নুসরাত শারমিন : ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একজন সাধারণ তরুণই হয়ে ওঠে একটি জাতির নবজাগরণের প্রতীক। শরীফ ওসমান বিন হাদি তেমনই এক নাম, যিনি রাজপথের ধুলোবালি থেকে জাগিয়ে তুলেছিলেন এক ঘুমন্ত জাতিকে। তিনি কেবল একজন ছাত্র ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গ, যিনি মানুষকে শিখিয়েছিলেন—ন্যায়ের ডাকই পারে দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙতে।
হাদির নাম আজ ন্যায়বিচার, সাহস, আত্মমর্যাদা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রতীক। তার পদচারণায় কেঁপে উঠেছিল শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ নয়, কেঁপে উঠেছিল পুরো জাতি। তার মৃত্যুর পর শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত মানুষ ছুটে এসেছে তাকে এক নজর দেখতে, তার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কেঁদেছে। মনে হয়েছে, যেন তারা হারিয়েছে আপনজনকে, হারিয়েছে নিজেদের আত্মার এক টুকরো।
আজও প্রশ্ন জাগে—কে এই হাদি, যার মৃত্যু স্থবির জাতিকে বৈদ্যুতিক শকের মতো জাগিয়ে তুলল? কেন সাধারণ বাবা ছেলেকে কাঁধে তুলে রাজপথে ছুটছেন, চিৎকার করে বলছেন, ‘আমাদের হাদি চাই।’ কেন সাধারণ গৃহবধূরা সন্তানদের নিয়ে শীতের রাতে শাহবাগের মাটিতে বসে হাদির জন্য কাঁদছেন?
এই গল্প কেবল একজন তরুণের নয়; এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় জন্মের গল্প। ইউরোপের রেনেসাঁ এসেছিল চার্চের গোঁড়ামি ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতার বিরুদ্ধে। আর বাংলাদেশের ‘হাদি-পরবর্তী রেনেসাঁ’ এসেছে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, বিচারহীনতা ও বিদেশি প্রভাবের শৃঙ্খল ছিঁড়ে ফেলার প্রত্যয়ে।
হাদি বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশ তখনই সত্যিকারের স্বাধীন হবে, যখন এটি কোনো বিদেশি শক্তির, বিশেষত ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব থেকে মুক্ত হবে। তিনি বলতেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতি যেন অন্যের রাজধানীর ল্যাবরেটরিতে পরিচালিত না হয়।’ তার দৃষ্টিতে ভারতীয় আধিপত্য কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি ছিল সাংস্কৃতিক দাসত্বও। তিনি স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন এক আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশের, যেখানে রাষ্ট্র নিজের সিদ্ধান্ত নেবে নিজের মাটিতে, নিজের মানুষের কণ্ঠে।
তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, এই জাতি দীর্ঘদিন ধরে ভয়, দমন ও দলীয় আনুগত্যের ঘোরে আচ্ছন্ন। সেই ঘুম ভাঙাতেই তিনি উচ্চারণ করেছিলেন এক শব্দ—‘ইনসাফ’। হাদি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, কেবল সরকার বদলালেই পরিবর্তন আসে না; রাষ্ট্রের চরিত্র না বদলালে কিছুই বদলায় না। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে নৈতিকতা ও নীতিভিত্তিক বিপ্লবই হচ্ছে বাংলার প্রকৃত রেনেসাঁ।
বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে হাদি তিনটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। প্রথমত, সাংস্কৃতিক দাসত্ব ভাঙা ছাড়া কোনো পরিবর্তনই টেকসই নয়। দ্বিতীয়ত, শিল্প, সাহিত্য ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষের চিন্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে তিনি সতর্ক করেছিলেন। তৃতীয়ত, তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, জুলাই বিপ্লব কোনো দলের ক্ষমতা দখলের আন্দোলন নয়; এটি নৈতিক পরিবর্তনের বিপ্লব। শহীদের রক্তের ঋণ শোধের একমাত্র পথ হলো রাষ্ট্রে নৈতিক ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা।
তার স্বপ্নের বাংলাদেশ হবে এমন এক রাষ্ট্র, যেখানে অন্ধ আনুগত্যের বদলে থাকবে নীতির প্রতি আনুগত্য। তিনি বলতেন, ‘আরেকটা স্বৈরাচারকে জায়গা দিতে আমরা আন্দোলন করিনি।’ হাদির এই আদর্শ আজও তরুণ প্রজন্মের বুকে ধিকধিক করে জ্বলছে।
হাদি ছিলেন এক প্রজন্মের নৈতিক আত্মা, যিনি প্রমাণ করে গেছেন, একজন সাধারণ ছাত্রও ইতিহাস বদলে দিতে পারে, যদি তার অন্তর ভরা থাকে সত্য বলার সাহস ও দেশের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
আজ হাদির দেহ মাটির নিচে, কিন্তু তার ‘ইনসাফ’-এর আহ্বান কোটি মানুষের হূদয়ে জ্বলছে। যত দিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলবে, যতদিন কোনো তরুণ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠবে, ততদিন হাদি বেঁচে থাকবে। বাংলাদেশের রেনেসাঁ কেবল শুরু হয়েছে। লড়াই দীর্ঘ, পথ কঠিন; কিন্তু হাদি দেখিয়ে গেছেন, সত্যের পথে একা হাঁটাও সম্মানের।
লেখক: প্রাবন্ধিক
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post