নূর হোসেন মামুন, চট্টগ্রাম : দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র মাহে রমজান। সিয়াম সাধনার এই মাসটি সাধারণত সংযম ও প্রশান্তির বার্তা নিয়ে আসে। কিন্তু বাস্তবে দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে বইছে অস্থিরতার হাওয়া। পর্যাপ্ত আমদানি ও রেকর্ড পরিমাণ মজুত থাকা সত্ত্বেও স্বস্তি পাচ্ছেন না সাধারণ ভোক্তারা। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে রমজান-সংশ্লিষ্ট প্রায় সব পণ্য লেবু থেকে খেজুর, চিনি থেকে ডালÑসবকিছুর দাম বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। পাইকারি থেকে খুচরা সব বাজারেই একই চিত্র। আমদানির জোয়ার থাকা সত্ত্বেও বাজারের এই ‘তুঘলকি কাণ্ড’ নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস বাড়িয়ে তুলছে। ক্রেতাদের অভিযোগÑবাজার তদারকির ঘাটতির সুযোগেই এই মূল্যবৃদ্ধি। ভোট উৎসব শেষে রমজানকে ঘিরে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্বস্তি আরও স্পষ্ট হয়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে খেজুরের দাম কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। পাশাপাশি চিনি, ছোলা ও ডালের দামও ঊর্ধ্বমুখী।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বন্দর ধর্মঘটের কারণে সময়মতো পণ্য খালাস না হওয়া এবং নির্বাচনের ছুটিতে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহে সাময়িক ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যদিও তাদের দাবিÑচাহিদার তুলনায় বাজারে পণ্যের মজুত যথেষ্ট রয়েছে।
রমজানের সময় বাজারে চাহিদার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে চাল, গম, ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, ছোলা এবং খেজুর। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা যায়, শুধু এই মাসে সয়াবিন তেলের চাহিদা থাকে প্রায় ৩ লাখ টন। একই সঙ্গে চিনির চাহিদা ৩ লাখ টন, পেঁয়াজ ৫ লাখ টন, ছোলা ১ লাখ ৫০ থেকে ২ লাখ টন এবং খেজুর ৬০ থেকে ৮০ হাজার টনের মধ্যে রয়েছে। চালের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও কিছু ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত চিনিগুঁড়া চাল কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ১৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে লিটারপ্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ আছে। ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৯০-২০০ টাকা এবং সোনালি ৩২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচামরিচ ১৬০-১৭০ টাকা কেজি। শসা ও বেগুনসহ ইফতারের উপকরণেও বাড়তি দাম লক্ষ করা গেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের শেষ চার মাসে ২ লাখ ২৫ হাজার টন পেঁয়াজ, ৩ লাখ ৭০ হাজার টন চিনি, ৪৭ হাজার টন খেজুর, ২ লাখ ৫ হাজার টন মসুর ডাল, প্রায় ৪ লাখ টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল এবং ১৪ লাখ টন গম আমদানি হয়েছে। এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, এসব পণ্যের আমদানি গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বাজারে আমদানি চাহিদার চেয়ে প্রায় ২৮ শতাংশ বেশি ছোলা আমদানি হয়েছে।
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ, রিয়াজুদ্দিন বাজার ও চকবাজারে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এক সপ্তাহের ব্যবধানে খেজুরের দাম কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেড়েছে। গত ডিসেম্বরে খেজুর আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ কমানো সত্ত্বেও দাম কমেনি। বিশেষ করে যেসব খেজুর মূলত নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ক্রেতারা বেশি কেনেন, সেগুলোর মূল্য বেড়েছে। বস্তা খেজুর বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ২২০ টাকায়, জাহিদি খেজুর ২৬০ থেকে ২৮০ টাকায়, দাবাস ৫৫০ থেকে ৫৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য খেজুরের দামও কিছুটা বেড়েছে, যেমন- বড়ই খেজুর ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকায়, কালমি ৭০০ টাকায়, সুক্কারি ৮০০ টাকায়, মাবরুম ৮৫০ থেকে ১২০০ টাকায়, মরিয়ম ১১০০ থেকে ১৪০০ টাকায় এবং মেডজুল ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এ বিষয়ে রিয়াজুদ্দিন বাজারের পাইকারি ও খুচরা খেজুর বিক্রেতা মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘হঠাৎ করে জাহিদি খেজুর ১০ কেজির প্যাকেটে ৬০০ টাকা বেড়েছে। দাবাসে বেড়েছে ৪০০ টাকা। বন্দরে খেজুর আটকে ছিল, এ কারণে সরবরাহ কমে গেছে।’
চকবাজারের খেজুরের ক্রেতা আলাউদ্দিন হাসান বলেন, ‘রমজান উপলক্ষে নয়, আমি নিয়মিত খেজুর কিনি। কিন্তু এখন কেজিতে ৬০ টাকা বেড়েছে। ভোট দিতে বাড়ি গিয়েছিলাম। তাই আজ একসঙ্গে রমজানের বাজার করতে এসেছি।’
চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল আলম জানান, ‘জাহেদি খেজুর চাহিদার তুলনায় বাজারে সংকট রয়েছে। কিছুদিন আগে যে জাহাজটি ডুবে গিয়েছিল, সেখানে কিছু খেজুর ছিল। এছাড়া শুল্ক কমার আশায় দেশীয় আমদানিকারকরা অনেক দিন আমদানি করেননি। ফলে চাহিদা অনুযায়ী খেজুর আমদানি সম্ভব হয়নি। তবে বাজারে সামগ্রিক সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।’
এদিকে সপ্তাহখানেকের ব্যবধানে পেঁয়াজ কেজিতে ১০ টাকা, চিনি ৮ থেকে ১০ টাকা, খেসারির ডাল ১০ টাকা, রসুন ২০ টাকা এবং ছোলা মানভেদে ৪ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে চিনি কেজি ১০০ টাকা, পেঁয়াজ ৬০ টাকা, দেশি রসুন ১২০ টাকা, দেশি মসুর ডাল ১৬০ টাকা এবং ছোলা ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন জানান, ‘বর্তমানে বাজারে ছোলা, মটর ও খেজুরসহ রমজান-সংশ্লিষ্ট পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রয়েছে। বিশেষ করে ছোলার বাজারে আমদানির আধিক্য থাকায় গত বছরের তুলনায় এবার দাম অনেকটাই কম।’ তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক নির্বাচনের ডামাডোলে বাজার মনিটরিং কিছুটা শিথিল ছিল। এর সুযোগ নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বাজারের অস্থিরতার পেছনে প্রশাসনিক তদারকির অভাবকে দায়ী করেছেন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, ‘প্রশাসনের বাজার মনিটরিং বা পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। মূলত ক্ষমতার এই ট্রানজিট পিরিয়ডে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের স্থবিরতা কাজ করছে। প্রশাসনিক ব্যবস্থা না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিয়ে ইচ্ছেমতো পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন। এতে সাধারণ ক্রেতারা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে।’
সোমবার বন্দর নগরের কয়েকটি খুচরা ও পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা যায়, রমজানের পণ্য কিনতে দোকানে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে। নির্বাচন উপলক্ষে বাজার অনেকটাই ক্রেতাশূন্য ছিল। তবে সাম্প্রতিক কয়েক দিনের চাপ একসঙ্গে পড়তে শুরু করেছে। ক্রেতারা খেজুরসহ অন্যান্য পণ্য কিনছেন।
ক্রেতারা বলেন, ভোট-পরবর্তী সময়ে নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকে অনেক বেশি। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। আশ্বাস নয় বরং বাজারে প্রশাসনের দৃশ্যমান অভিযান প্রয়োজন। রমজানের শুরুতেই যদি পণ্যের দাম এভাবে বাড়তে থাকে, তবে আমাদের জন্য রোজা রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
তবে অনেক ক্রেতাই আশঙ্কা করছেন, প্রশাসনিক পরিবর্তনের সময় রমজান শুরু হওয়ায় বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। কেজিতে ৫-১০ টাকা বৃদ্ধি মানে মাসিক খরচে বড় চাপ।
চকবাজারের মুদি বিক্রেতা মো. রাজু আহমেদ বলেন, ‘কয়েক দিন ক্রেতার চাপ ছিল না। তবে আজ সকাল থেকেই রমজানের পণ্য কিনতে ক্রেতারা আসছেন। দ্রব্যমূল্য তুলনামূলক স্থিতিশীল। কয়েক দিন ব্যবসা কম হয়েছে, তবে আশা করছি তা পুষিয়ে নেওয়া যাবে।’
সরকারি হিসাবে আমদানি পর্যাপ্ত থাকলেও বাজারে সেই স্বস্তি মিলছে না। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছে, আমদানি ও খুচরা বাজারের দামের মধ্যে সময়গত ব্যবধান, সরবরাহ শৃঙ্খলের খরচ এবং তদারকির ঘাটতিÑএই তিন কারণেই মূলত অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post