মোশতাক আহমেদ : কেমন ফ্যাকাসে দেখাচ্ছিল তোমার ঠোঁট! অথচ এই প্রথমবার তোমার ভেতরে প্রাণের অভাব ছিল লক্ষণীয়। তোমাকে ঘিরে প্রেস ক্লাব রিপোর্টার্স ইউনিটিতে জটলা। কারও মুখে হাসি ছিল না মোটেই। কীভাবে থাকে বলো? একদিকে তোমার কীর্তিগাথার প্রকাশ, অন্যদিকে স্বজন হারানোর বেদনা। তোমাকে আমরা তরুণরা জানতাম না। নিজের জানা শোনা নিয়ে হাসি পায়, আন্তর্জাতিক পত্রিকায় নাকি তোমার রিপোর্ট ছাপা হতো! তুমি নাকি পাহাড়ে জীবন বাজি রেখে ঘুরে বেড়াতে সংবাদের খোঁজে।
সত্যিই বলতে ইচ্ছা হয়, আমরা গণমাধ্যমকর্মীরা খুবই আত্মকেন্দ্রিক। আমরা নিজেদের ছাড়া অন্যদের সম্পর্কে খুব বেশি খোঁজ রাখি না। সাধারণত কেউ চলে যাবার পরেই এসবের খোঁজ মেলে। আসলে বেঁচে থাকতে অন্যের ব্যাপারে আমরা সবাই কৃপণ। আর মৃত্যুর পর ভুলে যাওয়াটাও আমাদের স্বাভাবিক স্বভাব। তাই মনে থাকতে থাকতে ক্ষত ঢাকার কিছু চেষ্টা আর কি!
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সালিম সামাদ না ফেরার দেশে যান গতকাল ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রৌদ্রোজ্জ্বল এক সকালে। সত্য এবং ঠোঁটকাটা স্বভাবে তিনি ছিলেন স্বঃতস্ফূর্ত। হয়তো এ কারণে পছন্দের কাতারে সবাই তাকে সহজে নিতে পারতেন না। কিন্তু স্মৃতি হাতরে দেখুন তো, কখনও দেখা হলে বা কোনো অনুষ্ঠানে তার প্রাণবন্ত উপস্থিতির কথা। তাকে ভুলতে পারবেন কেউ? স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে কি তিনি সমুজ্জ্বল ছিলেন না?
সালিম সামাদের সঙ্গে অসুস্থতা মানানসই ছিল না মোটেই। জীবনের এতগুলো বছর প্রাণবন্ততা নিয়ে পার করে মাত্র অল্প কিছুদিন আগে পায়ের ব্যথা নিয়ে ফিজিওথেরাপি শুরু। এরপর হঠাৎ আবিষ্কার হলো ফিজিও সমস্যা নয়, নিউরনজনিত সমস্যায় পা নাড়াতে পারছেন না তিনি। টেস্টে ধরা পড়ল ব্রেনে টিউমার। পরবর্তী চিকিৎসা এবং টেস্টে জানা গেল মূলত ফুসফুসে ক্যান্সারের উৎপত্তি হয়ে সেটি ছড়িয়ে ব্রেন পর্যন্ত গিয়েছে এবং ক্যান্সার তখন চতুর্থ স্টেজে। অথচ একদমই টের পাননি তিনি। টের পাবেন কীভাবে? অসুস্থতা, বিমর্ষতা তো তার স্বভাবের সঙ্গেই যায় না। মৃত্যুর মাত্র দুদিন আগেও বিছানায় শুয়ে দর্শনার্থীদের সঙ্গে রসবোধ যেন তার জীবনানন্দকেই ফুটিয়ে তুলছিল। আর জীবদ্দশাতে তার ছোট ছোট দুষ্টুমি আর খুনসুটিগুলো কি মানবতার অংশ নয়?
সাংবাদিক কমিউনিটিতে বহু সাংবাদিক শেষ জীবনে যথার্থ সম্মান নিয়ে যেতে পারেন না বিভিন্ন কারণে। চলে গেলে তার কীর্তির সাময়িক প্রকাশ এবং আনুষ্ঠানিকতা যতটুকু করতে হয় আর কি! ফেসবুকে দুয়েকটি কমেন্ট আর ‘আহা রে আহা রে’ শব্দে আটকে থাকা! এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে বিভক্তির কথা তো বলাই বাহুল্য। অথচ সমাজের দর্পণ হিসেবে সাংবাদিকদের রয়েছে সম্পূর্ণ নিজস্বতা। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে রয়েছে নিজস্ব উজ্জ্বলতা। নিজের আসল পরিচয় ঢেকে করপোরেট কিংবা ব্যবসায়িক সংস্কৃতির প্রভাবেও সেই নিজস্বতা যেন দিন দিন ফিকে হয়ে আসছে। তবে এতকিছুর মাঝে এখনও যারা নিভু নিভু অবস্থায় জিইয়ে রেখেছেন সত্যের আগুন; সে আগুন জ্বলে উঠুক সব সাংবাদিকের মাঝে। নিজ পায়ে কুড়াল আর নয়। মৃত্যুর পরে নয়, জীবদ্দশাতেই একাত্ম হোক সাংবাদিক সমাজ।
মৃত্যুর পরে মান-অভিমান জিইয়ে রাখা যায় না। আচরণ কিংবা স্বার্থহীন সম্পর্কগুলোর নার্সিং তাই জীবদ্দশাতে করে নেওয়াই ভালো। সাংবাদিক মিনার মাহমুদ, কবি হেলাল হাফিজ চলে যাওয়ার পর কি বোঝা যায়নি সাংবাদিকতা বা লেখালেখিতে কী রতন ছিলেন তারা! তবে জীবদ্দশাতেই সম্পর্কোন্নয়ের পদক্ষেপ নয় কেন? কেন বেঁচে থাকতেই সাংবাদিক কমিউনিটিতে মানবিকতার বাঁধন আরও বাড়ানো যাবে না? এখনই কেন সৌহার্দ্যের সাগরে ভাসবেন না ক্লাব-ইউনিটির সিনিয়র দায়িত্বশীল বা সদস্যরা! আজ যিনি সিনিয়র সাংবাদিক; যারা শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে একসময় দাপিয়ে সংবাদ করতেন, বায়োলজিক্যালি যাদের বয়স ৬০, ৭০ কিংবা ততোধিক। তারাসহ যে কোনো বয়সের যে কোনো সাংবাদিক হয়তো আগামীকাল, ৫ বছর কিংবা ২৫ বছর পর মৃত্যুবরণ করবেন—এটিই তো চূড়ান্ত সত্য। তাহলে সম্পর্কের বোঝাপড়া কিংবা কীর্তির হিসাবগুলো কেন বেঁচে থাকতেই মিলিয়ে নেওয়া হয় না? কেন মৃত্যুর পর তার সম্পর্কিত তথ্য হাতড়ে বেড়ানো। মৃত্যুর পর একজন সাংবাদিকের তথ্য না পাওয়ার দায় পুরো কমিউনিটি কেন নেবে না?
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রোববার মাগরিবের পর মিরপুর-১১ জান্নাতুল মাওয়া কবরস্থানে যখন সালিম সামাদ ভাইকে মায়ের কবরে শায়িত করার আয়োজন চলছিল, তখন সেখানে উপস্থিত হাতেগোনা মাত্র কজন। সন্ধ্যার আকাশে তখন চাঁদ ছিল। কী আশ্চর্য! চাঁদের সাইনটি ছিল হাসিমুখের। ঠিক সালিম ভাইয়ের মতো। এলোমেলো ভাবনা আর ভারাক্রান্ত অনুভূতি সহসাই উধাও।
স-তে সাংবাদিক, স-তে সত্য। স-তে স্যালুট, সালিম সামাদ ভাই! জয় হোক সাংবাদিকতার।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post