শেখ মোহাম্মদ রতন, মুন্সীগঞ্জ : মুন্সীগঞ্জের হিমাগারগুলোয় আলু সংরক্ষণ করে লোকসানের মুখে পড়েছেন মুন্সীগঞ্জের কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। আলু উৎপাদন থেকে সংরক্ষণ পর্যন্ত ২৬-২৮ টাকা খরচ। সেখানে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিতে মাত্র আট টাকা দরে। এর মধ্যে হিমাগারভাড়া ও শ্রমিক খরচ দিয়ে কৃষক ও মজুত ব্যবসায়ীরা পাচ্ছেন মাত্র ৫২ থেকে ৬৮ পয়সা।
জেলার বেশ কয়েকজন আলুচাষি ও ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ বছর আলুর বীজ, সার ও জমিভাড়া অন্য বছরের তুলনায় দ্বিগুণের কাছাকাছি। আলু উৎপাদন করতেই কৃষকের ১৭-১৯ টাকা খরচ হয়েছে। এছাড়া হিমাগারে রাখার উপযোগী করতে বস্তা, পরিবহন, শ্রমিকদের মজুরিসহ প্রতি কেজিতে খরচ তিন টাকা। এর সঙ্গে হিমাগার ভাড়া কেজিতে আরও ছয় টাকা। অর্থাৎ হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করা পর্যন্ত প্রতি কেজিতে মোট ২৬ থেকে ২৮ টাকা খরচ হয়েছে। কয়েক দিন ধরে হিমাগারে পাইকারিতে মাত্র আট টাকা কেজি দরে আলু বেচাকেনা হচ্ছে।
মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার চরকেওয়ার ইউনিয়নের হামিদপুর এলাকার বাসিন্দা সাহারা বেগম। তার বাবা-দাদারা কৃষক ছিলেন। বংশ পরম্পরায় আলু চাষ ছিল তাদের প্রধান পেশা। বিয়ের পর স্বামীর সংসারে এসেও দেখেছেন আলুর আবাদ। গত মৌসুমে আলু চাষের আগে তার স্বামী স্ট্রোক করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হন। সে সময় তিনি তার দুই ছেলে ও কৃষি শ্রমিকদের নিয়ে তিন একর ২০ শতাংশ জমিতে আলুর আবাদ করেন।
সাহারা বেগম বলেন, আমাদের অন্য কাজ জানা নেই। টিকে থাকা ও তিন ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালিয়ে রাখতে নিজেই আলু চাষের উদ্যোগী নিই। প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা ধার দেনা করে চাষ করেছি। জমি থেকে পৌনে সাতশ বস্তা (৫০ কেজির বস্তা) আলু পাই। মৌসুমের শুরুতেই আলুর দাম কম থাকায় তাতে খরচ উঠছিল না। লাভের আশায় সব আলু হিমাগারে রেখে ছিলাম। এখনো কেউ দামই জিজ্ঞেস করে না।
মুন্সীগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ জেলায় ৩৪ হাজার ৭৫৮ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়। এতে উৎপাদন হয় ১০ লাখ ৮২ হাজার ৫৩৮ মেট্রিক টনের বেশি আলু। আলু সংরক্ষণের জন্য জেলায় ৬১টি হিমাগার রয়েছে। এ বছর স্থানীয় উৎপাদিত আলুসহ রংপুর, কুড়িগ্রাম ও দিনাজপুরের কয়েকটি এলাকা থেকে আলু সংগ্রহ করেন ব্যবসায়ীরা। কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ৫ লাখ ২৩ হাজার ৩৩৫ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করেন।
গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত হিমাগারগুলোতে আলুর মজুত ছিল ২ লাখ ৮৭ হাজার ৪৯০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার ৪৬৫ মেট্রিক টন খাওয়ার আলু এবং ৯৭ হাজার ২৫ মেট্রিক টন বীজ আলু রয়েছে, যেখানে গত বছর এ সময় ছিল বীজ ও খাবার আলু ছিল মাত্র ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৮৭ মেট্রিক টন।
মুন্সীগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. হাবিবুর রহমান বলেন, আলু চাষ এ জেলার কৃষকদের আবেগ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে। লোকসান হলেও এ জেলার মানুষ আলুর উৎপাদন করে। আলুর উৎপাদন মৌসুম থেকেই দাম কম ছিল। এ অবস্থায় সরকার ২২ টাকা কেজি ধরে আলু কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেটি করা গেলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে পারবেন। সরকার সে চেষ্টা এখনো চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের এ দুরবস্থা থেকে উত্তরনের জন্য বিদেশে আলু রপ্তানির উদ্যোগ নিতে হবে। জেলায় আলু ভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে হবে।
গতকাল রোববার সরেজমিনে মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুরে এলাইড কোল্ডস্টোরেজ, বিক্রমপুর মাল্টিপারপাস, দেওয়ান কোল্ডস্টোরে ও কদমরসূল কোল্ডস্টোরেজগুলোয় ঘুরে দেখা যায়, হিমাগারগুলোয় কর্মচাঞ্চল্য তেমন নেই। এসব হিমাগারে শেডে হাতেগোনা কিছু শ্রমিক আলু বাছাই করছেন।
দেওয়ান কোল্ডস্টোরেজে বাদশা মিয়া নামে এক কৃষক জানান, এ হিমাগারে তাদের ৫০০ বস্তা আলু আছে। ৫০ কেজির বস্তা শেডে বাছাই করলে ৪৮ কেজি আলু পাওয়া যায়। সে আলু ৮ টাকা কেজি ধরে ৩৮৪ টাকা বস্তা বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে হিমাগার ভাড়া ৩০০ টাকা। শ্রমিক খরচ কেজিতে আরও এক টাকা। এক বস্তা আলু বিক্রি করলে পাওয়া যাচ্ছে ৩৪ টাকা। তাই হিমাগারের আলু হিমাগারেই ফেলে চলে যাচ্ছি।
বিক্রমপুর মাল্টিপারপাস হিমাগারে ফজর আলী নামের এক আলু ব্যবসায়ী বলেন, গত ৪ দিন আগে ১০ টাকা কেজি ধরে ৬ হাজার বস্তা আলু কিনেছি। এখন দাম কমে ৮ টাকা কেজি হয়েছে। মাত্র চার দিনের ব্যবধানে বর্তমান হিসেবে ছয় লাখ টাকা শেষ। দাম আরো কমলে অথবা বিক্রি করতে না পারলে মরতে হবে। ২২ টাকার ঘোষণা দিয়েও আলু কেনেনি সরকার।
আলু ব্যবসায়ী বাবুল পাইক বলেন, সরকারি ঘোষণার পর হিমাগারে বেশ কিছুদিন আলু বিক্রি বন্ধ ছিল। দাম বাড়ার আশায় আবার অনেকে ১৩-১৪ টাকা দরে আলুও কিনে ছিল। প্রায় দুমাস এ অবস্থায় ছিল। শেষ পর্যন্ত সরকার আলু না কেনায় এখন কৃষক-ব্যবসায়ী সবাই বেকায়দায় পড়েছে। সরকারের এমন ছলচাতুরীতে শত শত কোটি টাকা লোকসানের মুখে কৃষকরা। হিমাগারে যে পরিমাণ আলু এখনও মজুত আছে, সেগুলো আট টাকা দামে বিক্রি করেও শেষ করা যাবে না।
মুন্সীগঞ্জ কৃষি বিপণন কর্মকর্তা এবিএম মিজানুল হক বলেন, সরকার ২২ টাকা কেজি দরে হিমাগার থেকে আলু কেনার ঘোষণা দিলেও মুন্সীগঞ্জের হিমাগারগুলো থেকে কোনো আলু কেনেনি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কেউ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগও করেনি। তাই বর্তমানে আলু নিয়ে বিপদে আছেন জেলার কৃষকরা। দিন যত যাচ্ছে ততই দাম কমছে। আগামী মাসে উত্তরাঞ্চলের জেলায় চাষ করা আগাম জাতের নতুন আলু বাজারে আসতে শুরু করবে। তাতে পুরোনো আলুর চাহিদা আরও কমবে।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post