শিক্ষা ডেস্ক: অধ্যাপক জামিল সাহেবের বয়স ৫৮। ঢাকা শহরের একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষক তিনি। চক-ডাস্টার, হোয়াইটবোর্ড আর ক্লাসভর্তি ছাত্রছাত্রীদের কোলাহলÑএ নিয়ে তার তিন দশকের শিক্ষকতাজীবন। কিন্তু ২০২০ সালের মার্চ মাসে তার এই চেনা পৃথিবীতে হঠাৎ যেন উল্কাপাত হলো। করোনা মহামারির কারণে বাধ্য হয়ে তাকে নামতে হলো ‘অনলাইন ক্লাস’ নামক এক অজানা যুদ্ধে।
সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও জামিল সাহেবের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। ল্যাপটপের পর্দার দিকে তাকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে গেছেন, ওপাশে ছাত্ররা কে শুনছে, কে ঘুমাচ্ছে, কার ইন্টারনেট চলে গেলÑকিছুই বোঝার উপায় ছিল না। কালো কালো বক্সের দিকে তাকিয়ে লেকচার দেওয়াটাকে তার কাছে মনে হতো ‘ভূতের সঙ্গে কথা বলা’। মাঝে মাঝেই স্ক্রিন আটকে যেত, ছাত্ররা বলত, ‘স্যার আপনার কথা শোনা যাচ্ছে না!’ এই পুরো ব্যবস্থাটার ওপর তার একধরনের বিতৃষ্ণা চলে এসেছে। মহামারি শেষে যখন ক্যাম্পাস আবার খুলল, তিনি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। এখন কেউ যদি তাকে ডিজিটাল এডুকেশন বা ‘হাইব্রিড লার্নিং’-এর কথা বলে, তিনি ভ্রু কুঁচকে বলেন, ‘ওসব ভাঁওতাবাজি। ক্লাসরুমে চোখের দিকে না তাকিয়ে কি আর পড়াশোনা হয়!’
অধ্যাপক জামিল আমাদের দেশের অনেক প্রবীণ শিক্ষক এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসকেরই প্রতিচ্ছবি। প্রযুক্তির এই দ্রুত পরিবর্তনের যুগে এসে তারা এক অর্থে ‘ডিজিটাল রিফিউজি’ বা ডিজিটাল উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছেন। তারা বাধ্য হয়ে প্রযুক্তির দেশে পা রেখেছিলেন, কিন্তু কখনোই সেখানে আপন হতে পারেননি। করোনার সময়ের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে তারা ধরে নিয়েছেন যে, অনলাইনের পড়াশোনা মানেই ফাঁকিবাজি, অনলাইনের পরীক্ষা মানেই নকল।
কিন্তু মুদ্রার অন্য পিঠে আছে তরুণ শিক্ষার্থী সামির। সে ঢাকার একটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সামির তার ল্যাপটপ খুলেই ‘ক্যানভাস’ বা ‘মুডল’ নামের লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে ঢুকে যায়। কালকের ক্লাসের লেকচার ভিডিওটা শিক্ষক আগেই সেখানে আপলোড করে রেখেছেন। রাতে নিজের সুবিধামতো সময়ে সামির ভিডিওটা দেখে, থিওরিটা বুঝে নেয়। পরদিন যখন সে যানজট ঠেলে ক্যাম্পাসে যায়, তখন ক্লাসে আর একঘেয়ে লেকচার শুনতে হয় না। স্যার সরাসরি ছাত্রদের নিয়ে গ্রুপ ডিসকাশন বা দলগত আলোচনায় বসে যান। যে জায়গাগুলো সামির বুঝতে পারেনি, সেগুলো নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হয়। এই যে ব্যবস্থা যেখানে পড়াশোনার কিছু অংশ ঘটছে ডিজিটাল দুনিয়ায়, আর কিছু অংশ ঘটছে ইট-পাথরের ক্যাম্পাসেÑএটিই হলো ‘হাইব্রিড বিশ্ববিদ্যালয়’ বা ‘ব্লেন্ডেড লার্নিং’।
ভ্রান্তি ভাঙার সময়: করোনার ‘জরুরি ব্যবস্থা’ বনাম ‘প্রকৃত হাইব্রিড’
আমাদের দেশের অনেক শিক্ষাবিদের সবচেয়ে বড় ভুল বোঝাবুঝিটা তৈরি হয়েছে করোনার সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে। কোভিডকালে আমরা যেটা করেছি, সেটা কোনোভাবেই ‘অনলাইন শিক্ষা’ বা ‘হাইব্রিড শিক্ষা’ ছিল না; সেটা ছিল ‘ইমার্জেন্সি রিমোট টিচিং’ বা জরুরি অবস্থায় দূরশিক্ষণ। জীবন বাঁচানোর দায়ে কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই, কোনো ডিজিটাল কারিকুলাম ছাড়াই, শিক্ষকদের জোর করে জুম বা গুগল মিটের সামনে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
একটি প্রকৃত হাইব্রিড বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জুম অ্যাপে ক্লাস নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি শিক্ষাব্যবস্থার পুরো দর্শনটাকেই পাল্টে দেয়। এখানে ‘ফ্লিপড ক্লাসরুম’ বা উল্টানো শ্রেণিকক্ষের ধারণা ব্যবহার করা হয়। চিরাচরিত নিয়মে ছাত্ররা ক্লাসে এসে থিওরি শোনে এবং বাসায় গিয়ে হোমওয়ার্ক করে। কিন্তু হাইব্রিড মডেলে ছাত্ররা বাসায় বসে ডিজিটাল কনটেন্ট (ভিডিও, পডকাস্ট, এনিমেশন) দেখে থিওরি শেখে, আর ক্যাম্পাসে এসে সেই থিওরির প্র্যাকটিক্যাল প্রয়োগ করে, ল্যাবে কাজ করে, বন্ধুদের সঙ্গে আইডিয়া শেয়ার করে।
অধ্যাপক জামিলদের মতো শিক্ষকরা ভয় পান যে, প্রযুক্তি বুঝি তাদের জায়গা দখল করে নেবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, হাইব্রিড মডেলে শিক্ষকের গুরুত্ব আরও বাড়ে। তিনি তখন আর শুধু লেকচার দেওয়ার যন্ত্র থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন একজন ‘মেন্টর’ বা পথপ্রদর্শক।
বিশ্বজুড়ে কী ঘটছে?
পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখব, তারা করোনার অনেক আগে থেকেই হাইব্রিড মডেল নিয়ে কাজ শুরু করেছিল এবং এখন এটিকে মূলধারায় নিয়ে এসেছে।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা হার্ভার্ডের মতো বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন আর শুধু ক্যাম্পাসের চার দেয়ালে বন্দি নেই। তারা বুঝতে পেরেছে, দুনিয়ার সব মেধাবী ছাত্রের পক্ষে বোস্টনে গিয়ে লাখ লাখ ডলার খরচ করে পড়াশোনা করা সম্ভব নয়। তাই তারা নিয়ে এসেছে ‘মাইক্রো-মাস্টার্স’-এর মতো প্রোগ্রাম। যেখানে একজন শিক্ষার্থী তার কোর্সের অর্ধেকটা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিজের দেশে বসেই শেষ করতে পারে। বাকি অর্ধেকের জন্য বা ল্যাব ওয়ার্কের জন্য সে ক্যাম্পাসে যায়।
যুক্তরাজ্য এবং অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের কারিকুলাম এমনভাবে সাজিয়েছে, একজন শিক্ষার্থী চাইলে সপ্তাহে মাত্র দুদিন ক্যাম্পাসে এসে বাকি দিনগুলো অনলাইনে ক্লাস করতে পারে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি বা ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ পাচ্ছে। গ্লোবাল জব মার্কেটে ঢোকার আগেই তারা বাস্তব জীবনের কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করছে।
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআইয়ের কল্যাণে এখন এমন সব ‘স্মার্ট টিউটর’ তৈরি হয়েছে, যা একজন ছাত্রের দুর্বলতাগুলো মুহূর্তেই ধরে ফেলতে পারে। মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্ররা এখন ভার্চুয়াল রিয়ালিটি হেডসেট পরে ডিজিটাল ল্যাবে হাজারবার মানুষের হƒৎপ্লি বা গাড়ির ইঞ্জিন কাটার প্র্যাকটিস করতে পারছে, যার জন্য কোনো সত্যিকারের সরঞ্জামের প্রয়োজন হচ্ছে না।
আমাদের দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কতটা প্রস্তুত?
বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং বাজেটের অভাবে প্রযুক্তির দিক থেকে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও দেশের প্রথম সারির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিন্তু নীরবে এক বিশাল বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলছে।
নামকরা কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে দেখলে অবাক হতে হয়। তাদের ক্লাসরুমগুলো এখন আর শুধুই বেঞ্চ আর হোয়াইটবোর্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সেখানে বসেছে স্মার্টবোর্ড, লেকচার ক্যাপচার সিস্টেম (যেখানে শিক্ষকের ক্লাস স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড হয়ে সার্ভারে জমা হয়ে যায়)। তারা কোটি কোটি টাকা খরচ করে আন্তর্জাতিক মানের ‘লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ কিনছে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হওয়া মাত্রই একজন ছাত্র তার নিজস্ব ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড পেয়ে যায়। কখন অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে, কোন বইটা পড়তে হবে, কুইজে কত পেলÑসবকিছু তার মুঠোফোনে চলে আসে। এমনকি অনেক শিক্ষক এখন আর ক্লাসে রোল কল করে সময় নষ্ট করেন না। ছাত্ররা ক্লাসে ঢুকে নিজেদের আইডি কার্ড পাঞ্চ করে বা অ্যাপের মাধ্যমে কিউআর কোড স্ক্যান করে হাজিরা দিয়ে দেয়।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এরই মধ্যে ‘ব্লেন্ডেড লার্নিং পলিসি’ তৈরি করেছে, যেখানে বলা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চাইলে তাদের কোর্সের ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অনলাইনে নিতে পারবে। এটি একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। বেশ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এই পলিসি লুফে নিয়ে তাদের কোর্সগুলো নতুন করে ডিজাইন করছে।
ভাবুন তো, ঢাকার মতো একটা শহরে যেখানে জ্যামে বসেই একজন মানুষের দিনে চার ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়, সেখানে হাইব্রিড মডেল কতটা আশীর্বাদ হতে পারে! একজন শিক্ষার্থী যদি সপ্তাহে পাঁচ দিনের বদলে তিন দিন ক্যাম্পাসে যায়, তবে তার যাতায়াতের সময়, অর্থ এবং এনার্জি সবই বাঁচে। সেই বেঁচে যাওয়া সময়টা সে কোনো স্কিল ডেভেলপমেন্ট বা গবেষণার কাজে লাগাতে পারে।
ডিজিটাল রিফিউজিদের অবিশ্বাস ভাঙার উপায়
সবকিছু এত ভালো হওয়ার পরও আমাদের অনেক প্রবীণ শিক্ষাবিদ কেন এর বিরোধিতা করছেন? এর মূল কারণ হলো ভয় ও প্রস্তুতির অভাব। একজন শিক্ষক যিনি ৩০ বছর ধরে চমৎকার লেকচার দিয়ে ছাত্রদের মুগ্ধ করে এসেছেন, তিনি যখন দেখেন একটি সফটওয়্যার চালাতে গিয়ে তিনি তরুণ ছাত্রদের সামনে বোকা বনে যাচ্ছেন, তখন তার আত্মসম্মানে আঘাত লাগে। তিনি প্রযুক্তিটাকে শত্রু ভাবতে শুরু করেন।
এই সংকট সমাধানের জন্য আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। প্রযুক্তি দিয়ে কখনো একজন ভালো শিক্ষককে প্রতিস্থাপন করা যায় না, কিন্তু ‘যে শিক্ষক প্রযুক্তি ব্যবহার করেন, তিনি এমন শিক্ষককে প্রতিস্থাপন করে দেবেন যিনি প্রযুক্তি ব্যবহার করেন না।’ এই সত্যটা আমাদের প্রবীণ শিক্ষাবিদদের পরম মমতায় বোঝাতে হবে।
নীতিনির্ধারকদের জন্য গাইডলাইন: একটি সফল হাইব্রিড বিশ্ববিদ্যালয় রাতারাতি গড়ে ওঠে না। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক নীতিমালা, বিনিয়োগ এবং মানসিকতার পরিবর্তন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ নিচে দেওয়া হলোÑ
১. শিক্ষকদের জন্য ‘ডিজিটাল পেডাগজি’ প্রশিক্ষণ: শুধু ল্যাপটপ কিনে দিলেই বা জুম অ্যাকাউন্টের প্রিমিয়াম ভার্সন কিনে দিলেই কাজ শেষ হয় না। অনলাইনে কীভাবে পড়াতে হয়, তার বিজ্ঞানটা আলাদা। এখানে ছাত্রদের মনোযোগ ধরে রাখা সবচেয়ে কঠিন কাজ। তাই শিক্ষকদের জন্য একটানা দীর্ঘ মেয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এই প্রশিক্ষণে প্রবীণ শিক্ষকদের জন্য ‘মেন্টর’ হিসেবে তরুণ ও প্রযুক্তি-বান্ধব শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। প্রশিক্ষণগুলোকে বিরক্তিকর না করে ইন্টারেক্টিভ করতে হবে।
২. কোর্সের কাঠামো বা কারিকুলাম নতুন করে সাজানো: অফলাইনের তিন ঘণ্টার লেকচারকে সরাসরি অনলাইনে সম্প্রচার করাটা বোকামি। নীতিনির্ধারকদের নিশ্চিত করতে হবে যে, প্রতিটি কোর্স নতুন করে ডিজাইন করা হয়েছে। কোন টপিকগুলো ছাত্ররা নিজেরা ভিডিও দেখে শিখবে এবং কোনগুলোর জন্য ক্লাসরুমে শিক্ষকের সামনে আসতে হবে, তার একটি স্পষ্ট রূপরেখা থাকতে হবে।
৩. ডিজিটাল বৈষম্য দূরীকরণে বিনিয়োগ: আমাদের দেশের সব শিক্ষার্থীর ল্যাপটপ বা ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট কেনার সামর্থ্য নেই। হাইব্রিড মডেল চালু করলে গরিব ছাত্ররা পিছিয়ে পড়তে পারে। তাই সরকারের উচিত হবে শিক্ষার্থীদের জন্য নামমাত্র মূল্যে বা বিনা সুদে ল্যাপটপ ঋণের ব্যবস্থা করা। টেলিকম কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ‘এডুকেশন ডাটা প্যাক’-এর ব্যবস্থা করতে হবে, যা দিয়ে শুধু শিক্ষামূলক ওয়েবসাইট বা লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ব্রাউজ করা যাবে।
৪. ইউজিসির নীতিমালার নমনীয় বাস্তবায়ন ও মনিটরিং: ইউজিসি যে ব্লেন্ডেড লার্নিং পলিসি করেছে, তা শুধু কাগজে-কলমে থাকলে চলবে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এটি বাস্তবায়নে উৎসাহ দিতে হবে। তবে এখানে একটা বড় ঝুঁকি আছে। কিছু মুনাফালোভী বিশ্ববিদ্যালয় হয়তো খরচ বাঁচানোর জন্য সব ক্লাস অনলাইনে নিয়ে শিক্ষার মান কমিয়ে দিতে পারে। তাই ইউজিসি’কে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডাটা অ্যানালিটিক্সের মাধ্যমে দেখতে হবে যে, অনলাইনে ক্লাসগুলো আসলেই মানসম্মত হচ্ছে কি না এবং শিক্ষার্থীরা সেখানে অংশ নিচ্ছে কি না।
৫. শক্তিশালী ও নিরাপদ আইটি অবকাঠামো তৈরি: বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের সাইবার নিরাপত্তা এবং সার্ভারের ক্ষমতা বাড়াতে হবে। পরীক্ষার সময় যেন সার্ভার ডাউন না হয়ে যায় বা ডাটা হ্যাক না হয়, সেজন্য আন্তর্জাতিক মানের ক্লাউড সার্ভিস ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। নিজস্ব আইটি টিমকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে যেকোনো সমস্যায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সঙ্গে সঙ্গে সাহায্য পায়।
৬. ক্যাম্পাসের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা: বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস মানেই শুধু বড় বড় লেকচার গ্যালারি নয়। হাইব্রিড মডেলে ক্যাম্পাসের নকশাই পাল্টে যাবে। নীতিনির্ধারকদের উচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এমন ক্যাম্পাস তৈরিতে বাধ্য করা, যেখানে ‘কোলাবরেশন স্পেস’ বা দলগত কাজের জায়গা বেশি থাকবে। লাইব্রেরিগুলো হবে ডিজিটাল হাব। ছাত্ররা ক্যাম্পাসে আসবে আড্ডা দিতে, বিতর্ক করতে, প্রজেক্টের কাজ করতে এবং শিক্ষকদের সঙ্গে ওয়ান-টু-ওয়ান কাউন্সেলিংয়ের জন্য।
শেষকথা: অধ্যাপক জামিল সাহেবের গল্পটায় এবার ফিরে যাই। দুই বছর পরের দৃশ্য। জামিল সাহেব এখন আর জুমের কালো স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হন না। তার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি টিম তাকে একটি ‘স্মার্ট স্টুডিও’ তৈরি করে দিয়েছে। সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি যখন কোনো জটিল গাণিতিক সমীকরণ বা থিওরি বোঝান, তখন পেছনে থ্রিডি এনিমেশন ভেসে ওঠে। এই ভিডিওগুলো তার ছাত্ররা বাসায় বসেই দেখে নেয়।
আজ জামিল সাহেবের ক্লাস আছে। তিনি যখন ক্লাসে ঢুকলেন, তখন আর তাকে গলার রগ ফুলিয়ে চিৎকার করে লেকচার দিতে হলো না। ছাত্ররা আগে থেকেই পড়াটা তৈরি করে এসেছে। তারা গোল হয়ে বসেছে। জামিল সাহেব তাদের মাঝখানে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। একদল ছাত্র তাকে একটা কেস স্টাডির সমাধান দেখাচ্ছে, তিনি হেসে তাদের ভুলগুলো শুধরে দিচ্ছেন। ছাত্রদের চোখে-মুখে আজ আর একঘেয়েমির ছাপ নেই, সেখানে আছে নতুন কিছু আবিষ্কারের আনন্দ।
জামিল সাহেব আজ বুঝতে পেরেছেন, প্রযুক্তি আসলে তার শত্রু নয়; প্রযুক্তি হলো সেই জাদুর কাঠি, যা তার ৩০ বছরের অভিজ্ঞতাকে আরও সুন্দরভাবে, আরও বেশি শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।
হাইব্রিড বিশ্ববিদ্যালয় কোনো সায়েন্স ফিকশন বা দূরের স্বপ্ন নয়। এটি আজ আমাদের দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে। আমরা যদি করোনা আমলের সেই ভীতি আর জড়তা নিয়ে বসে থাকি, তবে গ্লোবাল ভিলেজ বা বিশ্বগ্রামের এই প্রতিযোগিতায় আমাদের তরুণেরা অনেক পিছিয়ে পড়বে। ইট-পাথরের ক্যাম্পাসগুলো টিকে থাকবে ঠিকই, কিন্তু সেগুলোর প্রাণভোমরা হবে ডিজিটাল দুনিয়ায়। সেই নতুন দুনিয়ায় আমাদের পদচারণা হোক আত্মবিশ্বাসী এবং পরিকল্পিত। ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থা হোক এমন, যা আমাদের শেখাবে শুধু মুখস্থ করতে নয়, বরং পরিবর্তনশীল পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post