বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী, ইউনিয়ন, সোশ্যাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংককে একত্র করে নতুন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি ছিল সবচেয়ে আলোচিত পদক্ষেপ; উদ্দেশ্য দুর্বল ব্যাংকগুলোকে রক্ষা করে সমগ্র ব্যাংক খাতের সংকট প্রশমিত করা। কিন্তু এই পদক্ষেপ যেমন তাৎপর্যপূর্ণ, তেমনি জটিল বাস্তবতাও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। বিশেষত, তুলনামূলক স্থিতিশীল এক্সিম ব্যাংককে এই একীভূতকরণের অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা।
ফলপ্রসূ ব্যাংক সংস্কারের জন্য এটি এক সাহসী পদক্ষেপ। বিগত এক যুগে ব্যাংক খাত লুটপাট, অনিয়ম ও রাজনৈতিক দাপটে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো ব্যাংক মালিকানা ব্যবহার করে জনগণের আমানত নিজেদের ব্যবসায় প্রয়োগ করেছে। সেই কারণেই আজ চারটি ইসলামী ব্যাংক কার্যত দেউলিয়া অবস্থায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংকগুলোর আর্থিক অনিয়ম ও ঋণখেলাপির মাত্রা ভয়াবহ। দেশের সবচেয়ে বড় আর্থিক খাতকে রক্ষার একমাত্র উপায় হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জরুরি ভিত্তিতে একীভূতকরণের ঘোষণায় এগিয়েছে।
তবে এই প্রক্রিয়ায় এক্সিম ব্যাংককে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়েই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। কারণ এক্সিম ব্যাংক তুলনামূলকভাবে তারল্য সংকটমুক্ত ও মূলধনে মজবুত অবস্থানে ছিল। ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের প্রায় অর্ধেকই খেলাপিতে রূপ নিয়েছে, তবে এতে ব্যাংকটির কার্যকর মূলধন বা আমানতকারীর নিরাপত্তা বিপন্ন হয়নি। বরং এটি ছিল একমাত্র শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক, যার বিল জমা ঘাটতি বা বিধিবদ্ধ আমানত ঘাটতি দেখা যায়নি। এমন একটি ব্যাংককে সমস্যাগ্রস্ত চারটি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করায় অনেকের ধারণা, এখানে অর্থনৈতিক যুক্তির চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা বেশি কাজ করেছে।
এতদিন এক্সিম ব্যাংক পরিচালিত হয়েছিল নজরুল ইসলাম মজুমদারের নেতৃত্বে, যিনি ছিলেন বাংলাদেশের ব্যাংক পরিচালকদের সংগঠন বিএবির সভাপতি এবং শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে একাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাৎ, অনিয়ম এবং বিদেশে সম্পদ স্থানান্তরের অভিযোগ আছে। তার ব্যাংক পরিচালনায় যে প্রশ্ন উঠেছিল, সেটিই এখন পুরো প্রতিষ্ঠানকে কালিমালিপ্ত করেছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের পর তাকে গ্রেপ্তার করা এবং ব্যাংক থেকে অপসারণ নতুন প্রশাসনের রাজনৈতিক দৃঢ়তা প্রমাণ করলেও একই সঙ্গে এটি আর্থিক খাতের স্বাধীনতার প্রশ্নও উত্থাপন করেছে। এক রাতে একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর পতন যতটা প্রয়োজনীয় ছিল, একইভাবে ততটাই এটি ব্যাংক খাতের ওপর রাষ্ট্রের নতুন কর্তৃত্ব বা আধিপত্য প্রতিষ্ঠারই এক বার্তা।
তথাপি বাস্তবতা হলো, এই একীভূতকরণ বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে এক নতুন অধ্যায় খুলেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি অনেকগুলো ঝুঁকি বয়ে আনছে। পাঁচটি ব্যাংক একত্র হওয়ার ফলে একটি প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়েছে, যার পুঁজির আয়তন বিশাল, কিন্তু দায়িত্ব ও দায়দেনার বোঝাও সমান ভারী। একাধিক ঋণ, জটিল দায় এবং ভিন্ন অভ্যন্তরীণ কাঠামো নিয়ে নতুন ব্যাংকটি যাত্রা শুরু করেছে। ক্রিয়াশীল দক্ষতা অর্জন, তথ্যপ্রযুক্তির সংহতি ও অভ্যন্তরীণ ট্রাস্ট পুনর্গঠন—সবই সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন জন-আস্থার। বিগত বছরগুলোয় ব্যাংক খাতে আস্থা হারিয়েছে সাধারণ মানুষ। আমানতকারীরা ব্যাংকের স্থিতিশীলতায় বিশ্বাস রাখতে পারছে না; বারবার শুনছে খেলাপি ঋণ, অর্থপাচার বা প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতার খবর। এই অবস্থায় ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’কে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকৃত নেতৃত্ব ও দৃশ্যমান স্বচ্ছতা প্রদর্শন করতে হবে। জনগণকে বোঝাতে হবে, নতুন প্রতিষ্ঠান পুরোনো নোংরা প্রথার পুনরাবৃত্তি নয়, বরং একটি সুস্থ ব্যাংকিং ধারার সূচনা।
বলা হয়, ব্যাংক খাত শুধু অর্থনীতির নয়, রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন। বাংলাদেশে বহু বছর ধরে দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক প্রভাবে এ খাতে বিশৃঙ্খলা বেড়েছে। এখন যদি সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সত্যিকারের সংস্কারের পথে হাঁটে, স্বচ্ছ অডিট, স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ ও ঋণ আদায়ের আইনি কঠোরতা নিশ্চিত করে, তাহলে এই উদ্যোগ একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করবে। কিন্তু যদি একীভূতকরণ কেবল নামমাত্র পরিবর্তন হয়, তবে জন-আস্থা আরও গভীর খাদে পড়বে।
হয়তো এখনই ঠিক সময় বাংলাদেশের ব্যাংক খাত নিজেদের ইতিহাস নতুনভাবে লেখার। সংস্কার যদি সত্যিই উদ্দেশ্য হয়, তবে রাজনৈতিক প্রতিশোধের উপাদান যেন সেখানে না ঢোকে। একীভূত ব্যাংকটি দেশকে একটি শক্তিশালী আর্থিক কাঠামোর পথে নিতে পারে; কিন্তু সেই পথ হবে দীর্ঘ ও কঠিন। দুর্নীতির হাতে জিম্মি ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনতে দৃঢ়সংকল্প ও স্বাধীন নীতিনির্ধারণই একমাত্র উপায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপ তাই যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি এক পরীক্ষাও। এটি প্রমাণ করবে—আমরা কি সত্যিই দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে চাচ্ছি, নাকি সুস্থ ব্যাংকগুলোকে দণ্ড দিয়ে আগের অপরাধ ঢাকতে চাচ্ছি। সময়ের বিচারে এই উত্তরই আমাদের ব্যাংক খাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post