে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের অস্তিত্ব। সাম্প্রতি ফুড গ্রেডের নামে খাবারে কাপড়ের রং ব্যবহার করায় রাজধানীর বেইলি রোডের ‘কাচ্চি ভাই’ রেস্টুরেন্টকে জরিমানা করেছিল জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। প্রতিষ্ঠানটিতে অভিযান চালিয়ে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন অধিদপ্তরের ঢাকা কার্যালয়ের অফিস প্রধান সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল জব্বার মন্ডল ও সহকারি পরিচালক তাহমিনা বেগম। অভিযানের খবরে কাপড়ে ব্যবহারের রঙের জার ময়লার ডাস্টবিনে ফেলে দেন রেস্টুরেন্টের একজন কর্মকর্তা। সেটি দেখে ফেলেন ভোক্তা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা। সসের জারের মধ্যে রাখা হয় এসব রং। ডাস্টবিন থেকে ফেলে দেওয়া রঙের জার বের করে আনেন ভোক্তা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা। এরপর ‘কাচ্চি ভাই’ রেস্টুরেন্টের দায়িত্বে থাকা ম্যানেজার এটাকে ‘ফুড গ্রেড’ রং হিসেবে দাবি করলেও পরে নিজ মুখে স্বীকার করেন, এগুলো কাপড়ে ব্যবহারের রং, যা ফুড গ্রেড বলে ক্রেতাদের খাইয়ে আসছিলেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতিবছর বিশ্বের প্রায় ৬০ কোটি মানুষ ভেজাল ও দূষিত খাদ্য গ্রহণের কারণে অসুস্থ হয়। এর মধ্যে মারা যায় ৪ লাখ ৪২ হাজার মানুষ। এছাড়া দূষিত খাদ্য গ্রহণের কারণে পাঁচ বছরের কম বয়সে আক্রান্ত ৪৩ শতাংশ শিশুর মধ্যে মৃত্যুবরণ করে ১ লাখ ২৫ হাজার।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে প্রতিবছর দেশে ৩ লাখ লোক ক্যানসারে, ২ লাখ কিডনি রোগে, দেড় লাখ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. জাকারিয়া শেয়ার বিজকে বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি। নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। আমাদের বেশ কিছু সংকট আছে। প্রতি জেলায় মাত্র একজন কর্মকর্তা রয়েছেন। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ল্যাবরেটরি না থাকায় বাইরে থেকে নমুনা পরীক্ষা করাতে হয়। এসব ল্যাবরেটরির সক্ষমতা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। এর সমাধানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনায় ল্যাব স্থাপনের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এগুলো চালু হলে কার্যক্রম আরও জোরদার হবে।
সম্প্রতি চুয়াডাঙ্গা শহরতলির বঙ্গজপাড়ায় ‘মৌসুমী ফুড’-এর কারখানায় অভিযান পরিচালনা করে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। অভিযানে দেখা যায়, বেকারিতে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরির জন্য রাখা হয়েছে ডালডা। সেই ডালডার মধ্যে মরে ভাসছিল ইঁদুর। এ ডালডা দিয়েই তৈরি হচ্ছিল নানা রকমের মুখরোচক খাবার। শহরের রেলবাজার এলাকার ‘অনন্যা ফুড’ থেকে জব্দ করা হয় বিপুল পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্য, যা বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছিল।
গত বছর হাইকোর্টের নির্দেশে লবণ, হলুদ, গুঁড়া মরিচ, কারি পাউডার, সরিষার তেল, বোতলজাত পানি, মাখন, আটা, ময়দা, নুডলস ও বিস্কুটের ৪০৬টি নমুনা পরীক্ষা করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে বিএসটিআই। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ৪৬টি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের ৭৪টি পণ্য নিম্নমানের। আদালত এসব পণ্য বাজার থেকে অপসারণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। জাতীয় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটও ২০১৮ সালে সারাদেশে ৪৩টি ভোগ্যপণ্যের ৫ হাজার ৩৯৬টি নমুনা পরীক্ষা করে। ল্যাবরেটরীতে পরীক্ষার পর এই ৪৩ পণ্যেই ভেজাল পাওয়া গেছে।
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post