আসাদুজ্জামান রাসেল, রাজশাহী : রাজশাহী জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্রঋণ দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হলেও, বাস্তবে এর বড় একটি অংশ উৎপাদনমুখী খাতে ব্যবহার না হয়ে চলে যাচ্ছে পারিবারিক ব্যয় ও পুরোনো ঋণ শোধে। ফলে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও থানা এলাকায় তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের ঋণচক্র।
মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, একই ব্যক্তি বা পরিবার একাধিক এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে আবার নতুন ঋণ নিচ্ছেন। এতে কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় বিনিয়োগের বদলে বাড়ছে আর্থিক চাপ।
রাজশাহী জেলার পবা, গোদাগাড়ী, তানোর, মোহনপুর, বাগমারা, দুর্গাপুর, পুঠিয়া, চারঘাট ও বাঘা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিম্নআয়ের অনেক পরিবার একই সময়ে তিন থেকে চারটি ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। কিস্তি পরিশোধের চাপ সামাল দিতে গিয়ে অনেকেই নতুন ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে উৎপাদন বাড়ানোর বদলে ঋণের বোঝা বেড়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।
এদিকে সরকারি ও গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী অঞ্চলে ক্ষুদ্রঋণের অর্থনৈতিক পরিমাণ এখন হাজার কোটি টাকার ওপরে। বাংলাদেশের মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (গজঅ) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ-প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা (বার্ষিক) আর সক্রিয় ঋণগ্রহীতা-প্রায় ৪ কোটির বেশি মানুষ।
পরিসংখ্যান মতে, উত্তরাঞ্চলকে ক্ষুদ্রঋণের অন্যতম বড় অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থনৈতিক পর্যালোচনা অনুযায়ী, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে কৃষি ও ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের বড় অংশ পরিচালনা করছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক-রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (জঅকটই) এবং বিভিন্ন এনজিও। জঅকটই-এর তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটি ১৬টি জেলায় কৃষি ও গ্রামীণ ঋণ বিতরণ করছে। এর ঋণগ্রহীতা কয়েক লাখ কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। এছাড়া গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, আশা, প্রগতি, পল্লী উন্নয়ন সংস্থাসহ কয়েক ডজন প্রতিষ্ঠান জেলার গ্রামগুলোয় ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
রাজশাহী শহরের বোয়ালিয়া, রাজপাড়া, শাহ মখদুম, মতিহার ও কাশিয়াডাঙ্গা থানার আশপাশের উপশহর ও উপকণ্ঠ এলাকাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। শহরের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর অনেকেই গ্রামভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়ে পড়ছেন। তাদের অনেকে জানান, মাসিক বা সাপ্তাহিক কিস্তি দিতে গিয়ে সংসারের ব্যয় এমনভাবে সংকুচিত করতে হচ্ছে তাতে মানুষের জীবন বলে মনে হয় না।
পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের এক কৃষক জানান, তিনি প্রথমে একটি এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন কৃষিকাজের জন্য। কিন্তু কৃষি উৎপাদনের খরচ ও সংসারের ব্যয় বাড়ায় তিনি আরেকটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হন। এখন প্রতি সপ্তাহে প্রায় তিন হাজার টাকা কিস্তি দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, এই কিস্তির টাকার কথা মনে হলে ঘুম হারাম হয়ে যায়! মনে হয় কিস্তি না নিয়ে ভালো ছিলাম। এখন মরতেও পারি না, আবার বাঁচতেও পারছি না!
গোদাগাড়ী উপজেলার কয়েকটি গ্রামে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একই পরিবারে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণগ্রহীতা। এতে পরিবারপ্রতি মোট ঋণের পরিমাণ অনেক ক্ষেত্রে এক থেকে দুই লাখ টাকায় পৌঁছেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, কৃষিজ আয়ের অনিশ্চয়তার কারণে অনেক পরিবার এই ঋণের বোঝা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
তানোর ও মোহনপুর উপজেলার গ্রামীণ বাজারগুলোয় কথা বলে জানা গেছে, ক্ষুদ্রঋণের একটি অংশ কৃষি বা ক্ষুদ্র ব্যবসায় বিনিয়োগ হলেও বড় অংশ চলে যাচ্ছে দৈনন্দিন ব্যয়, চিকিৎসা খরচ ও পুরোনো ঋণ শোধে। ফলে ঋণের মূল উদ্দেশ্য আয় বৃদ্ধি-সব সময় বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
বাগমারা উপজেলার কয়েকজন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য জানান, অনেক ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি তিন বা চারটি প্রতিষ্ঠানের সদস্য হয়ে পড়ছেন।
প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময়ের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় এই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজশাহী বিভাগে এই খাতের ঋণ বিতরণ কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ বিতরণ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর একটি বড় অংশ উত্তরাঞ্চলে কেন্দ্রীভূত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থনৈতিক পর্যালোচনা প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্রঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও ঋণের ব্যবহার সঠিক খাতে হচ্ছে কি না-তা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। বিশেষ করে কৃষি উৎপাদন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়নে এই ঋণের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের কয়েকজন গবেষক বলেন, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের ইতিবাচক দিক যেমন রয়েছে, তেমনি কিছু কাঠামোগত সমস্যাও আছে। অনেক ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতারা পর্যাপ্ত ব্যবসায়িক প্রশিক্ষণ বা বাজার সুবিধা না পাওয়ায় ঋণের টাকা আয় বৃদ্ধির খাতে ব্যবহার করতে পারেন না।
তাদের মতে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে শুধু ঋণ বিতরণ করলেই হবে না; বরং উৎপাদনমুখী বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি, বাজার সংযোগ এবং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে।
রাজশাহীর চারঘাট ও বাঘা উপজেলার কয়েকটি কৃষক সংগঠনের প্রতিনিধিরা বলেন, কৃষি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো গেলে ক্ষুদ্রঋণের টাকা আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। বর্তমানে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে ঋণের একটি অংশ অন্য খাতে ব্যয় করছেন।
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম মূলত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তবে একই ব্যক্তি একাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিচ্ছেন কি না-এই বিষয়টি নজরদারির জন্য কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত ডেটাবেজ প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি দারিদ্র্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এর কার্যকারিতা বাড়াতে সুদের হার, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং তথ্য বিনিময় ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে ঋণচক্রের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
রাজশাহীর বিভিন্ন থানা ও উপজেলার বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ক্ষুদ্রঋণ অনেক পরিবারকে সাময়িক আর্থিক সহায়তা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা টেকসই উন্নয়নের পথ তৈরি করতে পারছে কি না-তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ঋণ ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত নীতিমালা ও কার্যকর তদারকি ছাড়া গ্রামীণ অর্থনীতিতে এই চক্র ভাঙা কঠিন হবে।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post